বর্ষা ও বাংলা কবিতা

Share Button
পল্লব চক্রবর্তী

এ ভরা বাদল, ভাদ্র মাস। আমার মন্দির শূন্য। চারদিকে মেঘ গর্জন করছে, ভুবন ভরে বর্ষণ হচ্ছে, শত শত বজ্র পতিত হচ্ছে, ব্যঙ এবং ডাহুক ডাকছে। হৃদয়ে কাম দারুণ কিন্তু আমার কৃষ্ণ প্রবাসে।

বর্ষা সব সময়ই আমাদের কাছে অতি আদরণীয় অতিথি। কাব্য সাহিত্যে ঋতু বর্ণনায় বর্ষাই অধিকাংশ স্থান দখল করে আছে। তাকে নিয়ে আমাদের হাসি-কান্না অনেক দিনের। সহস্রাধিক বছর আগেকার আদি কবি বাল্মীকির কাছে আমরা বর্ষার অপরূপ বর্ণনা দেখতে পাই। চিত্রকূট পর্বতে যখন বর্ষা নেমে এসেছে তখন সমস্ত বনভূমি মেঘচ্ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে আবৃত হয়ে গেছে, আর অবিরত বর্ষণ চলছে চারদিকে। আদি কবির কাব্যে বর্ষার এই চিত্রটি অক্ষয় হয়ে আছে। তারপর মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূতম’ কাব্যে বিরহী যক্ষের মধ্যদিয়ে সর্বপ্রথম বর্ষাকে আমাদের হৃদয় বেদনার সঙ্গে প্রণয়ী জনের বিরহে এক সূত্রে গেঁথে দিলেন।কালিদাসের যক্ষের প্রেয়সী ছিলেন কৈলাসে অর্থাৎ হিমাচল প্রদেশে। আর যক্ষ অত্যন্ত ছোট খাট একটি অপরাধে এক বছরের জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন মধ্য ভারতের রামগিরি পর্বতে। তখন যোগাযোগের ভালো কোন ব্যবস্থা ছিল না। এরোপ্লেন, ট্রেন, বাস কিছুই ছিল না। পোস্টাল সাভিসও ছিল না। ফোনে জানানোর কথাতো প্রশ্নই আসে না। চুরি করে যে একবার প্রেয়সীকে দেখে আসবে যক্ষের সে উপায়ও ছিল না। যক্ষ তখন ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ রামগিরি পর্বত থেকে গজরাজের চেহারার একটি মেঘকে হাতে পায়ে ধরে পাঠালো অলকা পুরীতে তার প্রেয়সীর কাছে হৃদয়ের আর্তি বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বন্ধুরূপী মেঘ যক্ষের হৃদয় বেদনা নিয়ে নদ-নদী-নগরির ওপর দিয়ে অলকা অভিমুখে যাত্রা করলেন।কালিদাসের পর বর্ষার রূপটি আমরা ‘জয়দেবের’ বর্ষা বর্ণনায় দেখি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে বর্ষার বিচিত্র অনুভূতির জগৎটি সর্বপ্রথম দেখতে পাই বৈষ্ণব পদকর্তাগণের পদাবলী সাহিত্যে। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস প্রমূখ কবি বর্ষা বিরহ ও বর্ষা অভিসারের অনেক পদ রচনা করেছেন। তাঁদের কাব্যে বর্ষার সাথে প্রেম ও বিরহ শব্দ দু’টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। আমরা যদি পদাবলী সাহিত্যে বর্ষার পদগুলো আস্মাদন করি প্রথমেই মিথিলার কবি বিদ্যাপতির বর্ষা বিরহের শ্রেষ্ঠ পদটি আস্মাদন করতে হয়।এ সখি হামারি দুঃখের নাহি ওরএ ভরা বাদর মাহ ভাদরশূন্য মন্দির মোর।সখি আমার দুঃখের কোন শেষ নেই। এ ভরা বাদল, ভাদ্র মাস। আমার মন্দির শূন্য। চারদিকে মেঘ গর্জন করছে, ভুবন ভরে বর্ষণ হচ্ছে, শত শত বজ্র পতিত হচ্ছে, ব্যঙ এবং ডাহুক ডাকছে। হৃদয়ে কাম দারুণ কিন্তু আমার কৃষ্ণ প্রবাসে। পদাবলী সাহিত্যে বিদ্যাপতি যদিও বাঙালি নন বা বাংলায় কোন পদ রচনা করেন নি; তবুও তিনি বাঙালির শ্রদ্ধেয় কবি। বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলীর আদি রচয়িতা কবি হলেন চ-ীদাস। তিনি যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়কে অসীম মাধুর্যে পূর্ণ করে তুলেছেন। তাঁর বর্ষা অভিসার পদে লক্ষ্য করা যায়-এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটাকেমনে আইল বাটে।আঙ্গিনার মাঝে বঁধুয়া ভিজিছেদেখিয়া পরান ফাটে।।ভাব ভাষা ছন্দের চিত্ররূপ অলংকার বেদনা আর ব্যাকুলতা চ-ীদাসের বর্ষা বিরহের পদের মূল সুর বলে বিশ্ব মানব হৃদয় এতে খুব সহজেই সাড়া দেয়। চ-ীদাসের পর জ্ঞানদাসের অভিসারের পদের দিকে দৃষ্টি দিলেও বর্ষা ঋতুর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।মেঘ যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার।ঐছে সময়ে ধনি করু অভিসার।।বরিখত ঝর ঝর খরতর মেহ।পাওল সুবদনী সংকেত গেহ।।মেঘময় অন্ধকার রাত। এখন অভিসারের সময় হয়েছে।খরতর মেঘ ঝর ঝর করে বর্ষণ করছে। উভয়েই পূর্ব নিদৃষ্ট ঘরে গেল। বৈষ্ণব কবিদের নায়ক-নায়িকা বর্ষার রাতে অভিসারে বের হন। আকাশে মেঘ উঠলেই তাদের সঙ্গ লিপসা বর্ধিত হয়।অনুরূপ ভাব গোবিন্দ দাসের অভিসারে পংক্তিতেও দেখা যায়-‘অম্বরে ডম্বর ভরু নব মেহ।বাহিরে তিমির না হেরি নিজ দেহ।।নব মেঘের দল আকাশ ভরে আছে। বাইরের অন্ধকারে নিজের দেহ পর্যন্ত দেখা যায় না। এ দেখে নিজের অন্তরে কামনার বাসনা ও মিলনের তীব্র ব্যাকুলতা জেগে উঠল। মেঘ দেখে কেবল বিরহীজন নয়, জগতের সমস্ত সুখী লোকও আনমনা হয়ে পড়ে। তার মনের গভীরে বেদনার বোধ জাগে ও মন হয়ে যায় বিকল। পদকর্তাদের বর্ষার এ পদগুলোতে কি যে এক আত্মীক প্রণয়াকাক্সক্ষার জ্বালা, মিলনের গভীর উল্লাস ও বিরহের মর্মস্পশী ফুটে উঠেছে তা কেবল বর্ষার জন্যই সম্ভব হয়েছে। বর্ষার সাথে প্রেম ও বিরহের একটি অবিচ্ছেদ্য বন্ধন স্থাপিত হয়ে আছে। কিন্তু বর্ষার অন্য একটি রূপ দেখতে পাই মধ্য যুগে ষোড়শ শতাব্দীতে এক বাস্তবধর্মী জীবনবাদি কবি ‘কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী’র কাছে। তিনি তাঁর কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারমাসি দুঃখ বর্ণনা করতে গিয়ে বর্ষার বহিরঙ্গ বর্ণনায় ফুল্লরার দুঃখকে তীব্রতর রূপে প্রকাশ করেছেন।আষাঢ়ে পুরিল মহি নব মেধে জল।বড় বড় গৃহস্থের টুউয়ে সম্বল।।মাংসের পসরা লয়্যা বুলি ঘরে ঘরে।কিছু খুদ-কুড়া মিলে উদর না পুরে।।শ্রাবণে বরিষ মেঘ দিবস রজনী।সিতাসিত দুই পক্ষ একই না জানি।।আচ্ছাদন নাহি অঙ্গে পড়ে মাংস জল।কত মাছি খায় অঙ্গে করমের ফল।।আধুনিক কবিদের মধ্যে বর্ষার নিয়ে সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শিশু রবীন্দ্রনাথের প্রথম অনুভবের কবিতা ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’।  তারপর এই বিশ্ব-বিশ্রুত প্রতিভার অনেক মায়াবি অধ্যায় জুরে পাওয়া যায় বর্ষার অপরূপ কবিতা। তাঁর সৃষ্টির পরতে পরতে বর্ষার ছোঁয়া। প্রত্যেক ঋতুকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু না কিছু সৃষ্টিকর্ম রয়েছে কিন্তু বর্ষাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি। সাহিত্যের যে শাখাতেই তাঁর ছোঁয়া আছে সেখানেই বর্ষার রূপায়ণ। এ ক্ষেত্রে আমরা তাঁকে বর্ষার বরপুত্র হিসেবে ধরতে পারি।এসছে বরষা, এসেছে নবীন বরষাগগন ভরিয়া এসেছে ভুবন ভরসা।বর্ষা যেন কবির কাছে এক বহু কাক্সিক্ষত বার্তা নিয়ে এসেছে। এই নবীনা বর্ষা তাঁর কাছে জীবন্ত তরণী। শত শত যুগের করি মিলে তাকে নিয়ে এঁকেছেন কত বিচিত্র ছবি। আষাঢ়ে নব আনন্দ, উৎসব নব।অতি গম্ভীর অতি গম্ভীর অম্বরে ডম্বরু বাজে।আষাঢ়ে মেঘের গর্জন, বিদুতের নৃত্য, ঝর ঝর রসধারা সত্যই এক অনুভবের ব্যাপার। রবি কবির বর্ষার মূল সুর মূলত মেঘদূত পদাবলীর মতো বিরহেরই বাণী। রবীন্দ্র কাব্য সাহিত্যে মেঘদূতের প্রভাব সীমাহীন। তাঁর মানসীর ‘মেঘদূত’  ও ‘পত্র’ কবিতা, কল্পনার ‘স্বপ্ন’ ও ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতা, সোনার তরীর ‘বর্ষা যাপন’ ক্ষণিকার ‘সেকাল’ সমস্তই কালিদাস দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত। তাই এগুলো দুঃখের অন্তঃস্থলে সুখের বাস। এ কবিতাগুলো পাঠ মাত্র পাঠক হৃদয়ে এক ধরনের স্পন্দন জেগে ওঠে।এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়।এমন মেঘ দিনে বাদল ঝর ঝরে—অথবাসঘন গহন রাত্রি, ঝরিছে শ্রাবণ ধারা-অন্ধ বিভাবরি সঙ্গপরশরহারা।।হৃদয়ের গহনে যে দরজা, জমাট বদ্ধ যে স্তব্ধ ব্যথা তা একমাত্র রবীন্দ্রনাথের বর্ষার কবিতায় বন্ধ দরজা ঠেলে দিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মত ডানা মেলে আকাশে উড়ে চলে-মন মোর মেঘের সঙ্গী উড়ে চলে দিগ দিগন্ত পানেনিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণ সঙ্গীতেরিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম।।কবিগুরুর বর্ষার কবিতাগুলোতে বর্ষা আমাদের অনুভূতি জগতের এক প্রতীক্ষিত বাসনা।  তার আগমনে কত কিছুর আয়োজন।এসো শ্যামল সুন্দর,আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।অথবাএসো হে হৃদয় ভরা, এসো হে এসো পিপাসা হরাএসো হে আঁখি শীতল করা, ঘনায়ে এসো মনে।রবীন্দ্রনাথ তাঁর বর্ষার কবিতাগুলোতে এমন একটি জগৎ নির্মাণ করেছেন যে জগৎ চির শ্যামল, চির মধুর ও বেদনা রহিত। ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় নবযৌবনা বর্ষার যে বর্ণনা আমরা পাই তা বাস্তব বিবেচনায় অপ্রাকৃত হলেও আকর্ষণীয়। কেউ শঙ্খ বাজাচ্ছে, বধূরা হূলুধ্বনী দিচ্ছে, কুঞ্জকুটিরে রমণী ভাবাকুল নয়নে বসে আছে, কেউ ভূর্জপাতায় মনের কথা লিখছে আবার কেউ অঙ্গ প্রসাধন করছে।কোথা তোরা অয়ি তরুণী পথিকললনা’আনো মৃদঙ্গ, মুরজ মুরলী মধুরা বাজাও শঙ্খ, হুলুরব করো বধূরাএসছে বরষা ওগো নব-অনুরাগিনীওগো প্রিয়সুখভাগিনী!বর্ষার এ-সব কবিতায় প্রকৃতি বর্ণনা ও প্রকৃতির রূপ চিত্রণে তিনি নৈপুন্যের সাথে ও অবর্ণনীয় মাধুর্যের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান।বা, ওই মালতী লতা দোলে পিয়ালতরুর কোলে পূব-হাওয়াতে।বর্ষাতো আমাদের জন্য প্রকৃতির আশীর্বাদ। এ ঋতু না থাকলে বাংলায় সবুজের সমাহার হতো না। প্রকৃতি নতুন পাতার সতেজ নবীন প্রাণ নিয়ে নেচে ওঠতে পারতো না। এই মমতাময়ী বর্ষাই কদম, যুথী, মালতী, কেয়া বকুলের সম্ভারে প্রকৃতিকে রূপরাণী করে তোলে। বর্ষাই কবি মনকে ভাবিয়ে তোলে, ছন্দ দেয়, দোলা লাগায়, তাকে যথার্থ কবি করে তোলে। মোর ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো,দোলে মন দোলে অকারণ হরষেহৃদয় গগনে সজলঘন নবীন মেঘেরসের ধারা বরষে।রবীন্দ্র কবিতাতে বর্ষার দু’টি রূপ পাওয়া যায়। একটি যেমন বৃষ্টির ঝর ঝর চঞ্চল রূপ ও বিরহের বাণী অপরটি হলো অসিম সাহস বা শক্তির। এ-শক্তি যেন নির্ভীক মনের ভয়হীন কামনা। তাইতো তিনি ঝড়ের রাতেও তার অভিসারিকাকে খুঁজে পান।ওরে ঝড় নেমে আয়, আয়রে আমার শুকনো পাতার ডালেএই বরষার নব শ্যামের গানে।।যা উদাসীন, যা প্রাণহীন, যা আনন্দহারা।অথবাবজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালাতোমার শ্যামল শোভার বিদুতেরই জ্বালা।তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে ফসল ফলে-অমিত শক্তি নিয়ে কবি এখানে বর্ষাকে আহ্বান জানাচ্ছেন। পাঠক হৃদয়ের যন্ত্রণাকে মুছে নিয়ে যান তার সৃষ্টির বিচিত্র কৌশলে ও সমৃদ্ধতম হৃদয়ের মধুর সম্ভাষণে। মমতাময়ী এই ঋতু কবিকে প্রিয়ার মত – মায়ের মতই ভালোবেসে বা স্নেহে তার নীল আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে। আর কবি তাঁর সবুজ শ্যামল রূপে অবগাহন করেছেন কখনও বা বিরহে- আনন্দে অথবা শক্তির আবেশে। তিনি বার বার এই বর্ষার মোহিনী জলে স্নান করে লাভ করেন অমৃত আত্মীক স্বর্গ। ধুয়ে মুছে ফেলেন সমস্ত পৃথিবীর জরাজীর্ণ আর পুরাতনের অভিশাপ। কাব্য পাঠক সমাজকে নিয়ে হয়ে ওঠেন এক পবিত্র শুদ্ধতম চির নতুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk