আমিরাতে সংহতি’র রবীন্দ্রপাঠ

Share Button
  • লুৎফুর রহমান

এই প্রথম মরুর দেশ আরব আমিরাতে বাংলা সাহিত্যের প্রাণ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একক একটি সাহিত্য অনুষ্ঠান হলো। সাহিত্য ও সংস্কৃতি স্বজনদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। প্রচণ্ড গরমের দিনে, অনেক দূরে থেকেও অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন রবী ঠাকুরকে ভালোবেসে এবং তাকে নিয়ে সংহতির সৃজনশীল অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য।

হলফ করে বলা যায় দর্শক স্রোতা ঠকেননি। রবী ঠাকুরের রচিত গান-কবিতা-ছড়া নিয়ে ’’রবীন্দ্রপাঠ’’ দর্শকদের বিমোহিত করে রেখেছিল অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।

সৃজন শৈলীর মন ভালো করা ‘রবীন্দ্রপাঠ’ এর আয়োজন করে সংহতি সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ আরব আমিরাত শাখা। চার আগস্ট, শুক্রবার বিকেলে শারজাহের একটি রেঁস্তোরায় এই মনোমুগ্ধ অনুষ্ঠান হয়েছে।

জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। আমিরাত প্রবাসি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ইয়াসমিন কালাম নেতৃত্ব দেন রবী ঠাকুর রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি-তে বুকে হাত আর মনে ধারণ করে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলান আগত দর্শক স্রোতা। মনে হয় অদ্ভূদ আবেগের আবহে ভরে যায় পুরো অনুষ্ঠান।


সংহতির ছোট্টবন্ধু জোয়ারিন জিসান পাঠ করে ছড়া- ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে…। দর্শক করতালিতে জিসান খুশি হয় সবচেয়ে বেশী। প্রবাসে বেড়ে ওঠা এসব বাচ্চাদের বাংলা সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন করাতে তাদেরকে এসবে আনা দরকার বলেও তখন জানান সবাই।

অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন আরব আমিরাতের সাহিত্য ও সংস্কৃতি স্বজনরা। যারা কায়মনে রবী ঠাকুরের ভক্ত।
রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে সারগর্ব আলোচনা ছিল অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন – উলংগং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ড. জিনাত রেজা, শারজাহ ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজার শেখ আব্দুল করিম, অধ্যাপক আব্দুস সবুর, আরবান রীডার্স এর সংগঠক নওশের আলী ও সংস্কৃতি অনুরাগি শহিদুল ইসলাম।

অধ্যাপিকা ড. জিনাত রেজা বলেন-আমি যখন বাল্যকালে পড়ি বাংলা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ তখন ততোটা বুঝিনি উনি কে ছিলেন, কিন্তু শিক্ষকতা করতে গিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর দায় কেবল বাড়ছেই। আমাদের প্রজন্মকে রবীন্দ্রনাথ জানাতে হলে সবাই কাজ করতে হবে। পরিবার থেকে এ কাজ শুরু হোক।

শেখ আব্দুল করিম বলেন- মহাপুরুষের চলেও যাওয়াও দাগ রেখে যাওয়া। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর ৭৬ বছর পরও যেন মনে হয় বেঁচে আছেন। বাঙালির জন্য লিখে যাচ্ছেন।

অধ্যাপক আব্দুস সবুর -অন্ধকার বেড়াজাল ডিঙিয়ে যারা বাঙালিকে প্রগতির গান শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ তাদের অগ্রণী একজন।

নওশের আলী বলেন- রবীন্দ্র সমাজপ্রীতি আর দেশপ্রেম ছিল অনুকরণীয়। তাঁর আলোয় আলোকিত হতে পারলে সমাজ এগিয়ে যেতো।

সংগঠনের কথা নিয়ে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সহ সভাপতি সৈয়দা দিবা। জানালেন-বাঙালি এবং বাংলাদেশকে ভালোবাসতে হলে রবীন্দ্রনাথ আমাদের পড়া এবং মনে ধারন করেই চলা দরকার। তা হোক দেশে অথবা প্রবাসে। সংহতির রবীন্দ্রপাঠ অনুষ্ঠান তার সাহিত্যের অপার ভাণ্ডার থেকে তুলে আনা অল্প সৃজনশীল কিছু অংশ মাত্র। আগামীতে তা আরও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর ‘মাঝি’ ছড়া ‘আমার যেতে ইচ্ছে করে…’ পাঠ করেন আমিনুল হক। পরে কবিতা নিয়ে আসেন জুয়েনা আক্তার রুনি। ’দুই বিঘা’ কবিতা আবৃত্তি মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায়।

ছড়াকার লুৎফুর রহমান পাঠ করেন স্বরচিত দুটি ছড়া। রবী ঠাকুরের বাল্যকাল এবং এ যুগের বাল্যকাল- কেমন যাচ্ছে সে কথা থাকে ছড়ায়। জি এম জায়গীরদার আবৃত্তি করেন ‘প্রথম শোক’ কবিতাটি। ভরাট কণ্ঠে কবিতার আবহ দর্শক মুগ্ধ করেন। সুদুর আবুধাবী থেকে আগত কবি ওবায়দুল হক পাঠ করেন স্বরচিত কবিতা। আজমান থেকে আগত কবি মোহাম্মদ আলী মনসুর এর চমৎকার কবিতা পাঠে শেষ হয় কবিতা পর্ব।

রবীন্দ্রনাথের পাঠক নন্দিত ‘ছুটি’ ছড়াগানে পরিবেশন করেন তিশা সেন। ঘুমপাড়ানি গানের আবহে পাঠক স্মৃতিমুখর এবং আবেগপ্লুত হয়েছেন সন্দেহ নেই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নিয়ে আসেন সানি মজুমদার। ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানের মাঝে থাকে প্রাণের সুর। ‘আমারো পরানো যাহা চায়’ গানে দর্শক মুগ্ধ করেছেন প্রবাসী সাংবাদিক সিরাজুল হক।

কবি গুরুকে নিয়ে সৃজন আনন্দের ষোলকলা পূর্ণের যেন কিছু বাকী ছিল! এরপর শুরু হয় কোরাস। গান ধরেন কাইসার হামিদ। সকলে গলা ছেড়ে গান রবীন্দ্রগান।

অনুষ্ঠানের ছন্দপতনের কোন সুযোগ না দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন সৈয়দা দিবা। তার কবিতাটি আবৃত্তিগুণে বেঁধে রাখে বাকী সময়ের জন্য দর্শকদের।

তারপর ইয়াসমিন কালাম আর সিরাজুল হকের কণ্ঠে চলে একাধিক রবীন্দ্র সংগীত।


প্রানজ অনুষ্টানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সংহতির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক, ছড়াকার লুৎফুর রহমান।

আরব আমিরাতে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যপাঠ নির্ভর প্রথম এ অনুষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন সঞ্জয় ঘোষ, জাবেদ আহমদ, সাদিকুর রহমান সুনু।

সংগঠনের সভাপতি লেখিকা-শিক্ষিকা মোস্তাকা মৌলা‘র বক্তব্যে শেষ হয় রবীন্দ্র আয়োজন।

রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মন ও মনে মিশে আছেন। তাঁর সাহিত্য কর্ম বিশ্বজনিন। সংহতির রবীন্দ্রপাঠ অনুষ্ঠান দূর প্রবাসে আগত রবীন্দ্র প্রেমীদের বোধে নাড়া নিয়েছে । শেষ পর্বে,অর্থাৎ ভোজন পর্বে, মুক্ত আড্ডায় সবাই সংহতির আয়োজনকে ধন্যবাদ দিয়ে এই তৃপ্তির আনন্দ অনুভুতিই প্রকাশ করেছেন প্রাণ খুলে। শুভেচ্ছায়,ভালোবাসায় এবং মুগ্ধতায়।
দিনের আলো যখন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিলো দুবাইর আকাশে। তখন ভেঙে এই রবীন্দ্র আয়োজন। স্মৃতির পুটুলিতে রবীন্দ্রময় আনন্দভূতি নিয়েই সবাই ফিরি আপন ঠিকানায়।

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop