বিশেষ সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আবুল মকসুদ: বাংলাদেশ দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে

Share Button

Polo_Maksud

সাম্প্রতিককালে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, উগ্রবাদী তৎপরতা, লেখক-প্রকাশকদের উপর হামলা-গুপ্ত হত্যার কারণ অনুসন্ধানে বিশিষ্ট লেখক-গবেষক এবং দেশের নাগরিক সমাজের অন্যতম নেতা  সৈয়দ আবুল মকসুদের এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আজিজুল পারভেজ।

আজিজুল পারভেজ: দেশে গুপ্ত হত্যা, হত্যা প্রচেষ্টা বেড়েছে। এতো দিন ব্লগার-লেখকদের হত্যার করা হচ্ছিল, এবার প্রকাশককে হত্যা করা হলো। অনেকেই এটাকে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে দেখছেন। আপনি কী ভাবছেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ : বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত অনেকগুলি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে যা, অতীতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের থেকে একেবারেই আলাদা। লেখালেখির কারণে আগের দিনে প্রতিবাদ হয়েছে কিন্তু শারীরিকভাবে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হন নাই। গত কয়েক বছরে ব্লগলেখকদের ওপর হামলা হচ্ছে। বিশেষ করে সেই সব ব্লগলেখকদের ওপর হামলা হয়েছে, নিহত হয়েছেন যারা ধর্মীয় বিষয়ে সমালোচনা করে লেখালেখি করেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কথাটি আপেক্ষিক, কে কোন বিষয়ে আহত হবেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যেমন-ইসলামের ব্যাপারে যদি কিছু বিরূপ লেখালেখি হয় তা হলে সব মুসলমানেরই ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলে সব হিন্দুরই ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যায় হঠাৎ কেউ বিশেষ করে অজ্ঞাত কেউ বা কোন গোষ্ঠী উগ্র হয়ে ওঠে এবং এ জাতীয় হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
রাষ্ট্রের কর্তব্য সেই গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা। সেই কাজটি না হওয়ায় এ জাতীয় হত্যাকাণ্ড ক্রমাগত ঘটছে।

আজিজুল পারভেজ: এ রকম হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ কি বলে মনে করেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ : গত কয়েক বছরে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত না হওয়া এবং কোন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে না পারার ফলে এ জাতীয় হত্যাকাণ্ড বার বার ঘটছে। এই ধরনের উগ্র গোষ্ঠী হয়তো বুঝে গেছে এই জাতীয় অপরাধ করে পার পাওয়া সম্ভব। এই যে বিচারহীনতা এর ফলে প্রশাসনের ওপর, সরকারের পুলিশ ও আদালতের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আজিজুল পারভেজ: অনেকে এই হত্যাকাণ্ডকে চিন্তার স্বাধীনতা, মুক্তি চিন্তার উপর হামলা বলে মনে করছেন…।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : চিন্তার স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাষ্ট্রেও নেই, কারোই নেই। চিন্তার স্বাধীনতা বলতে যে কোন ধরনের বিষয়ে মত প্রকাশকেই বোঝায়। যৌন বিষয়ে কারো ভিন্ন মত থাকতে পারে এবং সেই মতে বিরোধিতা করার অধিকারও সকলের আছে। রাজনৈতিক বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে। সরকারকে সমালোচনা করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। ধর্মীয় ব্যাপারেও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সকলের রয়েছে। এখন আমাদের এখানে দেখা যাচ্ছে – কেউ কেউ শুধু ধর্মীয় ব্যাপারে মুক্ত চিন্তার কথা বলছেন। এবং তাদের স্বাধীনতার দাবি করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক ব্যাপারে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে যখন হরণ করা হয় তখন প্রতিবাদ হতে দেখা যায় না। যেমন – বর্তমানে অনেকেই ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে সমালোচনার কারণে জেল খাটছেন।

স্বাধীনতা বলতে সব ধরনের চিন্তার স্বাধীনতাকেই নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া স্থান-কাল-পাত্র বলে একটা কথা আছে। কোন বিষয়ে, কোন জায়গায়, কোন সময়, কোন কথাটি বললে উত্তেজনার কারণ ঘটতে পারে – সে বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা দরকার। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সংযতভাবে ব্যবহার করা যেমন দরকার, তেমনি মত প্রকাশের কারণে কাউকে আক্রমণও করা যাবে না। আমরা লক্ষ্য করেছি, কিছু দিন আগে ব্লগে বা ফেসবুকে ধর্মীয় বিষয়ে লেখালেখির কারণে কেউ কেউ গ্রেফতার পর্যন্ত হয়েছেন। সুতরাং সমস্ত বিষয়টি যুক্তিযুক্তভাবে ফয়সালা করাই গণতান্ত্রিক সমাজের কাজ।

আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতা সব দিক থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার তার সমালোচনা সহ্য করে না। নেতাদের সম্পর্কে সমালোচনামূলক কথা বললে তার ওপর রাষ্ট্র থেকে আঘাত আসে, ধর্মের ব্যাপারে কথা বললে রাষ্ট্র থেকেও আসে, বিভিন্ন উগ্রগোষ্ঠী থেকেও আসে। আমাদের রাষ্ট্রের যে সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থাকার কথা সেই জিনিসটি নষ্ট হয়ে গেছে। তার ফলেই এই জাতীয় গুপ্তহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।
এ বিষয়ে একটি কথা বলতে চাই, খুব ক্ষতিকর মতও যদি কেউ মৌখিতভাবে হোক অথবা লিখিতভাবে প্রকাশ করে এবং তাতে যদি কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগে, আইনের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। কেউ বিতর্কও করতে পারেন। কিন্তু শারীরিকভাবে আঘাত, যখম হোক, খুন হোক তা ফৌজদারী অপরাধ। চিন্তার জগত এবং ফৌজদারী অপরাধ সভ্য জগতে এক সঙ্গে চলে না। ফৌজদারী অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি কাম্য।

আজিজুল পারভেজ: কোনে ঘটনা ঘটলেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়ে যায় পারস্পরিক দোষারোপ। সর্বশেষ ঘটনা – প্রকাশক ফয়সল আরেফীন দীপন হত্যার পরে সরকারী দল বললো বিএনপি-জামায়াত এই গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী বললেন সরকারের কারণেই এমনটা হচ্ছে…

সৈয়দ আবুল মকসুদ : প্রকৃত পক্ষে বর্তমানের যে বেদনাদায়ক পরিস্থিতি তার জন্যে আমাদের নষ্ট রাজনীতি প্রধানত দায়ি। এবং সেই নষ্ট রাজনীতির সুবিধা নিয়েই এক শ্রেণীর উগ্রগোষ্ঠী অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। যে কোন ঘটনা ঘটার পর আমরা দেখতে পাচ্ছি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পুলিশ ও প্রশাসন অভিন্ন সুরে-বিএনপি-জামায়াতকে অভিযুক্ত করছে। অন্যদিকে বিরোধী নেতারা কোন রকম তথ্য প্রমাণ ছাড়া সরকারি দলকে দোষারোপ করছে। এর ফলে উগ্রগোষ্ঠী বুঝতে পারছে পারস্পরিক দোষারোপের ফলে তারা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথাবার্তা সরকারি দলের নেতাদের মতই। সরকারের দলের নেতাদের সুরে কথা বলে তারা একদিক থেকে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্চেন, তারা নিরপেক্ষ তদন্ত করার প্রয়োজনবোধ করছে না। বিরোধীদলের দু’চারজনকে গ্রেফতার করে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিচ্ছেন। পুলিশের মধ্যেও যথেষ্ট যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করলে অপরাধের রহস্য উদঘাটন করতে পারে, অপরাধীদের খোঁজে বের করতে পারেন। সরকারকে সন্তষ্ট রাখতে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দেন। তার ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং বিচার বিভাগের ওপর মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। তার ফলেই দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, আমি বিচার চাই না।

আজিজুল পারভেজ: ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতা-দীপন হত্যার পর এই ঘটনার বিচার না চাওয়ার ব্যাপারে তার পিতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিরূপ মন্তব্য করেছেন, যদিও তা পরে তিনি প্রত্যাহার করেছেন…
সৈয়দ আবুল মকসুদ : একদিকে রাষ্ট থেকে সাধারণ মানুষ ন্যায় বিচার পাচ্ছে না, অন্যায়ের প্রতিকার হচ্ছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রত্যেকটি ঘটনার পর তোতাপাখির মতো গদবাধা কথা বলছেন – ‘অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে’। এ জাতীয় কথায় জনগণ অত্যন্ত বিরক্ত। এতদিন আমরা দেখেছি এ ধরনের ঘটনার পর কয়েকজন মন্ত্রী খালেদা জিয়া-তারেকদের দিকে আঙ্গুল উচিয়ে কথা বলেন – এবার যোগ হলো নতুন মাত্রা। নিহতের বাবাকে আক্রমন। শোকার্ত বাবা সম্পর্কে এ জাতীয় মন্তব্য তাকে হত্যা করার শামিল। আমাদের সমাজে আইনের শাসনের অভাব, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। তার মধ্যে এখন দেখা যাচ্ছে – ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সহমর্মিতার লেশ মাত্র নেই। যখন পুত্রহারা বাবা দাবি করে সকলের সহানুভূতি ও শান্ত্বনা, সেখানে ওই নেতা তাঁকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁকে শোকের মধ্যে আঘাত করে  – এসব মন্তব্যের নিন্দা করার ভাষা নেই।

আজিজুল পারভেজ: সম্প্রতিককালে যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, অনেকেই বলছেন – এটা দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্য একটি গভীর ষড়যন্ত্র। আপনি কি ভাবছেন? এগুলো কী কেবলই আভ্যন্তরীন বিষয় নাকি আন্তর্জাতিক কোনো যোগসূত্রও আছে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: সমস্ত পৃথিবীতে এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে। বহু রাষ্ট্র অস্থিতিশীল। বিভিন্ন দেশে উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী তৎপর। তাদের দমন করতে পরাশক্তিগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোতে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটছে। বাংলাদেশ একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে বহুদিন থেকেই ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী তৎপর। তার মধ্যে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতি বিরোধমূলক। এখানে যদি কোনভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা যায় তা হলে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ করা সহজ হয়। সে কারণে কোনো গোষ্ঠী বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল দেখতে চাইতে পারে। কিছুদিন থেকে আমরা লক্ষ্য করছি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের এবং পাকিস্তানি ঘাতক-দালালদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলো এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারনেশালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তুলেছে। নানাভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের জনগণের আস্থা অর্জনে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা দরকার তা আমাদের সরকার করতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈদেশিক নীতি ভালো। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। সেই কাজটি হচ্ছে না। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ নয়, রাশিয়ার উপরে সরকার বেশি নির্ভর করছে। সেখানে রাশিয়ার প্রভাব বেশি থাকবে সেখানে আমেরিকা বসে থাকবে না। আমাদের কোন কোন মন্ত্রীর আমেরিকা সম্পর্কে কথাবার্তা একেবারেই অকূটনৈতিক। শুধু রাশিয়ার ওপরে নির্ভর করে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যাবে সেটা দূরাশা মাত্র। হাতি যে দাত দিয়ে খায় তা থাকে তার মুখের মধ্যে যে দুইটি দাত আমরা দেখি তা তার শোভা মাত্র। আমেরিকার যে মিষ্টিকথা তা তার মনের কথা নয়, এখানে তার স্বার্থ ক্ষুন্ন হলে সে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। জিএসপি দিল কি দিল না সে বড় ব্যাপার নয়। কেন দিল না সেটি ভেবে দেখাই ছিল সরকারের কর্তব্য। বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে কে বেশি লাভবান হবে তা পর্যালোচনা করে দেখা নীতি নির্ধারকদের অবশ্য কর্তব্য। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দড়ির উপর দিয়ে হাটছে।  ভারসাম্য রক্ষা করা না হলে সর্বনাশ ঠেকানো সম্ভব হবে না। রাশিয়া সিরিয়াতে গিয়ে আসাদের পক্ষে লড়াই করে আইএসকে দমন করে আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে পারবে। কিন্তু সিরিয়ার জনগণ শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে ঠিক থাকতে হলে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। দুর্বল দেশকে কোন পরাশক্তি নিঃশর্তভাবে সমর্থন দেবে না।

আজিজুল পারভেজ: বিদেশীরা বাংলাদেশে আইএসসহ জঙ্গী গোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা বলছে, যদিও সরকার অস্বীকার করছে। আপনি কি মনে করেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: সেখানেই সমস্যাটা দেখা দিয়েছে। যারা বলছে বাংলাদেশে আইএস আছে তাদের কাছে সরকার তথ্য-উপাত্ত চাইতে পারতো। কোথায় আছে, কোথা থেকে তারা সহযোগিতা পাচ্ছে, আদৌ আছে কী না – তা নিয়ে কোন অনুসন্ধান না করে সরাসরি অস্বীকার করা এক ধরনের কূটনৈতিক ব্যর্থতা। যদি না থাকে তা হলে, যারা বলছে আছে – তাদেরকে কড়া ভাষার জবাব দিয়ে দিতে পারতো।
আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠী পৃথিবীর যে কোন দেশে থাকতেই পারে। জঙ্গী গোষ্ঠী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে থাকে না। কোথায় লুকিয়ে থাকে সেটা খোঁজে বের করা গোয়েন্দাদের কাজ। রাজনৈতিক নেতারা মাঠে-ঘাটে মেঠো বক্তৃতা দিয়ে এই গুরুতর প্রসঙ্গটিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। যা একসময় বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। আমাদের যদি কার্যকর সংসদ থাকতো সেখানে শক্তিশালী বিরোধীদল থাকতো – তাহলে এসব বিষয়ে বিতর্ক হতে পারতো। এখন মূলত একদলীয় সরকার হওয়ার সমস্ত দায় দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তেছে। যে কোন সিদ্ধান্ত সরকারকেই একা নিতে হবে। এবং সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার যদি ভুল করে তাহলে সমস্ত দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। দেশের কোন ক্ষতি হলে ইতিহাস সরকারকে ক্ষমা করবে না।

আজিজুল পারভেজ: উগ্রাবাদী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত বলে ইতোমধ্যে যারা ধরা পড়েছে – তাদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ তরুণ। যারা নামকরা বিশ্ববিদালয়েও পড়ছে। এর মূলে কী কারণ থাকতে পারে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: যে কোন সংকটের মূলে আসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। দেশের তিন-চার কোটি যুবক হয় বেকার অথবা অর্ধ বেকার। যে কোন শক্তি তা ধর্মীয় উগ্রবাদী হতে পারে অথবা মাওবাদী হতে পারে। তারা যদি আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস পায় তা হলে যে কোন দিকেই তাদেরকে টেনে নেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে ইসলামী মৌলবাদিরা তাদের সহযোগিতা যত সহজে জোটাতে পারবে বামপন্থী উগ্রবাদীরা তা পারবে না। সাধারণত যে কোন উগ্রবাদ যুব সমাজকেই আকৃষ্ট করে। এবং উগ্রবাদীদের ক্যাডার নির্বাচন করা হয় যুব সমাজ থেকেই। আমাদের যুব সমাজের একটি বড় অংশ দারিদ্রের শিকার। তাদের কর্ম-সংস্থান না করে শুধুমাত্র বক্তৃতা দিয়ে তাদের বেশি দিন ভুলিয়ে রাখা যাবে না। জঙ্গীবাদী তৎপরতায় যেমন যুব-সমাজের অংশগ্রহণ প্রধান, তেমনি উগ্রবাদ জঙ্গীবাদ প্রতিহত করতেও তারাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। যে জন্যে তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। রাষ্ট্রের ওপর যদি যুব সমাজের আস্থা নষ্ট হয় – আইনের শাসন না থাকে, নগর-বিচার না থাকে তা হলে যুব সমাজের একটি অংশ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সমাজ-বিরোধী ও রাষ্ট্র বিরোধী তৎপরতায় জড়িয়ে পড়তে পারে। সেই পর্যায়ে যাওয়ার আগে সরকারকে সাবধান হতে হবে।

আজিজুল পারভেজ:এক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রে কী রকম ভূমিকা নেওয়া উচিত?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: সমাজের বৈষম্য কমাতে একমুখি শিক্ষা ব্যবস্থা খুব প্রয়োজন। সাধারণ শিক্ষার মান অতি নিচে নেমে গেছে। তরুণ প্রজন্ম বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। ইংরেজি মাধ্যমে যারা পড়ছে তাদের শিকড় দেশের মাটিতে নেই, মাদ্রাসা শিক্ষা নিচ্ছে যারা তারা প্রায় সকলেই হয় নিু মধ্যবিত্ত অথবা অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিছুটা লেখাপড়া শিখেই তারা দেখতে পায় সমাজে বিশাল বৈষম্য – তারা অবহেলিত বঞ্চিত। তখন তাদের মধ্যে অনেকেই উগ্র ধর্মীয় পন্থাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থনীতি ও শিক্ষার এ বৈষম্য দূর করার জন্যে একটি সহিষ্ণু সংস্কৃতি বিনির্মাণের জন্য সরকারকেও অনেক বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতে অধিক অর্থ অপচয় করার চেয়ে উদার মানব সম্পদ তৈরি করার জন্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ মানুষের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র তার শিক্ষা-জীবন থেকেই গঠিত হয়। সুতরাং শিক্ষা ব্যবস্থার জোর দেয়ার কোন বিকল্প নেই।

আজিজুল পারভেজ:  আপনি তো নাগরিক সমাজের একজন নেতা। এসব ব্যাপারে নাগরিক সমাজের যে ভূমিকা থাকা উচিত, যে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠা দরকার তা কি হচ্ছে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: নানা কারণে বাংলাদেশের শক্তিশালি নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠেনি। ২০-৩০ বছর আগে যতটা ছিল আজ তাও নেই। আগে কবি শিল্প সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সামাজিক দায়িত্ব পালন করতেন। ব্যক্তির দিক থেকেও তারা প্রতিবাদ করতেন। মুক্তিযুদ্ধে নাগরিক সমাজের বিরাট ভূমিকা ছিল। সে জন্যই রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে রাজাকার আলবদররা বুদ্ধিজীবীদেরই বেশি হত্যা করেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো আজ নাগরিক সমাজ নিষ্ক্রিয়। এনজিওগুলি নাগরিক সমাজের কাজ করতে চাইছে। কিন্তু এনজিও দিয়ে স্বাধীন নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। যেটুকু কবি-সাহিত্যিক শিল্পীর তৎপরতা দেখা যায় তা জনগণের বিশেষ উপকারে আসে না। সরকারপন্থী কবি সাহিত্যিকরা সরকারের পোঁ-ধরে থাকেন। তাদের কোন স্বাধীন কণ্ঠস্বর নেই। তারা সরকারের এজেন্ডাই বাস্তবায়নে ব্যস্ত। বিরোধী দলের বুদ্ধিজীবীরা সরকারের কোন ভালো কাজেও সহযোগিতা দেন না। সব চেয়ে বড় কথা হল – নাগরিক সমাজের মধ্যে একটি বিরাট সুবিধাভোগি শ্রেণি তৈরি হয়েছে। তাদের কাছে জনগণ, সমাজ ও রাষ্ট্র বড় নয় ব্যক্তিগত স্বার্থই বড়। অল্প কিছু স্বাধীন নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর আছে বটে, কিন্তু তা এতোই দুর্বল যে কোন ভূমিকা রাখার শক্তি তাদের নেই। তা ছাড়া চিন্তার জগতটি সংকোচিত হয়ে গেছে। যে মুক্তিচিন্তার কথা আমরা শুরুতে বলেছি সেই মুক্তচিন্তার জায়গাটি আজ সংকোচিত। কোন বিতর্ক নেই, যুক্তি নেই। যে কারণে সমাজে আজ চরম অবক্ষয় বিরাজ করছে। এই অবক্ষয় থেকে মুক্তির একটিই পথ তা হলো অবাধ ও সুষ্ঠু চিন্তার চর্চা। সে পরিবেশ সৃষ্টি করাও নাগরিক সমাজের কর্তব্য।

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop