ছড়াকার সঞ্জয় সরকার এবং তাঁর ‘ছড়াছড়ি’

Share Button

13234869_1538057406500696_23343047_o

লুৎফুর রহমান

১৪২৩ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে বাঙালির দুয়ারে নতুন রূপে হাজির হলেন ছড়াকার সঞ্জয় সরকার। ছড়াকার হিশেবে তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় জাতীয় পত্রিকায়। তাঁকে চিনেন সকল ছড়াবোদ্ধারাও। ‘ছড়াছড়ি’ নামক ছড়ার ছোট কাগজ নতুন এ বছরে বাড়তি পাওয়া প্রত্যেক ছড়াকর্মীর। ছড়া থাকে বিপ্লবে, উৎসবে, জীবনের সকল বাঁকে। মিছিলে-মিছিলে ছড়াছড়ি হয় মানুষের মুখে। এক্ষেত্রে গণমানুষের কবি দিলওয়ার এর একটি ছড়া তুলে ধরছি, ছড়াটি তিনি আমাকে ২০০৫ সালে আমার সম্পাদিত ‘মুকুল’-এর ছড়া সংখ্যার জন্য এ ছড়াটি দিয়েছিলেন-

‘ছড়া নয় পানি পড়া/ নয় কোন মাদুলী,/
সে তো নয় ভিখারীর/ আনা সিকি আধুলি।/
ছড়া বয় রক্তের কণাতে/ অপমানে ফুঁসে ওঠে ফণাতে।/
অনলস সংগ্রামী আশাতে/ এক জোট মানুষের ভাষাতে,/
ছড়া তাই ঘরে ঘরে বিপ্লব/ অগ্রণী জনতার উৎসব’।

দিলওয়ারের ভাষায় ছড়া বিপ্লবে থাকে। আর এই বিপ্লবধর্মী চিন্তা রেখে ‘ছড়াছড়ি’র নামলিপি এঁকেছেন সোহেল আশরাফ। মাঝখানে আছে আইক্কাঅলা বাঁশ। এই বাঁশ যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি হাতিয়ার। চমৎকার শিল্পসম্মত এই নামলিপি ছড়াকার আর সৃজনশীল মানুষকে টানবে এই কাগজটির ভেতরে চোখ রাখার জন্য। সম্পাদক সঞ্জয় সরকার নিজভূম তথা নেত্রকোনা থেকে কাগজটি মুদ্রণ করেছেন। একটি মফস্বল অঞ্চল থেকে তিনি তাঁর ছড়ার প্রতি প্রেম আর দায়বোধ থেকে এপার-ওপার বাংলা এবং বিদেশে বসবাসরত ছড়াকর্মীদের মিলন ঘটিয়েছেন তাঁর এ ছড়ার কাগজে। অবশ্য কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট সহ দেশের বৃহৎ অঞ্চল থেকে ছড়ার মানসম্পন্ন কাগজ বেরুচ্ছে। এমনকি ছড়ার উৎসবও হচ্ছে নিয়মিত। নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত ‘ছড়াছড়ি’তে সম্পাদক মলাটবন্ধি করেছেন ৫৫ জন ছড়াকারকে। ছড়াছড়ি’র শরীর জুড়ে আছে অর্ধশতাধিক ছড়াকারদের ছড়া, ছড়া বিষয়ক প্রবন্ধ, ছড়া সংবাদ এবং ছড়ার বইয়ের আলোচনা। সম্পাদক তাঁর সম্পাদকীয়তে বলেছেন, বয়স বা ছড়াকারের অবস্থান নয় বরং নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ি তিনি সাজিয়েছেন কাগজটির শরীর। এটি একটি ভাল কাজ। সৃজনশীল চিন্তার মানুষেরা নিঃসন্দেহে এটিকে স্বাগত জানাবেন। আর এমন কাজ মূলধারার প্রায় সবক’টি লিটলম্যাগ আজকাল করে থাকে।

ছড়াছড়িতে ছড়া বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন বিশিষ্ট ছড়াকার, ছড়ার কাগজ ‘আড়াঙ্গি’ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জাহান। ‘ছড়া-পদ্যের দ্বান্দিকতায় প্রকৃত ছড়ার দুর্ভিক্ষকাল’ শিরোনামের এ লেখায় তিনি ছড়া আর পদ্য যে আলাদা তা সহজ করে তুলে ধরেছেন। টেনে এনেছেন বিখ্যাত কিছু পদ্য আর ছড়ার উদাহরণও। তাই তিনি ছড়া ও পদ্যের শরীরকে আলাদাভাবে নির্ণয় করে ভাল ছড়া লেখার আহবান জানিয়েছেন। ছড়াগুচ্ছ-১ : পৃষ্ঠা ৯ থেকে ১৯ পর্যন্ত ছড়া ছড়িয়েছেন যথাক্রমে-অজয় দাশগুপ্ত, অদ্বৈত মারুত, অণিমা মুক্তি গমেজ, আওলাদ হোসেন রনি, আ ফ ম মোদাচ্ছের আলী, আবু সাইদ কামাল, আবেদীন জনি, আব্দুস সালাম, আমিনুল ইসলাম মামুন, আবদুল হামিদ মাহবুব, আনোয়ার হোসাইন খান সোহেল, ইলিয়াস বাবর, এইচ এম মোমেন ভূঁইয়া, এসএম মুকুল, কাদের বাবু, কামরুল আলম, কাহালার হেমু, চন্দনকৃষ্ণ পাল, চয়ন বিকাশ ভাদ্র, জগলুল হায়দার, জসীম মেহবুব, জুলফিকার শাহাদাৎ, জাহাঙ্গীর আলম জাহান, জাফর ইদ্রিস, তপন বাগচী, তানভীর হাসান নাছিম, নূরন্নবী খান জুয়েল।

প্রবন্ধ: ২ -তে ‘আমার ছড়া ভাবনা’ শিরোনােমে ছড়া বিষয়ক তাঁর আপন ভাবনা লিখেছেন ছড়াকার জসীম মেহবুব। তরুণ ছড়াকর্মীদের উদ্দেশে এটি তাঁর সরল বয়ান। পথ চলার পাথেয়। তিনি সহজ করে বলেছেন ছড়ার মেলায় কাউকে না কাউকে মডেল করে এগুতে হয়। হয় সুকুমার নয় রিটন বা অন্য কাউকে। আর এতে করে একজন ভাল ছড়াকার হয়ে ওঠা যায়। ছড়াগ্রন্থ আলোচনাতে সঞ্জয় সরকার এর ‘জানতো কে আর তুই যে হবি সোনামুখী সুঁই’ ছড়াগ্রন্থ নিয়ে মুন্সীয়ানা ধারার আলোকপাত করেছেন পল্লব চক্রবর্তী। ছড়া সংবাদ বিভাগে স্থান পেয়েছে ছড়াসাহিত্যের দুটি বিশাল ছড়ার কাগজ। একটি লোকমান আহম্মদ আপন সম্পাদিত ‘ছড়াকর্ম’ অন্যটি জাহাঙ্গীর আলম জাহান সম্পাদিত ‘আড়াঙ্গি’। দুটি ছড়ার কাগজ নিয়ে পাঠককে চমকপ্রদ জানান দেওয়া হয়েছে এই বিভাগে।

ছড়াগুচ্ছ: ২-তে সূচিবদ্ধ হয়েছেন যথাক্রমে ছড়াকার প্রবীর বিকাশ সরকার, বশির আহমদ জুয়েল, বিধান মিত্র, ব্রত রায়, মোজাম্মেল হক নিয়োগী, মনিরুজ্জামান রাফি, মাহমুদ তাওসীফ, মাহবুবা খান দ্বীপান্বিতা, রইস মনরম, রকিবুল ইসলাম, রহমান জীবন, রানা জামান, রাজন ভট্টচার্য, রেবেকা ইসলাম, লোকমান আহম্মদ আপন, লুৎফুর রহমান, শ্যামলেন্দু পাল, সঞ্জয় সরকার, সাঈদ সাহেদুল ইসলাম, সুবীর বসাক, সোহেল মল্লিক, সৈয়দ মাশহুদুল হক, হাসনাত আমজাদ, হাসান রাউফুন।

৩৬ পৃষ্ঠার এ ছড়ার কাগজটিতে একটিও বিজ্ঞাপন নেই। আমার দেখা প্রথম ছড়ার কাগজ। বিজ্ঞাপন হীন! অন্য কোন ছড়ার কাগজ এমন থাকলেও আমি জানি না, দেখিনি। এক্ষেত্রে সম্পাদক নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর চরম দুঃসাহস দেখিয়েছেন। সাধুবাদ জানাচ্ছি। তবে এই ছড়ার কাগজে ছড়াসম্রাট লুৎফর রহমান রিটন এর কোন অংশগ্রহণ নেই এটি একটি অপূর্ণতা কাগজটির জন্য। আর আঞ্চলিক ছাপাখানা থেকে ছাপাকৃত কাগজটি মুদ্রণশিল্পগত মান ভাল হয়নি। আরো ভাল মান হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে গেটআপ এর বেলা খেয়াল করলে অনেকটা রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করি। আর আগামিতে ছোট পরিসর না করে বছরে বা দুই বছরে একটি সংখ্যা করে হলেও বর্ধিত পরিসরে এপার-ওপার বাংলাসহ বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল ছড়াসাহিত্যিকের সম্মিলন আর ছড়া নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী লেখা ছাপানোর জন্য সম্পাদককে অনুরোধ করছি। এতো সুন্দর একটি কাগজ নিজের পকেটের টাকায় আমাদেরকে উপহার দেওয়ায় সকল ছড়াকর্মীদের পক্ষ থেকে সঞ্জয় দা-কে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জয়তু ছড়াছড়ি। জয়তু ছড়াকার সঞ্জয় সরকার।

লেখক: ছড়াকর্মী, সম্পাদক-মাসিক মুকুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop