ঘুণে খাওয়া জীবন

Share Button

12910735_10208885123667049_1028451077_n
শোয়াইব জিবরান

তিনি ঘর ছেড়ে ছিলেন, ঘুণপোকাদের ভয়ে, সে পূর্ণিমার রাতে, পুবের দেশে। আর পশ্চিমের রাজা ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন কর্তব্যবশে। ঘুণপোকারা তাঁর পেতেছিল মাটির শয়ান। অথচ সিংহাসন ছিল তাঁর, উঁচা আসমান।

ঘুণপোকা এমনই শক্তিশালী। অথচ তারা অন্ধ, ভাষা নাই। আছে শুধু রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভয়াবহ সংকেত রাশি; যা শক্ত কাঠকে গ্গ্নুকোজে রূপান্তরিত করতে পারে নিমিষেই। তারা কাঠ চেরাই করে চলে, নিঃশব্দে অন্তরে। আর নারীটি যেমন বলেছিল, বন পুড়লে সকলেই দেখতে পায়, কিন্তু মন পুড়লে দেখে না কেউ। যাকে নাগাল পায় এই সাদা পিঁপড়া, তার মুক্তি নাই। কেননা, এই সামান্য তুলতুলে দেহের সাদা পিঁপড়ারা এক সময় তেলাপোকাদের বংশধর ছিল, জুরাসিক যুগে।

লাল পিঁপড়াদের আমরা দেখিতে পাই। ফলত তারা সামান্যই ক্ষতি করতে পারে বৃক্ষের, মানুষের। তারা পাতা খায় গাছেদের আর মানুষরে কামড়ায়। তাতে বৃক্ষ মরে না, মানুষও না। কিন্তু যদি সাদা পিঁপড়া পায় নাগাল তবে কী বৃক্ষ, কী খাড়ানো মানুষ ঝুর ঝুর করে পড়ে যাবে।

এ কথা তো ঠিক, আমাদের আদি পিতা-মাতাকেও ধরেছিল এই ঘুণপোকা। পুরাতন নিয়ম বলছে, তারা নিষিদ্ধ ফলটি খেয়েছিলেন, আর ফলটির নাম বলছে জ্ঞানফল। আর এই জ্ঞানফল ভক্ষণের কামকে বলা হয়েছে- আদিপাপ। ফলত তারা স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন। অখনে দুষ্টু লোকেরা বলে, ওটি নাকি ছিল প্রথম কামের অনুভূতি। কেননা, তার পরই হাওয়া মা হয়েছিলেন।

সো, সৃষ্টির ভেতরেই লুকানো থাকে ঘুণপোকাটি। আর পোকাবিজ্ঞান বলছে, ঘুণপোকারা সবুজ বৃক্ষে ভ্রূণ আকারেই থাকে। কিন্তু বৃক্ষটি সতেজ, সজীব থাকলে এই ভয়াবহ সাদা পিঁপড়ারা কিছুই করতে পারে না। কিন্তু যখনই দেহের কোনো অংশ প্রাণহীন হয়ে পড়ে, তখনই সে ঝুরঝুর করে মাটি করে ফেলে।

এই জ্ঞানকাণ্ডের এই কথাগুলান বলতে বলতে আমার ভেতরে নামতে শুরু করছে অসংখ্যা সাদা পিঁপড়ার সারি। আজ তবে এইক্ষণে তাহাদের কথা একটু ভাবি। ভাবি তাদের ঠিকুজি, কুলজি, বংশপরিচয়।

দেখতে পাচ্ছি, শৈশবে সাং সিদ্ধেশ্বরপুরের পথে কবরস্থানের পাশ দিয়ে আমি হেঁটে চলেছি, ধুলোপায়ে। পায়ে সস্তা স্যান্ডেল, প্লাস্টিকের। ধূলিতে চরণ ময়লায় ঠাকুরের জুতা আবিষ্কারের সে রাজার দুঃখ আমার নাই। কিন্তু এক সকালে দেখি আমার কাজিন চলেছে চামড়ার খয়েরি বাটা জুতা পরে স্কুলের পথে। আর তখনই আমার মন উতলা হয়ে ওঠে জুতার বাসনায়! আর আমি সে রাতেই পিতাকে জুতার আবদারটি জানাই। পিতা যুক্তিবাদী হয়ে ওঠেন। বলেন, সবাই তো রাবারের জুতা পরেই স্কুলে যায়। তোমার সমস্যা কী? উপরন্তু এ বিলাসিতার কড়িও আমাদের নাই। আর তখনই আমার সত্তার ভেতরে মাবুদের লুকিয়ে লুকিয়ে রাখা ঘুণপোকারা জেগে উঠতে থাকে। সকালে স্কুলের পথে আমার চোখ দুটো থাকে মানুষজনের পায়ের দিকে। আমার চোখ খালি দেখতে থাকে কোন মানুষের পায়ে কেমন জুতা। দেখি অধিকাংশের পা-ই খালি। তবু আমার মন ভরে না। নিজ চরণযুগলের জন্যে। যার অলরেডি জুতা আছে। সন্ধ্যায় বসে টেবিলের নিচের স্যান্ডেল জোড়ারে নাড়াচাড়া করতে থাকি। আর পাঠে আমার মন আসে না চামড়া জুতার গন্ধে। এমনকি রাতে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি এক বিশাল চামড়ার লাল জুতা পরে আছি আর জুতা জোড়া আমারে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে, মেঘের ভেলা পার হয়ে। অবশেষে জুতা জোড়া আমি পাই। আর সদ্য প্রেমিকারে কাছে পাওয়ার পর যেমন প্রেমিক ছুঁয়ে দেখে, শুঁকে দেখে, তেমনি দেখতে থাকি পরম আদরে। আমার ভেতরের ঘুণপোকাগুলো দ্রুত মরে যেতে থাকে। তবে এইখানে প্রকাশ থাক, প্রেমিকাকে বিছানায় পাওয়ার পর যেমন প্রেমিক আগ্রহ হারাতে থাকে, তেমনি আমিও পায়ে পরার পর দ্রুত আগ্রহ হারাতে থাকি। কেবলই মাটির মনে হয়।

অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পর কবিতার ঘুণপোকা আমারে ধরে। পৃথিবীর তাবৎ বস্তুপুঞ্জরে শব্দে ধরার পাগলামো আমারে পেয়ে বসে। এক নানাই আমারে উৎসাহিত করতে থাকেন। তিনিই এক সন্ধ্যায় বলেন, শোনেন নাতি, কবিদের ভাত নাই। না খেয়েই সারাজীবন থাকতে হবে। এজন্য তোমারে এই কবিতা লেখারে একটা পেশার সাথে মিলাই নিতে হবে। কী সে পেশা? হুম। সাহিত্যের শিক্ষকতা। তখনে আমার চোখে ভাসে নানার ছেলে আমার মসুদ মামুরে। তিনি তখনে স্থানীয় কলেজে শিক্ষকতা করেন। তাঁর সম্মানের সীমা পরিসীমা নাই। লোকে তাঁরে প্রফেসার সাব বলে ডাকে। আর সারাক্ষণ তিনি সকলের সালাম পেতে থাকেন। এমন সম্মান যে তিনি তার সাইকেলটির হাতল ধরে রাখার সময়টি পান না। সারাক্ষণ একটি হাত তুলে সালামের উত্তর দিতে হয়, সাইকেল চালাতে চালাতেই। আমি ঠিক করি বড় হয়ে প্রফেসার সাব হব। তো কিসের প্রফেসার- সহজ; বাংলার প্রফেসার। সে থেকে আমারে বাংলার ঘুণপোকা ধরে। ফলত কলেজ পাস করে এক রাতে আমরা দুই উঠতি কবি- আমি আর মুজিব ইরম সিলেট থেকে অচেনা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেই। ততোদিনে আমাদের আরও বড় মন্ত্রদাতা অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ জুটে গিয়েছিলেন। তাঁরই সুপারিশের চিঠি লেখা বুক পকেটে।

ড. সফিউদ্দিন আহমেদ সিলেট এমসি কলেজ থেকে লিখেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে। কাকা, শোয়াইব, মুজিব বাংলায় পড়তে…

তখনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়নি। কিন্তু বাংলায় ভর্তি মিস কিছুতেই করা যাবে না। তাই কলেজের বাংলা বিভাগে হলেও আগেভাগে একটা অ্যাডমিশন নিয়ে রাখতে চাই। তাই এক সকালে বুক পকেটের সেই চিঠি নিয়ে দুরু দুরু বক্ষে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সমীপে ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগে উপস্থিত হলাম।

স্যার প্রথমে অত্যন্ত অবজ্ঞাভরে আমাদের আপাদমস্তক দেখে নিলেন। তার পরের বাক্যালাপ-

:তোদের কি ঢাকা শহরে বাড়ি আছে?

:গাড়ি?

:গ্রামে জমিদারি?

:তাহলে বাংলায় পড়তে এসেছিস কেন? বাংলায় পড়বে জমিদারের ছেলেরা। যাদের চাকরির দরকার নেই। তোরা পড়বি পাস কোর্সে। যা, ভর্তি হয়ে তাড়াতাড়ি পাস করে বেরিয়ে যা।

কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না। ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝালাম_ বাংলায় আমি পড়বই। এবার স্যার প্রকৃত কথা বললেন- এখানে বাংলায় ভর্তি হতে তদবিরের দরকার হবে না। এমনিতেই বাংলায় কেউ পড়তে আসে না, সিট ফাঁকাই থাকে। সময়মতো এসে ভর্তি হলেই হবে।

কিছুদিন পর সত্যিই ভর্তি হলাম। কিন্তু এবার শুরু হলো নতুন যন্ত্রণা। সর্বসাকল্যে ভর্তি হয়েছি ৭-৮ জন। আমি, মুজিব ইরম, কবির হুমায়ুন, রবিশঙ্কর মৈত্রী এরকম। স্যার প্রায় দিনই ক্লাসে এসে অপমান করছেন। একদিন এসে বললেন- : তোরা বিকেলে কী করিস?

:মেসে বসে পড়াশোনা করি।

:না, আমি জানি কী করিস! তোরা ছুটির পর নিউমার্কেটের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকিস। আর বিকেল বেলায় ইডেনের মেয়েরা যখন বের হয় তখন হাঁ করে তাকিয়ে থাকিস আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়িস। আমাদের কপাল ভালো তোদের দীর্ঘশ্বাসের ওজন নেই। না হলে তোদের দীর্ঘশ্বাসের ভারে এতদিনে নিউমার্কেট এলাকা কয়েক হাজার ফুট নিচে চলে যেত।

মুজিব ছিল মোটা। তাকে নিয়ে প্রায়ই মজার মজার কথা হয়। কিন্তু এ অপমান আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়। আমাদের অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে উড়াল দেওয়ার জন্য মন আঁকুপাঁকু করতে থাকে। উড়ালের জন্য ঘুণপোকারা আমাদের কুরে কুরে খেতে থাকে। আজ চারপাশে চেয়ে দেখে উড়াল দিয়ে বন্ধু মুজিব গিয়েছে লন্ডনে, রবিশংকর প্যারিসে আর আমি সে স্থানগুলো ঘুরে এই বাংলার এখানে ওখানে। এখনও উড়ালের ঘুণপোকারা আমাদের কুরে কুরে খায়। না অন্য কোনখানে, অন্য কোথাও।

ঘুণপোকারা ভীষণ সমাজবদ্ধ। তাদের কর্মের, শ্রেণীর, কাজের বিভাজন আছে। কেউ শ্রমিক, কেউ সৈন্য আর একজন রানী। তিনিই সকল কিছুর মূল। সুন্দরী, সাদাদের মাঝে সাদা, নরম আর তুলতুলে। তাকে পাওয়ার জন্য কতই না ঘটনা ঘটে ঘুণপোকাদের রাজ্যে। এই রানী ঘুণপোকাটিরে আমি চিনি। আজও তারে পুষে বেড়াই হৃদয়ের গভীরে। তার সাথে দেখা সেই শৈশবে। যে কবরস্থানটির পাশ দিয়ে স্যান্ডেল পায়ে হেঁটে যেতাম সেই ধুলোমাখা স্কুলের পথে। অবশ্য এ কথা না বললে, তখনে তার প্রেমে অনেকেই পড়ছিলাম। মৌমাছিদের সমাজে যেমন রানী মৌমাছি যখনে ফেরোমন নিঃসরণ করে, তখন লাখে লাখে মৌমাছি তার দিকে ছুটি আসে তারপর নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করে মরে। আমরার ক্ষেত্রে তেমনি হইছিল। অবশেষে আমি তার নিঃসৃত সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ছিলাম। কিন্তু এক সময় সে উড়ে চলে যায় দূরের দেশে। তারপর একদিন ঘুণপোকা হয়ে আসে আমার হৃদয়ে। যত দেখি মানুষের মুখ, সবমুখেই আমি তার মুখের আদল খুঁজি। আমার সকল সম্পর্কের মাঝখানে সে শুয়ে থাকে রবীন্দ্রনাথের মধ্যবর্তিনী হয়ে।

গৌতম এ ঘুণপোকাদের জানতেন। এ ঘুণপোকাদের দার্শনিক নাম বাসনা। তিনি বলছিলেন, জগৎ দুঃখময়। এবং এই দুঃখের কারণ তিনি জেনেছিলেন। কাঠের ঘুণপোকাদের দমনের জন্য পেস্ট কন্ট্রোলের নানা কিছিমের বিষ বাহির হয়েছে। কিন্তু মানুষের সত্তার গভীরের ঘুণপোকাদের দমনের উপায় কী? গৌতম এই প্রশ্নের জবাব পেতেই ঘর ছেড়েছিলেন পূর্ণিমার রাতে। আর তিনি জবাব পেয়েছিলেন। বাসনাত্যাগ। তবেই মিলবে মোক্ষ। কিন্তু সেটা কি সবসময় সম্ভব হয়? গৌতম সংসারচক্রে আটকে যাওয়ার সংশয় থেকে পুত্রের নাম রেখেছিলেন, রাহুল। মানে বাঁধা। আমরা বাঁধাগুলান এড়াতে পারি না। অনেক মহামানবও পারেননি কর্তব্যবশে। পুরাতন নিয়মে যেমন লেখা আছে নবী সলেমন মৃত্যুর পর দাঁড়ায়ে ছিলেন কর্তব্যবশে। কিন্তু ঘুণপোকা একসময় তাঁর ভর দিয়া দাঁড়ানো লাঠিটিও খেয়ে ফেলেছিল। ফলত তিনি ছিটকে পড়েছিলেন ধুলার শয্যায়। অথচ একসময় আকাশে কার্পেটে ছিল তাঁর আসন।

কত না বাসনায়, কর্তব্যে বাঁধা পড়ে আছে আমাদের জীবন। ফলে ঘুণপোকাদের খাদ্য আজ আমাদের হৃদয়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk