ছড়াক্কা এবং কিছু কথা…

Share Button

13236083_1538853496421087_731329832_n

লুৎফুর রহমান 

 

সতীশ বিশ্বাস। বাংলা ছড়াসাহিত্যের এক প্রাণপুরুষ। ওপার বাংলা থেকে সম্পাদনা করেন ছড়ার কাগজ ‘ছড়াক্কা’। ‘ছড়াক্কা’র উদ্ভাবকও তিনি। ৬ লাইনের ছড়া বা কবিতার প্রথম ও শেষ লাইনের অন্ত্যমিল সমান থাকবে আর মধ্যখানের ৪ লাইন প্রথম ও ৬ নং লাইন থেকে অপেক্ষমান ছোট থাকা ছড়ার নাম দিয়েছেন -‘ছড়াক্কা’। তাঁর এ চিন্তায় ২২ বছর ধরে চলছে ‘ছড়াক্কা’ চর্চা। এটি এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এপার বাংলা-ওপার বাংলায় ‘ছড়াক্কা’ প্রকাশ হচ্ছে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পত্রিকার সাহিত্যপাতা এবং শিশু পাতায়ও। আর তাঁর নিজের সম্পাদনায় বের হচ্ছে শুধুমাত্র ছড়াক্কা ছড়া নিয়ে কাগজ ‘ছড়াক্কা’।

হাতে পেলাম ‘ছড়াক্কা’র রবীন্দ্র সংখ্যা (মে ২০১৬)। চলিত সংখ্যার একলা শব্দ ছিল ‘নোঙর’। মানে একটি শব্দ দিয়ে আবার ছড়াক্কার প্রতি সংখ্যায় থাকে ছড়াক্কা ছড়া লেখার আয়োজন। এবার ‘নোঙর’ নিয়ে লিখেছেন-অমিতাভ গঙ্গেপাধ্যায়, মমতা দাশ, তপন দাশ, কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়।একলা শব্দ বিভাগে নোঙর নিয়ে লিখেছেন মমতা দাশ। তাঁর ছড়াটি বেশ মনকাড়া। তিনি লিখেছেন-
জীবন তরী তীর হারা তাই , মাঝ নদীতে নোঙর
সদাই ব্যস্ত জীবন
কষ্ট রোজের যাপন
মনটি চিন্তালিপ্ত
নিত্যই বিক্ষিপ্ত
মনের ঘরে অভিযোগের সদাই ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর।

মমতা দাশ কর্মঠ একজন ছড়াকার। এপার-ওপার বাংলায় তাঁর ব্যাপক পরিচিতি। তিনি তাঁর এ ছড়াক্কায় সুন্দর শব্দচয়ন আর ভাব প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁর অন্ত্যমিলটা আরো সবল করতে পারতেন। নোঙর/ঘ্যাঙর, জীবন/যাপন এসব অন্ত্যমিলে ছড়াটির শিল্পগুণ দুর্বল করেছে। এক্ষেত্রে সফল ছড়াকার অমিতাভ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি একই বিষয়ে লিখেছেন-
সমুদ্র পাঠালো ডাক তুলে নাও নোঙর
মুছে যায় তীর ভূমি
শেষবার তাকে চুমি
জাহাজ দিয়েছে পাড়ি
তার নেই ঘর বাড়ি
গল গল ধোঁয়া ছাড়ে, খোলা মুখ চোঙ ওর।
তিনি- নোঙর/চোঙ ওর, ভূমি/চুমি, পাড়ি/বাড়ি এসব চমৎকার অন্ত্যমিল দিয়েছেন। তুলেছেন পাঠক হৃদে ঝংকার। উহ্যশব্দ ‘বর্ণমালা’ নিয়ে ছড়াক্কা লিখেছেন-সংঘমিত্রা কর, শংকর দেবনাথ, মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। ছড়াক্কা গাঁথায় ছড়াগল্প লিখেছেন অপূর্ব দত্ত। তিনি ছড়াক্কার চাল ঠিক রেখে পুরো একটি বংশ রক্ষার গল্প শুনিয়েছেন পাঠককে। ছড়ার মাঝে শিল্পগুণ আর প্রাণবন্ত উপস্থাপন নজর কাড়ার মতো। এরপর আছে ১ এর সঙ্গে ৫ বিভাগে অলোক মিত্র, সংঘমিত্রা কর, উপাসনা পুরকায়স্থ, আবুল কালাম বেলাল এঁর ছড়াক্কা। মধ্যখানে আছে গতসংখ্যার মূল্যায়ন। বইমেলা সংখ্যার মূল্যায়নে লেখক উল্লেখ করেছেন ওপার বাংলার ছড়াকারদের সাথে এপার বাংলার ছড়াকার হাসনাত আমজাদ, রেবেকা ইসলাম, চন্দনকৃষ্ণ পালসহ অনেকে লিখেছেন। সাদামাঠা ছড়াক্কায় অসাধারণ রুচিবোধ ধরে রেখেছেন সম্পাদক। তিনি পাঠকের একঘেঁয়েমি কাটাতে ছড়াক্কার ছড়ার মাঝে মাঝে ছড়াক্কা নিয়ে ভিন্ন রকম আয়োজন সূচিবদ্ধ করেছেন। সম্পাদক ছড়াক্কা বিষয়ক সংবাদ জানিয়েছেন মাঝে-মাঝে। জানিয়েছেন ছড়াক্কা নিয়ে আয়োজনও। সুসংবাদে এসেছে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশ এর ডানপিটে বিভাগে নিয়মিত ছড়াক্কা প্রকাশিত হচ্ছে। আসলেই কোন কিছু কেউ না কেউ তো আবিষ্কার-ই করে। সতীশ দা’র এই আবিষ্কার নিরেট আধুনিক আর সৃজনশীল। তাই ডানপিটে কেন আমাদের সকল ছড়াকর্মীদের তাঁর ছড়াক্কা চর্চা করা উচিত। তিনি তাঁর বুকের গহীনে ছড়ার প্রতি যে টান আছে সেটি থেকেই জন্ম দিয়েছেন ‘ছড়াক্কা’র। তাঁর এই ভালবাসার মূল্য দিতে হবে আমাদেরকে। আর তা ছড়াক্কার প্রচার, প্রসার ও চর্চার মধ্য দিয়ে। আবার আসছি ছড়াক্কা প্রসঙ্গে। ছড়াক্কার শরীরজুড়ে আছে ছড়াক্কা অনেকেরই। সুবীর বসাক, রেবেকা ইসলাম, আবুল কালাম বেলাম, বশির আহমদ জুয়েল, জিয়া হক, অনন্য আমিনুল সহ অনেকের ছড়াক্কায় ছন্দের ঝংকার আনে। বাসুদেব খাস্তগীর লিখেছেন একহালি ছড়াক্কা। আবার চমৎকার একডজন ছড়াক্কাও ছাপা হয়েছে ছড়াক্কার আয়োজনে।লিখেছেন ছড়াকার দিগম্বর দাশগুপ্ত। আছে ইংরেজি ছড়াক্কা, ছক্কা কবিতা ও বাংলাদেশের ছড়াক্কা। সবমিলিয়ে ছড়াক্কা একটি অসারাণ প্রকাশনা। ছড়াক্কা যেমন সৃজনশীল আবিষ্কার ঠিক তেমনি এই কাগজও। তবে অনুরোধ করছি ছড়াক্কায় কী ‘বাংলাদেশের ছড়া’ বিভাগ নামে আলাদা দেওয়া বেশি প্রয়োজন? যদি না হয় তাহলে বাংলাদেশ না লেখলেই চলে। কারণ বাঙালি যেখানে সেখানে কাঁটাতারের বেড়াজাল না আনাই ভাল বলে মনে করি।

ছড়াক্কা নিয়ে আরেকটি প্রস্তাব রাখছি। আমাদের বাংলাদেশ থেকে আহমেদ রিয়াজ, মোজাম্মেল হক নিয়োগী সহ বেশ কয়েকজন শিশুসাহিত্যিক যুক্তবর্ণ ছাড়া কমবয়সি বাচ্চাদের জন্য ছড়া লিখছেন। এটি বেশ সৃজনশীল । তাই ছড়াক্কা যাঁরা লিখেন তাঁদের প্রতি অনুরোধ করছি আপনারাও বাচ্চাদের জন্য ছড়াক্কা লিখুন মুক্তবর্ণ দিয়ে। এসব ছড়াক্কা ঠোঁটস্থ হয়ে থাকবে আজীবন।

গতানুগতিকতার বাইরে সৃজনশীল এক ছড়াকর্ম-ছড়াক্কা। ছড়াক্কার জনক সতীশ দা এবং ছড়াক্কার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

লেখক: সম্পাদক, মাসিক মুকুল, ছড়াকর্মী।

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
AllAccessDisabledAll access to this object has been disabledBC05FA029A07A848PCsjCNaGNJe5LR37EUm8shabpwPl7QGhI7vSKfwUCEhy8mhVnccSAT4khjFW5vYYOQWwpzKLtN0=
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop