টলস্টয়ের পুনর্জন্ম

Share Button
download

জাকির তালুকদার ::

১৯৩৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর রূশ নাট্যকার ও গল্পলেখক লি.লি.আন্দ্রেইয়েফকে লেখা একটি চিঠিতে টলস্টয় কথাসাহিত্যিক বা লেখকের রচনাপ্র্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু দিক-নির্দেশনামূলক মন্তব্য করেছিলেন। এই মন্তব্যগুলি প্রকৃতপক্ষে সারা পৃথিবীর সকল ভাষার সকল শিক্ষানবিশ লেখকের জন্য চিরকালীন পাথেয় হতে পারে। নিজের অন্তর্দৃষ্টি এবং সুদীর্ঘ লেখকজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে টলস্টয় লিখেছেন- ‘আমি মনে করি লেখা প্রথমত, তখনই একমাত্র উচিত, যখন চিন্তাভাবনা, যেগুলো প্রকাশ করতে ইচ্ছা হচ্ছে, এমনই  অনিবার্য যে, যতক্ষণ না সাধ্যানুসারে তা প্রকাশ করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত লেখকের সে পিছু ছাড়বে না। লেখকের অন্যান্য সব প্রেরণা যেমন-আত্মশ্লাঘা এবং অন্যতম ঘৃণার্হ আর্থিক প্রেরণা- যদি-বা মূল প্রেরণা প্রকাশের তাগিদের সাথে যুক্ত হয়, তাহলে ওগুলো শুধু লেখার সারল্য ও উৎকর্ষতার পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটাকে খুবই ভয় করা উচিত। দ্বিতীয়ত, যা সচরাচর দেখা যায় এবং আমার ধারণা, বিশেষ করে এখনকার আধুনিক লেখকরা যে দোষে অপরাধী (সব ক্ষয়িষ্ণুতা এরই ওপর দাঁড়িয়ে আছে) তা হচ্ছে- বিশিষ্ট ও মৌলিক হওয়ার ইচ্ছা, পাঠককে বিস্ময়বিমূঢ়, হতচকিত করে দেওয়া। এ ধরনের ইচ্ছা সরলতাবর্জিত অথচ সরলতাই তো সুন্দরের প্রয়োজনীয় শর্ত। তৃতীয়ত, লেখায় তাড়াহুড়ো করা, এটা ক্ষতিকর এবং তদুপরি এ হচ্ছে নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রকাশের প্রকৃত তাগিদের অনুপস্থিতির চিহ্ন। কারণ যদি সে রকম প্রকৃত তাগিদ থেকেই থাকে তাহলে লেখক নিজস্ব চিন্তাভাবনাকে পূর্ণ বিকশিত করে স্পষ্টতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কোনো রকম শ্রম ও সময় নিয়ে চিন্তা করেন না। চতুর্থত, বর্তমান সময়ে অধিকাংশ পাঠকের রুচি ও চাহিদা পূরণে লেখকের ইচ্ছা। এটা বিশেষভাবে ক্ষতিকর এবং যা লেখা হচ্ছে আগেভাগেই তার সমস্ত তাৎপর্য এতে নষ্ট হয়ে যায়। সব রকম সাহিত্যগ্রন্থের তাৎপর্য এই যে এগুলো সোজা অর্থে শিক্ষাপ্রদ নয়, কিন্তু লোকজনের কাছে অজানা এবং নূতন কিছু উন্মোচন করে।’
টলস্টয়-গবেষকরা সবাই একমত যে বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে,জীবনের একটি পর্যায়ে এসে টলস্টয়ের কাছে সাহিত্য সৃষ্টি করার কাজটি গৌণ হয়ে পড়েছিল। সেই সময় তাঁর কাছে জীবনের মুখ্য, কিংবা বলা যায়, একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিল সত্য কথা বলা ও সত্যভাবে বাঁচা। তবে নিজের কাছে গৌণ হলেও অন্যদের কাছে টলস্টয়ের প্রধান কীর্তি সাহিত্যই। এখনো যেমন, কথাটি সেই সময়ের পাঠক তথা সকল রুশভাষাভাষীর জন্যই সত্য ছিল। তাদের কাছে একমাত্র বিবেচ্য টলস্টয়ের সাহিত্যকীর্তি। তবে একথাও তো সত্য যে জীবন-রাষ্ট্র-জনগণকে টলস্টয় যে দৃষ্টিতে দেখতেন, সেই দৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হতে না পারলে টলস্টয়ের মহাকাব্যিক উপন্যাসসমূহের সার্বিক তাৎপর্য অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। টলস্টয়ের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নৈতিক বিপ্লব। এটি এমন এক বিপ্লব যার ভিত্তি হবে বিবেক, যে বিপ্লবে বিত্তবানগণ স্বেচ্ছায় তাদের বিত্ত পরিহার করবে, অলসের দল সক্রিয় হবে এবং নতুন শ্রমবিভাগ হবে স্বাভাবিক ইশ্বরপ্রদত্ত নিয়মানুসারে, যে নিয়মে একের শ্রমে অন্যের মাত্রাতিরিক্ত অংশীদারত্ব থাকবে না। এই বিশ্ববীঁক্ষাই তাঁকে সাহিত্যের পাশাপাশি আরও অনেক সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল। টলস্টয়ই সেই সময়ে রাশিয়ার অভিজাতসমাজের প্রথম ব্যক্তি যিনি জারের বিভিন্ন স্বৈরাচারী জনবিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন এবং ধর্মীয় বিতর্কে অংশ নিয়ে হোলি সিনকের নিষেধাজ্ঞার পরে বাকি জীবনের জন্য চার্চ ত্যাগ করেছিলেন। চার্চ ত্যাগ করলেও নিজেকে তিনি গভীর নিষ্ঠাবান একজন খ্রিস্টান বলেই মনে করতেন। তবে যে খ্রিস্টধর্মের তিনি অনুসরণ করতেন তা ছিল যীশু ও তাঁর সঙ্গীদের প্রবর্তিত সরল ও জৌলুসহীন ধর্মাচার। হোলি সিনক ত্যাগের সময় তিনি যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল- ‘আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি; তাঁকে আমি আত্মা, প্রেম ও যাবতীয় বস্তুর সারাৎসার হিসাবে উপলদ্ধি করি। আমি বিশ্বাস করি তিনি আমার মধ্যে আছেন যেমন আমিও তাঁর মধ্যে। আমি বিশ্বাস করি, প্রেমোপলদ্বিতে অগ্রসর হওয়ার একটিই পথ: প্রার্থনা। ধর্মমন্দিরে গণপ্রার্থনা নয়, যীশুখ্রিস্ট স্পষ্টভাবে তার নিন্দা (মথি, ৬: ৫-১৩) করেছেন; সেই প্রার্থনা যা তিনি নিজে আমাদের শিখিয়ে গেছেন; একক প্রার্থনা, যার মধ্যে মনুষ্যজন্মের সার্থকতা সম্বন্ধে সচেতনতা এবং ঈশ্বরেচ্ছায় আমরা চালিত হতে বাধ্য-এই বিশ্বাস কোনো লোক নিজের মধ্যে পূণরুদ্ধার ও বলবতী করে তোলার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়।’ একই সঙ্গে টলস্টয় চার্চ বা তৎকালীন খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের বিরোধিতা করতেন এই বলে যে তারা মানুষকে যীশুর সঠিক শিক্ষা ভুলিয়ে দিচ্ছে এবং মানুষকে শুদ্ধতার সাধনার পরিবর্তে নিয়ম-শৃঙ্খলের বন্ধন মেনে নিতে প্ররোচিত করছে। দিনপঞ্জিতে লিখলেন-‘ তৃতীয় শতাব্দী থেকেই গীর্জা মানে আর কিছুই নয়, কেবল মিথ্যা, নিষ্ঠুরতা ও প্রতারণা।’ আর গীর্জাকে এইসব অপকর্মে সর্বাত্মক সাহায্য করছে রাষ্ট্রের গণবিরোধী আইন, জার স্বয়ং এবং রাশিয়ার অলস ও পরজীবী অভিজাত শ্রেণি। ‘রেজারেকশান’ বা ‘পুনর্জন্ম’ বা ‘পুনরুত্থান’ উপন্যাসকে এইভাবে দেখলে সম্ভবত উপন্যাসটির টেক্সট তথা মর্মমূলে প্রবেশের ছায়াচ্ছন্ন ও স্বল্পালোকিত হলেও একটি পথ আবিষ্কার করার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
০২
যুবক টলস্টয় একদা তাঁর দিনপঞ্জিতে লিখেছিলেন- ‘আমার পেশা হচ্ছে সাহিত্য। লেখা! লেখা! আগামীকাল থেকে শুরু করে সারা জীবন ভর আমি এই কাজটিই করে যাব। নইলে বাদ দেবো সব কিছু-নিয়মকানুন, ধর্ম, সম্পত্তি, সব।’
অথচ সেই টলস্টয় পরবর্তীতে একাধিকবার লেখা ছেড়ে দিতে চেয়েছেন। একবার তাঁর এই সর্বনেশে সিদ্ধান্তের কথা জেনে অগ্রজ লেখক তুর্গেনিয়েভ হন্তদন্ত হয়ে চিঠি লিখেছিলেন- ‘হাজার মাথা খুঁড়েও আমি বুঝতে পারি না লেখক ছাড়া তুমি আর কী। দার্শনিক? কোনো নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা? সরকারি চাকুরে? এদের মধ্যে কোনটা তোমাকে বেশি মানাবে? দয়া করে তা জানিয়ে আমাকে চিন্তামুক্ত করতে মর্জি হোক।’
তখনকার মতো টলস্টয় আবার ফিরে এসেছিলেন সাহিত্যে। কিন্তু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বার বার।
নিজের লেখা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তাঁর কোনোদিনই ছিল না। কারণ পাঠক হিসাবে যিনি অসাধারণ, তিনি নিজের লেখাকেও যখন পাঠ করেন একজন পাঠকের সত্ত্বা নিয়ে, তখন সেই লেখার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বুঝতে তার সময় লাগে না। তা সত্ত্বেও নিজের বিভিন্ন রচনা সম্পর্কে মাঝে মাঝে অদ্ভূত ধারণা পোষণ করতেন টলস্টয়। ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ এবং ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাস দু’টিকে তিনি এই বলে প্রায় বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন যে, এই উপন্যাস দু’টি শুধু টাকার জন্য লেখা। তবে এটাও ঠিক যে ‘আনা কারেনিনা’ লেখার পরে তিনি মহাকাব্যিক রচনা সমাপ্ত করার একটি তৃপ্তিও লাভ করেছিলেন। ভেবেছিলেন এর পরে তাঁর আর উপন্যাস লেখার প্রয়োজন নেই। আবারও সেই লেখা ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত। তাঁর এই সিদ্ধান্ত হাহাকার সৃষ্টি করেছিল পাঠকসমাজে। এমনকি একবার তাঁর পত্নী জারের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে স্বয়ং জার তাকে এই বলে অনুযোগ করেছিলেন যে টলস্টয় কেন আর উপন্যাস লেখেন না?
টলস্টয় তখন শিল্পকে, এমনকি নিজের সাহিত্যকর্মকেও, একটি হালকা বিনোদনমূলক অভ্যাস বলে মনে করতে শুরু করেছেন এবং প্রকাশ্যেই বলছেন যে শিল্প জনগণের কোনো উপকার সাধনে সক্ষম নয়। বন্ধু ফিয়েৎ-কে চিঠিতে লিখলেন- ‘শিল্প মিথ্যা; এবং আমি আর এই মোহন মিথ্যাকে ভালোবাসতে পারছি না।’ তাঁর দিনলিপি থেকে জানা যাচ্ছে, সে সময় তিনি, তুর্গেনিয়েভ চিঠিতে যেমনটি লিখেছিলেন কিছুটা ব্যঙ্গ কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে,  একটি নতুন ধর্ম প্রবর্তনের ইচ্ছাও পোষণ করছিলেন। মানুষের ও মানবতার সার্বিক উন্নয়ন ও বিকাশসাধনই হবে তাঁর উদ্দিষ্ট নতুন ধর্মের মূল প্রেরণা। তার প্রস্তুতি হিসাবে টলস্টয়কে দেখা গেল নিজের জীবনযাপনকে প্রায় আমূল পাল্টে ফেলতে। আশপাশের গাঁয়ের ও পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিজের বাড়িতে ডেকে এনে খুলে দিয়েছেন স্কুল। পড়াচ্ছেন নিজেই। সব খরচ নিজেরই। এমনকি ছাত্র- ছাত্রীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করেছেন নিজে। তাদের জন্য লিখছেন সহজ পাঠ্যবই। লিখছেন ব্যাকরণ। কোনো কোনো সময় পুরুষবিহীন পরিবারের বিধবাদের জমি নিজে লাঙ্গল চালিয়ে চষে দিয়ে আসছেন। পোষাক নিয়ে পূর্বেই একবার বাড়িতে হই-চই হয়েছিল যথেষ্ট। টলস্টয় পোষাকের ব্যাপারে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। ধোপদুরস্ত বড়লোকি চালের জামাকাপড় পরতে তিনি আর রাজি নন। স্ত্রীর চেঁচামেচি, ছেলেমেয়েদের তীব্র আপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত একটি আপোস-রফা হয়েছিল এইমর্মে যে টলস্টয় কোট-টাইয়ের বদলে ঢিলেঢালা গলাবন্ধ এক ধরনের জামা পরবেন। এই পর্যায়ে এসে দেখা গেল টলস্টয় সেই শর্তও আর মেনে চলতে রাজি নন। এখন তিনি পরছেন কৃষক- শ্রমিকদের মতো সাদাসিধে পোষাক। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ধর্মপ্রচারের চিন্তাটি মাথা থেকে সরে গিয়ে ফিরে এলো আরেকটি উপলধ্বি। তা হচ্ছে- যে লিখতে জানে, লেখা চালিয়ে যাওয়া তার দায়িত্ব। তাই তিনি আবার লেখার জগতে ফিরতে মনস্থ করলেন। তবে ঠিক করলেন যে এখন থেকে যা তিনি লিখবেন সেই সব লেখা হবে সত্যের পক্ষে এবং জীবনের জন্য।
এই চিন্তা থেকেই বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে যাওয়ার পরে তিনি লিখতে শুরু করলেন ‘রেজারেকশন’। কেউ এটিকে বাংলায় বলেছেন ‘পুনরুত্থান’, কেউ বলেছেন ‘পুনর্জন্ম’। যদিও রেজারেকশন শব্দটির সাথে যে আধ্যাত্মিক অর্থদ্যোতনা জড়িয়ে আছে, পুনরুত্থান বা পুনর্জন্ম- কোনো শব্দ দিয়েই সে তাৎপর্য পুরোপুরি অনূদিত হয় না, তবুও বাঙালি লেখক-পাঠক এই শব্দ দুটিকেই রেজারেকশনের প্রতিশব্দ হিসাবে মেনে নিয়েছেন। উপন্যাস হিসাবে এটি সম্পূর্ণই ভিন্নধর্মী। এ যেন শুধু উপন্যাস নয়, তৎকালীন উত্তাল সময়ের গ্রন্থনা এবং গবেষণাও বটে। তাই উপন্যাস লেখার কাজে টলস্টয়ের বারংবার জেলগমন ও পরিদর্শন, বিচারকদের বিচারকার্যপদ্ধতিদর্শন, বারংবার লিখন, জেলের সিপাই-কয়েদিদের দৈনন্দিন জীবনের অনুসন্ধান।
‘পুনর্জন্ম’ বা ‘রেজারেকশন’ কার ?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় পুনর্জন্ম হচ্ছে উপন্যাসের মূল পুরুষচরিত্র জমিদারতনয় নেখ্লিউদফের। পিসির জমিদারিতে বেড়াতে গিয়ে সেখানে আশ্রিতা পিতৃমাতৃহীনা তরুণী কাতিউশা মাসলভার দিকে নজর পড়ে যুবক নেখ্লিউদফের। জমিদারতনয়ের কামনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারা তৎকালীন যে কোনো কৃষক-কন্যার পক্ষেই প্রায় অসম্ভব ছিল। তদুপরি নিজের মনের মধ্যেও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি কাতিউশার পক্ষে। কারণ সে নেখ্লিউদফের মেয়েপটানো কথাগুলিকে সত্যিকারের প্রেমবাক্য বলে বিশ্বাস করেছিল। ফলে নিজের যৌবনকে সে সঁপে দিয়েছিল নেখ্লিউদফের কামনার কাছে। নিছক কামনাই। কারণ পরবর্তী দশ বছর নেখ্লিউদফের জীবনে তো দূরের কথা, স্মৃতিতেও কোনো স্থান ছিল না কাতিউশার। দশ বছর বাদে নেখ্লিদউফ যখন তাকে পুনরাবিষ্কার করে, তখন কাতিউশা বাধ্য হয়ে পরিণত হয়েছে বেশ্যাতে। শুধু তাই-ই নয়, কাতিউশার বিরুদ্ধে উঠেছে অর্থ আত্মসাৎ ও নরহত্যার অভিযোগ। আদালতে জুরির বিচার চলছিল। অভিজাত সমাজের প্রতিনিধি, সেই সময়ে রাশিয়ার রাজধানীর সবচেয়ে এলিজিবল ব্যাচেলর নেখ্লিউদফের ডাক পড়েছিল একজন জুরি হিসাবে।
সেই বিচারালয়ে বিচারকের আসনে বসে হঠাৎ করে নিজেকেই আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় নেখ্লিউদফ। মনে মনে ভাবে কাতিউশার এই পরিণতির জন্য দায়ী কে? তার বিবেক জাগ্রত হয়। ফলে নেখ্লিউদফ দায়ী করে নিজেকেই। মামলার বিবরণ শুনে তার বিশ্বাস হয় না যে কাতিউশা টাকার জন্য মানুষ খুন করতে পারে। কিন্তু জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যরা কাতিউশাকে শেষ পর্যন্ত অপরাধী বলেই সাব্যস্ত করে। এই রায়ে নেখ্লিউদফের ঐকমত্য ছিল না। কিন্তু অন্যমনস্কভাবে সে জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যদের সাথে একমত হয়ে একই রায় দিয়ে বসে ও পরে সচেতন হয়ে শিউরে উঠে উপলব্ধি করে যে কাতিউশা কোনো অপরাধ না করেও চার বছরের সশ্রম কারাদ- ও সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের রায় পেয়েছে। পরদিনই সে বিচারক ও জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে কাতিউশার রায় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাতে থাকে। কিন্তু কেউই নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া এই বিচারকার্যটি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বা তা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। তখন এই রায়ের বিরুদ্ধে নেখ্লিউদফ কাতিউশার পক্ষে উচ্চতর আদালতে আপীল করে। আপীল যথারীতি নিষ্ফল হয়। তখন সে নিজের প্রভাবশালী আত্মীয় ও বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে মহামান্য জারের কাছে ক্ষমার আবেদন করে। জার এই অনুরোধে সাড়া দিয়ে কাতিউশার কারাদ- মওকুফ করেন। কিন্তু বহাল রাখেন সাইবেরিয়াতে নির্বাসন দন্ড।
নেখ্লিউদফ প্রতিজ্ঞা করে সে কাতিউশাকে এই অবৈধ দ- থেকে মুক্ত করবে। সেইসঙ্গে কাতিউশা যাতে আবার বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য না হয় এবং সমাজে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে সেজন্য তাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদাও দেবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু শুধুমাত্র সেটুকুকেই তার পাপমোচনের জন্য যথেষ্ট বলে মনে করতে পারে না নেখ্লিউদফ। তাই একই সাথে সেই দিনটি থেকেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করার যুদ্ধেও নেমে পড়ে সে। নিজেকে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায় বারবার। সে-ও কি অন্য জমিদারদের মতোই কৃষকের শ্রম শোষণ করে না? সে-ও কি অভিজাত সমাজে বহুল প্রচলিত পরকীয়া প্রেমে মত্ত হয়ে থাকে না? আবার একই সঙ্গে একটি যথার্থ কুমারীকে একেবারে নিজের সম্পত্তির মতো স্ত্রী  হিসাবে পেতে চায় না? সবগুলি প্রশ্নের উত্তরেই সে নিজেকে আসামীর কাঠগড়ায় দেখতে পায় এবং নিজেকে তার মানুষ হিসাবে অত্যন্ত নীচুস্তরের বলে মনে হতে থাকে। সে এবার তাই সত্যিসত্যিই পরিশুদ্ধ হবার চেষ্টা শুরু করে। পরকীয়া প্রেম থেকে সরে আসে। বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙ্গে দেয়। মানসিকভাবে প্রস্তুত হয় সাইবেরিয়ায় গিয়ে কাতিউশার সহযোগী হতে।
কিন্তু একরাত্রির কামুকতায় একটি নিরীহ নিষ্পাপ মেয়েকে পাপের পথে ঠেলে দেওয়া যত সহজ, তাকে সেই পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা তত সহজ নয়। তদুপরি কাতিউশা এখন আর কিছুতেই তাকে ক্ষমা করতে রাজি নয়। সে যা বলে তার সারমর্ম হচ্ছে-এসব কথা নেখ্লিউদফ তোমার মনে হওয়া উচিত ছিল দশ বছর আগে। তা হলে দুজনের জীবনটাই অন্য রকম হতে পারত। সেদিন যাকে দৈহিক কামতৃপ্তির জন্য ব্যবহার করেছিলে আজ তাকে ব্যবহার করতে চাও নিজের আত্মার মুক্তির জন্য। তোমাকে বিয়ে করার আগে আমি বরং আত্মহত্যা করব। আমার জীবনকে নষ্ট করেছ তুমিই। তোমারই ঔরসজাত সন্তান এলো আমার গর্ভে। তারও মৃত্য হলো অকালে। আবার  তুমি এসেছ। কী করতে? আমাকে মুক্ত করতে। বেশ ভালো। পারো তো করো। কিন্তু বেশ্যাবৃত্তি থেকে উদ্ধার করবে কি করে? বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া বেঁচে থাকার আর তো কোনো অবলম্বন নেই আমার। তোমার সঙ্গে বিয়ে? তা তো হতেই পারে না। আমাকে বিয়ে করে তুমি কোনোদিন সামাজিকভাবে সুখি হতে পারবে না। একটানা ত্যাগ স্বীকার করতে করতে তুমি হাঁফিয়ে উঠবে। এখন আবেগের বশে যে কাজটি তোমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে, তখন তা তোমার কাছে জীবনের বোঝা বলে মনে হবে নিশ্চিত। তখন তুমি আমার সাথে হয়তো সদয় ব্যবহার করে চলবে, কিন্তু তা হবে কৃত্রিম। তুমি আমাকে আগেও ভালোবাসোনি, ভবিষ্যতেও ভালোবাসতে পারবে না। তুমি নিজেকে মহিমান্বিত করার জন্য অবিরল আত্মত্যাগ করে চলবে। আমি তোমার অমন আত্মত্যাগ গ্রহণ করতে নারাজ।
সাইবেরিয়ার দীর্ঘ পথ পেরুতে অনেকগুলি দিন সময় লাগে। কাতিউশার সঙ্গে অনেকবার কথা বলে তাকে রাজি করানোর চেষ্টা করে নেখ্লিউদফ। কিন্তু কাতিউশা ততদিনে আরেক জাতের মানুষ দেখে ফেলেছে। তারা হচ্ছে জার-বিরোধী বিপ্লবী। তারাও বন্দি। সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে যাচ্ছে। এই প্রথম এমন ধরনের মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায় কাতিউশা। সে ভাবতে শুরু করে- কিসের জন্য এরা সর্বস্বত্যাগ করেছে, দুঃখকে ধারণ করেছে, বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত? এরা যা করছে তা কি  আত্মসুখের জন্য? ব্যক্তিস্বার্থের জন্য? না। তাদের সামনে রয়েছে এক মহান লক্ষ্য। সেটি হচ্ছে মাতৃভূমি রাশিয়ার মানুষের জন্য সার্বিক মুক্তি নিশ্চিত করা। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় কাতিউশার। তারা কাতিউশার জীবনের সব কথা শোনে। তারাই প্রথম কাতিউশাকে বোঝায় যে তার অতীতের অন্য রকম ব্যাখ্যাও হতে পারে। এবং সেই ব্যাখ্যাটিই সঠিক ব্যাখ্যা। তারা বুঝিয়ে দেয় যে কাতিউশা কোনোরকম দোষেই বিন্দুমাত্রও দুষ্ট নয়, অপরাধী নয়। সে পরিস্থিতির শিকার। বিপ্লবীদের কাছে সে ঘৃণ্য নয়। বরং অন্য দশজন মানুষের মতোই সমান মাপের মানুষ। এমনকি এক পর্যায়ে আজীবন সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দন্ডে দন্ডিতদ বিপ্লবী সাইমনসন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কাতিউশাও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সানন্দে রাজি হয় সাইমনসনের প্রস্তাবে। কারণ ইতোমধ্যেই সে উপলদ্বি করতে পেরেছে কমরেড সাইমনসনকে বিয়ে করে সে-ও আরেক কমরেডে পরিণত হবে। এই বিয়ে শুধুমাত্র দুইজন নর-নারীর জৈবিক মিলন নয়, বরং একসাথে বিপ্লবের জন্য কাজ করার সুযোগও। বিপ্লবের দিন তাকে কেউ বারাঙ্গনা বলবে না, বলবে বীরাঙ্গনা। প্রিন্স নেখ্লিউদফকে বিয়ে করলে কাতিউশার সম্মান আদৌ পুনরুদ্ধার হবে না। অভিজাত সমাজ তাকে মর্যাদা দেবে না। ঘৃণা করবে। নীচ চোখে দেখবে। হয়তো নেখ্লিউদফকেও একঘরে করবে। নেখলিউদফের ঔরসে তার গর্ভে কোনো সন্তান জন্ম নিলে অভিজাত সমাজ তার সন্তানকেও অপাংক্তেয় করে রাখবে। ধনীর স্ত্রী হয়ে জীবনভর এইসব অসম্মান সহ্য করার চাইতে সাইমনসনের কমরেড হওয়া, বিপ্লবের সহযাত্রী হওয়া বহুগুণে শ্রেয়।
কাতিউশা সাইমনসনকে বরণ করায় নেখ্লিউদফও মুক্তি পায়। ততদিনে সে-ও হৃদয়ঙ্গম করেছে যে তারও ঘর চাই, ঘরণী চাই, সন্তান চাই, নরনারীর স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই। কাতিউশা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। সে কাতিউশার প্রতি কর্তব্যের দায় থেকে মুক্ত। কাতিউশার মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা সে করেছে, যখন ব্যর্থ হয়েছে তার দন্ড মওকুফ করাতে, তখন নিজের জমিদারী প্রজাদের মধ্যে সহজ শর্তে বণ্টন করে দিয়ে সে কাতিউশার সাথে একই ভাগ্য বরণ করার জন্য স্বেচ্ছায় সাইবেরিয়ায় গেছে। কাতিউশা তারে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ না করলেও যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে নেখলিউদফের কাছেও সবচেয়ে যৌক্তিক মনে হয়েছে। নেখলিউদফের অন্তরাত্মা তাকে এই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তার অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন হয়েছে। সে এখন নতুন মানুষ। মানুষ হিসাবে তার পুনর্জন্ম হয়েছে।
আবার কাতিউশা মাসলভারও পুনর্জন্ম ঘটে। সর্বনাশের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে সে পাপের পথে যেতে বাধ্য হয়েছিল বটে, তবু তার মধ্যে কয়েকটি সদ্গুণ প্রবলভাবে টিকে ছিল। সে কিছুতেই মিথ্যা বলে না; এমনকি আত্মরক্ষার জন্যও নয়। সে পরদুঃখকাতর। পরের জন্য সাহায্য চায়, নিজের জন্য নয়। নিজের শত অসুবিধা সত্ত্বেও অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যেতে দ্বিধান্বিত নয়। বিনা অপরাধে সাজা পেয়েও সে বিচলিত নয়। নেখ্লিউদফ বা সাইমনসনদের মতো পুরুষদের কাছে কাতিউশার মতো নারী যা প্রত্যাশা করে তা আনুষ্ঠানিক বিবাহ নয়, ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই কাতিউশার মৃতসঞ্জিবনী। সেই ভালোবাসা দিয়েই তার পুনর্জন্ম।
এই উপন্যাস সারা পৃথিবীর পাঠকসমাজকে সবসময়ই আলোড়িত করেছে। আর রুশদের কাছে এটি শুধুমাত্র উপন্যাসই নয়, যেন তাদের জাতির পুনর্জন্মের দলিল। রুশদের অন্তরাত্মার সঙ্গে কেমনভাবে মিশে গেছে এই উপন্যাস, তার উদাহরণ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের জবানীতে। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – ‘আমি যেদিন অভিনয় দেখতে গিয়েছিলুম সেদিন হচ্ছিল টলস্টয়ের রিসারেকশন। জিনিসটা জনসাধারণের পক্ষে সহজে উপভোগ্য বলে মনে করা যায় না। কিন্তু শ্রোতারা গভীর মনোযোগের সাথে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে শুনছিল। অ্যাংলো স্যাকসন চাষী-মজুর শ্রেণির লোকে এ জিনিস রাত্রি একটা পর্যন্ত এমন স্তব্ধ শান্তভাবে উপভোগ করছে একথা মনে করা যায় না, আমাদের দেশের কথা ছেড়েই দাও।’
সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লব একদা বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষকে যে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল, সেই বিপ্লবের নেতা লেনিন বলতেন যে টলস্টয় হচ্ছেন রাশিয়ার বিপ্লবের দর্পণ। কাতিউশার যে বেশ্যাবৃত্তি নিয়ে টলস্টয় এত ভাবিত ছিলেন, যা থেকে মুক্তির কোনো উপায় তিনি খুঁজে বের করতে না পেরে সাইমনসনের চরিত্রটিকে উপন্যাসে সংযোজন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সাইমনসনদের উত্তরসূরি বলশেভিকরাই বিপ্লবের পরে রাশিয়া থেকে পতিতাবৃত্তি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk