ক্ষমা চাওয়া এবং রাজনৈতিক বিকৃতির পতন

Share Button

Faruk-Joshi
ফারুক যোশী ::  পৃথিবীটাই যেন একটা শংকার মধ্যি দিয়ে পরিক্রমন করছে এক অশান্ত সময়। এই অশান্ত সময়টা নিয়ে এসেছে সংকট-সমস্যা চারদিকে। জঙ্গী-আইএস তথা মুসলিম মৗলবাদ প্রভৃতি শব্দগুলো এখন পৃথিবীর বার বার বহু উচ্চারিত নাম। হোয়াইট হাউস থেকে ক্রেমলিন কিংবা ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটা ত্রাসের নাম যেন আইএস। এই ত্রাস ছড়িয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত-পাকিস্থান কিংবা বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে। পশ্চিমা দেশের রাজনীতি তথা সারা বিশ্বের রাজনীতিই যেন চলছে এই সন্ত্রাসীদের নাম নিয়ে।

বাংলাদেশে যখন কোন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলে, তখনই টেনে আনা হয় আইএসের নাম। ফ্রান্সের সন্ত্রাসী হামলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের তাজিয়া মিছিলে হামলা হয় কিংবা শিয়া মসজিদে হামলা হয়, নাম আসে আইএসের। সত্যি কথাটা হলো, আইএস নামটি এমন এক জায়গায় পৌছে গেছে, এই নামটি এখন মুসলমানদের ইমেজকে ম্লান করে দিচ্ছে। কিন্তু যখন রাশিয়া সিরিয়ায় আইএস দমনে হামলা চালায়, পশ্চিমা বিশ্বের সিরিয়ার জনগণের প্রতি মায়াকান্না দেখে তখন পৃথিবীটা যেন বিস্মিত হয় না। শুধু আমাদের তখন ভাবতে ইচ্ছে করে, এই আইএসকে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার দিয়ে জিইয়ে রাখে কে বা কোন্ দেশ ? বাংলাদেশে অভিজিৎ হত্যাকান্ড ঘঠে, কিংবা প্রকাশকদের উপর হামলা হয়, চাউর হয় আইএসের নাম। কিন্তু যখন ঐ খুনিদের কেউ কেউ ধরা পড়ে, তখন পরিস্কার হয়ে উঠে একাত্তরের সেই পরাজিত শক্তি এরাই।

২) বাংলাদেশে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী একাত্তরে তাদের কর্মকান্ডের জন্যে দোষ স্বীকার করেছেন। যে কাজটি আগে তার স্বগোত্রীয় ফাঁসীকাস্টে ঝোলা কেউই প্রকাশ্যে স্বীকার করেন নি। । বরং তারা ভিন্ন পথ নিয়েছিলেন। তারা কিংবা তাদের দল কিংবা তাদের জোট বিভিন্নভাবে অস্থির করতে চেয়েছে গোটা দেশ। লাশ-আগুন নিয়ে সারা বাংলাদেশকে পুড়িয়ে দিতে চেয়েছে। শত-সহস্র-কোটি টাকার মিশন নিয়ে আন্তর্জাতিক তদ্বীর সব কিছুই হয়েছে। তদ্বীর এমন পর্যায়ে পর্যন্ত পৌছেছে যে, শুধুমাত্র বাংলাদেশের ফাঁসী নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা বিবৃতি দিয়েছে,প্রতিবাদ করেছে। অথছ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সোৗদিআরব তথা মধ্যপ্রাচ্যে যুগ যুগ ধরে চলমান বিচারিক হত্যা কিংবা মৃত্যুদন্ড নিয়ে এরা মুখ খোলে না। এমনকি আমেরীকার কোন কোন প্রদেশে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বিচারিক প্রক্রিয়া থাকলেও এই এলাকাগুলো নিয়ে তথাকথিত সভ্য দেশগুলো আর মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখনও নিরব। কিন্তু তারা ঠিকই বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলে। এবং শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের যখন ফাঁসীকাষ্টে ঝোলানো হয়,তখনই প্রশ্ন তোলে। এতসব প্রশ্ন,বিদেশী চাপ আর দেশীয় সন্ত্রাস সবকিছুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থানে থাকার কারনেই আজ বাংলাদেশ একটা নিজস্ব অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বিচার প্রতিহত করতে সকল ধরনের জঙ্গীত্ব যখন ব্যর্থ হয়েছে, তখন হয়ত শেষ রক্ষার জন্যে নিজামীদের সামনে ক্ষমা চাওয়ার এখন কোন বিকল্প নেই। তবে এ-ও হতে পারে, জীবনের শেষ সময়ে এসে অতীতের সকল পাপের পংকিলতায় পতিত নিজামী হয়ত শেষবারের মতো জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে দায়মুক্তি চাইছেন।

২) আসমা জাহাঙ্গির পাকিস্থানের এক মানবাধিকার কর্মী। তার বিরুদ্ধে পাকিস্থানের অসংখ্য মানুষ ক্ষুব্ধ। কারন তিনি তার আলোচনায় বাংলাদেশ প্রীতি দেখিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের দুই যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করায় ঘৃণা প্রকাশ করেন নি, প্রকারান্তরে বুঝিয়েছেন এটা তাদের প্রাপ্য ছিলো। বাংলাদেশ দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর পর সে পাওনাটা মিটাতে পারছে তাই।     কথা হলো পাকিস্থান কিন্তু এই মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। পাকিস্থানের জামায়াতে ইসলামী স্বাভাবিকভাবেই তাদের বশংবদদদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করায় তীব্র ক্ষোভ ঝাড়ছে তাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। এটা তারা করতেই পারে। কারন এরা তাদের বংশধর। এদের দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা জিইয়ে রাখছে। কিন্তু কথা হলো পাকিস্থান নামক রাষ্ট্রটিই এর বিরুদ্ধে চলে গেলো। সরাসরি তারা এই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এবং সে বিতর্ক তুলেছে। বাংলাদেশ যেখানে এ বিচারগুলোকে রাষ্ট্রের একটা দায় হিসেবে দেখে মানবতাবিরােধী অপরাধগুলোর বিচার একে একে করছে, তখন পাকিস্থান রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের এ বিচারকে মানবতা বিরোধী হিসেবে এমনকি তাদের সংসদেই উত্থাপন করছে।

আসমা জাহাঙ্গির একটা কথা একটু সাহসের সাথেই বলে ফেলেছেন, আর তাহলো বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করায় পাকিস্থানের কতিপয় লোকের ক্ষোভ কিংবা মায়াকান্নায় এটাই প্রকাশ পাচ্ছে যে, বাংলাদেশে এরা পাকিস্থানের চর হিসেবেই কাজ করেছিলো। পাকিস্থানের জন্যে এটা সংক্ষুব্ধ হবার মতো উক্তি যদিও, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যে এটা এক বার্তা বটে। যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যারাই অভিযুক্ত হচ্ছেন, তাদের প্রায় সবাই ই জামাতে ইসলামের সাথে যুক্ত নেতারা। জাতীয় পার্টি কিংবা বিএনপির যেমন, সাকা চৌধুরী কিংবা সৈয়দ কায়সারসহ দুএকজন যদিও রাজনৈতিক নামে ভিন্নভাবে পরিচিত, কিনতু মূলত তারা সেই একই আদর্শে বিশ্বাসী। কারন একাত্তরে তাদের মিশন ছিলো এক ও অভিন্ন।  সে হিসেবে জামায়াতে ইসলামী দলটি আপাদমস্থক যে পাকিস্থানের চর হিসেবেই কাজ করছে তা আসমা জাহাঙ্গিরের কথা থেকেই স্পষ্ট। যে কথাটি নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে, রাজনৈতিকভাবে এ দলটি একাত্তরে সরাসরি পাকিস্থানীই ছিলো এবং সেজন্যেই তারা পাকিস্থানের প্রয়োজনে মুজাহিদ-নিজামী-সাকা-মীর কাসেমরা সে সময়ের বাঙালিদের হত্যা-ধর্ষন-লুটপাটসহ অগণিত লোমহর্ষক কর্মকান্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন ।  সেজন্যেই হয়ত একটা কথা দীর্ঘদিন থেকে উচ্চারিত হচ্ছে  বাংলাদেশে এ দলটি নিষিদ্ধ করার। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ভিন্ন ভিন্ন সন্থাসী গুষ্ঠির উত্থান হয়েছে, এদের নিষিদ্ধও করা হয়েছে। সরকার কিংবা জনগণ যদি মনে করে এ দলটিও দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর পর তারা তাদের পাকিস্থান প্রীতিতে অটল আছে কিংবা একাত্তরের পবিত্র মুক্তিযুদ্ধকে দেশভাঙ্গার লড়াই হিসেবে এখনও দেখতে চায় কিংবা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্যে ক্ষমা না চেয়ে সেই নিষ্ঠুর চিন্তাধারা নিয়ে এগুতে চায়, তাহলে এই দলটির বাংলাদেশে একটা দল হিসেবে রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালানোর কোন নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না।

৩) খুন-ধর্ষন-লুটপাট অগণন অপরাধের সাথে যুক্ত একাত্তরে তারা ভুল করে নি—-রাজনৈতিক অপশক্তির এই যে মনোবৈকল্য ছিলো কিংবা তাদের ছিলো যে আতœশ্লাঘা এই বৈকল্য কিংবা গর্বের চুড়ান্ত পরাজয় হলো নিজামীর ক্ষমা চাওয়ার মধ্যি দিয়ে। দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর পর হলেও এটাই বাংলাদেশের বড় অর্জন যে, বিচার হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের। এবং এই দৃঢ়প্রত্যয়ের কারনেই বিজয়ের মাসের শুরুতেই আমরা শোনছি নিজামীর আর্তনাদ কিংবা ক্ষমা চাওয়া।

সাকার ফাঁসীর আগে-পরে তার চুলে জেল-লাগানো পুত্র যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে , যা হবার তা-ই হয়েছে। আগে হোক পরে হোক ইতিহাস সত্যের পথেই আগায়। সেকারনেই বলি ব্রিটেনে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাীদের জামাই কিংবা তার বশংবধরা যতই ‘বাংলাদেশ সেইভ’ করার ধান্ধায় এখানে সভা-সমাবেশ করুক না কেন আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, নিজামীও শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন, বলেছেন বাংলাদেশই সঠিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই পবিত্র যুদ্ধ। আর এর বিপরীতে যারা (নিজামী-সাকা-মুজাহিদ-আযম গং) ছিলো তারা খুনী, অপরাধী। বাংলাদেশ সেইভ করার নাম নিয়ে এদের সেইভ করার সময় শেষ হয়ে এসেছে। এদের রাজনীতি, এদের রাজনৈতিক বিকৃতির পতনের মধ্যি দিয়েই জেগে উঠছে বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk