একুশে দেশে দেশে

Share Button

Jamil-Sultan
ফারুক যোশী

সালাম রফিক জব্বার বরকতের আত্মহুতি ছিলো একটা জাতির প্রথম স্পর্ধিত আঘাত। এই আঘাতের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো এ জাতি মাথা নোয়াবে না। সেদিন থেকেই হয়ত পাকিস্থান বোঝে নিয়েছিলো, বাঙালি সংস্কৃতিকে কোনভাবেই অবজ্ঞা করা যাবে না। চাটুকার কাউকে দিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীতও লিখানো যাবে না। তারুন্য সেদিনই বুঝিয়ে দিয়েছিলো, যতই আঘাত আসুক ভাষা কিংবা অধিকারের প্রশ্নে আপোষ হবে না বিভাষির সাথে। আপোষ হয়ও নি। আন্দোলন দানা বেঁধেছিলো এবং সার্থকতা পেয়েছিলো। ক’জন মানুষের বিসর্জন, অথচ ঐ একুশেই আমাদের জ্বালিয়ে দিয়ে যায় চেতনার মশাল। উনসত্তুর-একাত্তুর এসেছিলো একুশের প্রজ্জলনকে সাথে নিয়েই। লাখো লাখো মানুষের আত্মহুতি দেয়া সে-তো ছিলো একুশেরই প্রাণ জাগানিয়া এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। আর সেকারনেই একুশে আমাদের চেতনায় চির উজ্জল, ভাস্বর জ্বলজ্বলে এক চিহ্ন।
একুশে নিয়ে বাংলাদেশ নামক আমাদের রাষ্ট্রের তাই আছে বাড়তি প্রয়াস। বলতে গেলে এটাই শেকড়। সেকারনে এই একুশে এখনও প্রত্যয়, আশা জাগানিয়া। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বও এড়িয়ে যেতে পারছে না একুশের গৌরবোজ্জল ইতিহাস। তাইতো বৈশ্বিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশের স্বীকৃতি সে-তো কয়েক বছর আগের( ১৯৯৯ সনের ১৭ নভেম্বর) ঘোষনা। জাতি হিসেবে এ ঘোষনায় আমাদের শ্লাঘা থাকারই কথা। আমরাও গর্বিত। এ বছর জাতিসংঘের কার্যালয়ের সামনে একুশের ভাস্কর্য স্থাপন আরেক গৌরবময় অধ্যায়। জাতি হিসেবে এ আমাদের আন্তর্জাতিক এক মাইলষ্টোন। অভিনন্দন সংশ্লিষ্ট সবাইকে যারা এ নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছেন, শ্রম দিয়েছেন বাঙালি জাতির এ ল্যান্ডমার্ক আমেরীকায় স্থাপনে।
২) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন কোটি বাঙালি । এবং এদের এক বিশাল অংশ, যারা বাংলাদেশের বাতাস গায়ে নিয়ে বেরিয়েছেন দেশের বাইরে। তাই স্বাভাবিকভাবেই একটা বাড়তি টান থাকে এদের সবারই। শেকড়মুখী মানুষগুলো তাইতো ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে এরা সময়ে সময়ে স্মৃতিতাড়িত হয়। আবেগে-উচ্ছাসে দেশ নিয়ে মেতে উঠে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দুর প্রাচ্য কিংবা পশ্চিমের দেশগুলোতে সবখানেই সেই চির চেনা উচ্ছাস কিংবা শ্রদ্ধার বিনম্র স্মরন। একুশের মিনার উঠেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশের বাইরে একুশের প্রথম শহিদ মিনার ওল্ডহ্যামের বাঙালি পাড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বাঙালির বীরত্বের ইতিহাস। এর পর নির্মিত হওয়া লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের শহীদ মিনার লন্ডনের বাঙালিদের যেন আরেক ল্যান্ডমার্ক। শোকে আর ঝঞ্জায়,প্রগতিশীল আন্দোলনে তাইতো লন্ডনের শহীদ মিনার এখনও প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। তারুন্যের বাদ-প্রতিবাদের জায়গা হয়ে উঠেছে এ মিনার । কিন্তু মাঝে মাঝে সুঁচের আঘাতে আমরা বিদ্ধ হই, যখন দেখি স্বাধীনতার শত্রুরাও এখানে এসে জড়ো হয়, ললাট কাপায়, বলে উঠে ‘সেইভ বাংলাদেশ’। অন্যদিকে ওল্ডহ্যামের শহীদ মিনার——-একুশের প্রদুষে শুধু এখানে ক্ষীন আলো জ্বলে। পারস্পরিক দলীয়-দ্বন্ধীয় শ্লোগানে উত্তেজিত হয়ে উঠে মিনারের চারপাশ। আগের মতো সারা নর্থওয়েষ্ট থেকে অসংখ্য বাঙালিদের কোলাহলে আর জেগে উঠে না ওল্ডহ্যাম। মারামারির লজ্জায় অনেক আগেই মহিলারা এখানে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এই একটা প্রহর ছাড়া সারা বছর এখানে কেউ আসে না, প্রতিবাদের উচ্চারন প্রতিধ্বনিত হয় না কখনো এ মিনার থেকে। লজ্জার সাথে বলতে হয়, আদর্শের দল-দ্বন্দ্বীয় ব্যর্থতায় স্বাধীনতা বিরোধীরা এখানে লম্প-ঝম্প করে, সরকারের পতন চায় , এমনকি একুশের মধ্যরাতে। এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে ওল্ডহ্যাম শহীদ মিনার এখন আর সার্বজনীন হয়ে উঠে না। ব্ংালাদেশের বাইরে প্রথম স্থায়ী শহিদ মিনার তৈরীর পরও সেই আগের মতোই পাশের শহর ম্যানচেষ্টারে অস্থায়ী মিনার বানাতে হয়। বিভিন্ন শহর থেকে ম্যানচেষ্টারে আসে মানুষ এসে ফুল দেয় অস্থায়ীভাবে নির্মিত শহীদ মিনারের পাদদেশে। পুরুষ-মহিলা-শিশুদের কোলাহলে ম্যানচেষ্টার কিছুটা হলেও জায়গা করে দিচ্ছে সকল মানুষের। এখন জল্পনা চলছে আরেকটা স্থায়ী মিনার নির্মাণের। এরকম দ্বন্ধ সংঘাত এই শহরে প্রগতিশীলদের ক্রমেই দূর্বল করছে আর প্রতিক্রিয়াশীলরা আস্কারা পাচ্ছে তথাকথিত প্রগতি আর দলীয় দ্বন্ধের কারনে।
সম অধিকার পাওয়ার এবং আইন শৃংখলা মানা এই দেশটাতে যে কেউ প্রবেশাধিকার পেতেই পারে এই শহীদ মিনারের আঙ্গিনায়। স্থানীয় প্রশাসন এতে শৃংখলিত সভা কিংবা সমাবেশের অনুমতি দেবেই। সে হিসেবে যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা না মানা কেউ লন্ডনের শহীদ মিনারে সভা করে এতে আমাদের পরাজয় ভাবার কোন কারন নেই। কিন্তু পরাজিত হই আমরা তখনই, যখন গগন বিধারী সমান শ্লোগান উঠে কন্ঠে, বক্তৃতায় একই আদর্শের জয়গান গায় সবাই অথচ সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পথ করে দেয় সেই স্বাধীনতা না মানা শক্তির। নেতৃত্বের প্রতিযোগীতাকে কেউই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখবে না। বড় দলতো বটেই, ছোট ছোট দলগুলোতেও আছে নেতৃত্বে যাবার প্রতিযোগীতা। কিন্তু এই প্রতিযোগীতা যখন এখানে রক্তারক্তিকে গিয়ে গড়ায় তখন এটা আর আদর্শের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও এটা হয়ে যায় হাস্যকর। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্যে লজ্জারও।
৩) এরই মাঝে শহীদ দিবসকে সামনে রেখে বিভিন্ন সংগঠন হাতে নিচ্ছে বিভিন্ন আয়োজনের। শহীদ দিবসকে মর্যাদা আর গর্বের সাথে স্মরন করতে সংগঠনগুলোর উদ্যোগ আছেই। গত বছর লন্ডন শহিদ মিনারে শ্লোগান এড়িয়ে যাবার জন্যে কথা উঠেছিলো। সংগঠনগুলো যাতে দলীয় সংকীর্ণতা পরিহার করতে পারে কিংবা শ্লোগানে নিজস্ব লোকবল দেখানোর প্রয়োজনে আভ্যন্তরিন কোন্দল রক্তারক্তিতে না গড়ায় সেজন্যে এই উদ্যোগটা কিছুটা হয়ত কাজও দিয়েছিলো। এবারের শহিদ দিবসে এরকম আয়োজন সম্মিলিতভাবে নেয়া যায়, তাহলে শহীদ দিবস ভাবগম্ভির এবং মর্যদার সাথেই করা যেতে পারে। একটা ব্যাপার ভাবতে হবে, যেহেতু এটা বাংলাদেশ নয়, সেহেতু প্রশাসনও কোন দল কিংবা ব্যক্তির হয়ে কাজ করে না। কার আগে কে ফুল দেবে তা নিয়ে সমঝোতার বিকল্প নেই। শ্লোগানের উচ্চকিত প্রয়োগ কিংবা ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের বিশালতাকে দেখানোর প্রয়োজনে একুশের প্রথম প্রহরের অনুষ্ঠান পন্ড হয়ে গেলে মূলত প্রাপ্তিটা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিরই। এই অপশক্তির সাথে আপোষের কোন সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না, আর সেকারনেই দলীয় কোন্দলকে পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্তত এসকল ইস্যুগুলো মোকাবেলা করা যেতে পারে।
৪) পৃথিবীর দেশে দেশে একুশে কিংবা বাংলা ভাষার আহবান ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। জাতিসংঘের প্রধান ভবনের সামনে কিংবা ওল্ডহ্যামে-লন্ডনে-জাপানে বাঙালির এ শহিদ মিনার যুগে যুগে পৃথিবীর সেই মানুষদেরই প্রাণিত করবে, যারা অধিকার আদায়ের জন্যে লড়ছে। গনতন্ত্র-মৌলবাদ কিংবা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সকল জাতি আর ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্যে এ মিনার প্রেরণার উৎস হতে থাকবে নিরন্তর। বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামও শেষ হয়ে যায় নি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষদেরও জঙ্গবিাদ রুখতে কঠিন পথ পরিক্রমন করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এুশের চেতনা নিয়ে এই দেশটাকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে হবে প্রতিষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি-দুবৃত্তায়নের বিরুদ্ধে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk