আতাউর রহমান মিলাদের গল্প

Share Button

BRESTHEE
বৃষ্টির বারান্দায়

নিয়মের বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি এসে সারা শহর ভিজিয়ে দিচ্ছে,ব্যাকরণের কোন নিয়মই যেন মানতে চাইছে না।প্রথমে টিপ টিপ শুরু হলে মাথাটা বাচিয়ে গন্তব্যের দিকে যাত্রা করি কিন্তু আক্রমণের মাত্রা যখন দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার তখন বিরতি না নিয়ে উপায় নেই।দৌড়ে দাঁড়াই নিকটবর্তী সাধনা ঔষধালয়ের বিশাল বারান্দায়।দোকানটা বেশ কয়েক মাস থেকে বন্ধ স্বভাবতই বৃষ্টি পরিত্রাণ পেতে আমার আগেই আশ্রয় নিয়েছে অনেকে।বৃষ্টির জলে ভাসা শহরে এ যেন একটু আশ্রয়।ভারী বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট জলে জলাকার।ড্রেনগুলো কবে সাফ করা হয়েছিল সেটা পৌর কর্পোরেশন নিজেই জানেনা।তাই একটু বৃষ্টি হলেই সারা শহর জলের আয়না হয়ে উঠে।
সাধনা’র বারান্দা একটা লাওয়ারিশ কুকুর মলমুত্র করে অপবিত্র করে রেখেছে,একটা ছাগল নির্বিকারভাবে চিবুচ্ছে পুরনো দৈনিকের ছেঁড়া পাতা অর্থাৎ বাসি খবরগুলো অনায়াসে হজম করছে।একজন বয়স্ক অন্ধ ভিক্ষুক ৭/৮ বছর বয়সী ছেলেকে সাথে নিয়ে হাত পা ছাড়িয়ে আয়েশ করে বসেছে,ছেলেটা এক টাকা দামের লজেন্স চুষছে গভীর মনযোগে।তারচেয়ে আরেকটু দূরে শামুকের মত নিজেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে বসে আছে বাইশের কমলা।
কেউ বলে পাগল,কেউ বলে ব্যর্থ

প্রেমিক।যে যাই বলুক কমলার মস্তিস্ক বিকৃতি আছে এটা নিশিচত।সে প্রতিদিন এ শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত আপন মনে বিড়বিড় করে হাটে।সুন্দরী কমলার অসাধারন রুপে মুগ্ধ এ শহর।সবার বুকে গোপন কাঁপন তুলে সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে।অনেকের মত নিজের ও ইচ্ছে ওর সাথে একটু কথা বলি,ওকে জানি।ইচ্ছে হলো এই সুযোগে ওকে একটু বাজিয়ে দেখি কিন্তু সাহস হলোনা,পাছে লোকে কিছু বলে।কাপুরুষদের নিয়ে এই এক সমস্যা ভেতরে যতটা লেপ্টালেপ্টি বাইরে তার এক অংশ ও বেরুয় না।মফস্বল শহরের সমস্ত কোলাহল বৃষ্টিতে জমা রেখে সাধনার বারান্দায় বিক্ষিপ্ত জীবনের টুকিটাকি নিয়ে মেতে উঠি নিজের ভেতর।আনমনে আপন ভুবনে।

বাইরে বৃষ্টির তেজ বেড়েই চলেছে।

অবিরাম বৃষ্টিধারায় কালোপিচের বুকে ভাসিয়ে নিচ্ছে ছেঁড়া পলিথিন ব্যাগ,সিগারেটের খালি প্যাকেট,খোলা বাজারের ময়লা আবর্জনা,শেষ রাতের মাতাল বমি,দর্জির ফেলে দেয়া অব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো।সে এক ভিন্ন রকম চিত্র।চেনা শহরটা অচেনা হয়ে যায় নিমিষে।
বাইরের বৃষ্টি রেখে কমলাকে
দেখি।নড়েচড়ে উঠে বসে সে,পাশের মানুষ বা পশু কোন কিছুতেই তার আগ্রহ নেই।এলোমেলো চুলে বিলি কাটছে,চিমটি মেরে ধরে আনছে উকুন।দু’হাতের বুড়ো আঙুলের নখে পিষছে আনন্দে।মনে মনে হাসছে।তবে হাসিটা স্পষ্ট নয়,রহস্য জালে মোড়া।বুড়ো ভিখারি ছেঁড়া পাঞ্জাবির পকেট হাতড়িয়ে দিনের হাতপাতা সঞ্চয় বের করে আন্দাজে গুণছে এক,দুই,দশ,বিশ।আমি বৃষ্টির আনমনা ছেড়ে এ দৃশ্য সুখ নিয়ে দেখি।ভিখারির সংগী ছেলেটা তখন বেশ জমিয়ে তুলেছে ছাগলটার সাথে।
দৃশ্যটা পালটায় দ্রুত।কাকভেজা দু’টো

কিশোর এসে যোগ দেয় বারান্দায়

দখল নিতে।চোখের পলকে
একজন কিশোর অন্ধ ভিখারির হাত থেকে ছোঁ মেরে টাকাগুলো কেড়ে নেয়।ভিখারি কিছু বুঝে উঠতে পারেনা,অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে সংগী ছেলেকে নাম ধরে ডাকে।ডাক শুনে ছেলেটা কাছে আসতেই কিশোরেরা বিজয়ীর বেশে বৃষ্টিতে গা ভাসায়।ঘটনা আত্মস্থ হলে ভিখারি কিশোরদের লক্ষ্য করে গালি ছুড়ে।“শুয়োরের বাচ্চা,তোর মায়েরে…”
ভিখারির গালি কিশোরদের কানে পৌছে।বেঁটে কিশোর ঘুরে দাড়ায়,বুড়োর কাছে আসে।বুড়োর বুকে ছ’ইঞ্চি ইস্পাত ঠেকায়,”বুঝলি হালা আন্ধায়…মর মায়ে মইরা গ্যাছে,মা’র লগে কিছু করতে চাইলে তরে হালায় উপ্পর যাইতে অইবো…দিমু নাহি পাঠাইয়া?”কোন উত্তর আসেনা।অন্ধ চোখে না দেখলেও ইস্পাতের মর্ম বুঝে,কিছু বলেনা। কিশোরেরা সময় নষ্ট না করে বৃষ্টির ভেতর হারিয়ে যায়।ছোট ছেলাটার হাত ধরে অন্ধ ভিখারিও বৃষ্টি উপেক্ষা করে বেরিয়ে যায় পেটের কাজে।
বৃষ্টি থামার কোন আয়োজন নেই।ঝরছে তো ঝরছেই।মনে হচ্ছে শহরের সমস্ত জীর্ণতা ধুয়ে মুছে সাফ করে তবেই ক্লান্ত হবে।এমনিতেই হাতে তেমন কাজ ছিলোনা কিংবা আমার অনুপস্থিতিতে কারো কিছু থেমে থাকার নয় তবু বাড়ি যেতে পারলেই বাচি।বন্ধ দোকানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল লাগছে না আর।বৃষ্টির ছিটেফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে পুরো বারান্দা,ট্রাউজারের নিম্নাংশ।বৃষ্টির আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে দাঁড়িয়ে থাকি দেয়াল ঘেষে।
বাতাসের ঝাপটা বুঝে এদিক ওদিক করছি,এমন সময় একটা জিপ এসে থামে সামনের রাস্তায়।পরিচিত কেউ ভেবে বৃষ্টির ফাঁকে চোখকে চিরুণি বানাই।নাহ,তালিকায় নেই।ভাল করে দেখি,এ যে পুলিশের জিপ।বাবাজীরা এখানে?প্রশ্নরা গলায় আটকে যায়।
জিপ দেখে কমলা উঠে দাঁড়ায় উকুন বাছা সময় ছেড়ে।পুলিশের জিপ ও কমলার অদৃশ্য যোগাযোগ আমার বিস্ময় বাড়ায়।কমলা বারান্দা ছেড়ে বৃষ্টিতে নামে।এক পা এগোয় আবার থামে,এক পা এগোয় থামে।বৃষ্টি তার কমলা রঙের শাড়ী ও শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে সেদিকে তার ভ্রক্ষেপ নেই।পুলিশের তর সয়না,একজন পুলিশ নামে গাড়ি থেকে,এগুয় সামনে।অন্যজন গাড়ি থেকে হাঁক ছাড়ে,”হেই মাগিডারে ধইরা নিয়া আয়”।
আমি থ হয়ে যাই।যার কলকব্জার ঠিক নেই সে কি করে মাগি হয়?মনে মনে হাসি পেলো।হাসন রাজার একটা গানকে প্যারোডি করে গাইতে ইচ্ছে হলো…”মাগি কে বানাইলোরে,কমলা পাগলীরে মাগি কে বানাইলোরে…”।আমার ইচ্ছের গলা টিপে পুলিশ ভাই চেপে ধরল কমলার হাত।ততক্ষণে সস্তা কাপড়ের কমলা রঙ চুয়ে চুয়ে কমলার শরীর ও বৃষ্টির জল কমলা রঙ ধারণ করেছে।পুলিশ চিলের মতো সোঁ করে কমলাকে নিয়ে চলে যায়।আমি বসে বসে চোর পুলিশ খেলি।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার সমস্ত ইচ্ছে এক ফুঁতে নিভে যায়।সবাই বারান্দা ছেড়ে চলে গেছে।পশুদের সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে হলোনা।কোন মানুষ অবশিষ্ট নেই বারান্দায়।আমার গন্তব্যে যাওয়া প্রয়োজন,বেরিয়ে পড়ি।বারান্দা ছেড়ে মাটিতে পা দিতেই দেখি কমলা রঙ মাটিতে লেপ্টে আছে।আমি তা মাড়িয়ে দ্রুত চলে পায়ে চলে যাই কমলা রঙ বৃষ্টি গায়ে মেখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop