বিশ্বায়নের দ্বন্দ্ব ও রবীন্দ্রনাথ

Share Button

:: ফজলুল হক  ::

untitled-7_228366 - Copy

যে-সময় পেরিয়ে যাচ্ছি এখন; তথ্যের চমকপ্রদ বিস্টেম্ফারণে হারিয়ে যাচ্ছে বিস্ময়, পরম্পরাবোধ, গভীরতার তৃষ্ণা। মেঘ না চাইতে জল নয় শুধু, বর্ষা নেমে আসছে। তাতে জিজ্ঞাসা নেই, জিজ্ঞাসা নির্মাণের অধ্যবসায় নেই। আধুনিকোত্তর কৃষ্ণবিবরে নিজেদের মিলিয়ে দেওয়ার জন্য আত্মহননের বৌদ্ধিক মাদকে আচ্ছন্ন হওয়া আছে বরং। বিশ্বায়ন শিকড়বাকড় উপড়ে ফেলছে বেপরোয়া আগ্রাসনে, উন্মাদের পাঠক্রম রচিত হচ্ছে সর্বত্র। আমাদের স্মৃতি নেই, পরম্পরা নেই, লক্ষ্য নেই, দায়বোধ নেই। পৌর-সমাজের ওপর এমনভাবে আক্রমণ নেমে এসেছে যে, আমাদের চিরায়ত ইতিহাস-শিক্ষা-সংস্কৃতি দিয়ে গড়া স্বাতন্ত্র্যের সৌন্দর্যটুকুও মুছে যাচ্ছে।

বিশ্বায়নের কুহক যতই ঝরাক দ্বন্দ্ব-দ্বান্দ্বিকতা। রবীন্দ্রনাথই বাঙালির সৃজন-পৃথিবীর একমাত্র বিশল্যকরণী। মানবিক নির্মাণ পর্বের অনুভব-স্থাপত্য। মননবিশ্ব ও বিশ্বাসের ত্রিপাদভূমি। এই হলুদ শস্যের ক্ষেতে করতল পেতে দাঁড়ালে তাই চিরকাল মনে হয় ‘পূর্ণ হয়ে যায় তার শূন্য করতল’।

অথচ কত বিচিত্রভাবে দেখা যায় জীবনকে, তৈরি করা যায় মনন ও কল্পনার কত অজস্র সৃজনমেদুর পরাপৃথিবী! এসব আত্ম-প্রতারক সমঝোতা-প্রবণতার দুঃসহ ঘোর কেটে যাবে একদিন। নেতি ও নৈরাজ্যের বিশ্বায়ন যত উৎকট হোক, নবায়নমান সৃজনচর্যাই হবে আমাদের পথ ও পাথেয়।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অস্তিত্বে ঈশ্বরের মতো অমোঘ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার জ্যোতির্ময় জীবন ও সৃষ্টির অসামান্য আখ্যানবিশ্ব বাঙালির জীবন ও চিরচেতনার তল অবতলে অনন্তর দ্যুতিময় চিন্তাবীজ। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত চিরঅগি্নর আলোর মতো রবীন্দ্রনাথ আমাদের আকাঙ্ক্ষায় বেদনায় পূর্ণতায় রিক্ততায় লিপ্ততায় হতাশায় সর্বব্যাপ্ত হয়ে উপস্থিত থাকেন। সময়ের ঘূর্র্ণাবর্ত কিংবা অন্ধকারের মায়ারেখা রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘতম অস্তিত্বকে অণুমাত্র ম্লান করতে পারে না। তার সার্থক সার্বভৌম পাঠকৃতির সঙ্গে বাঙালির দ্বিবাচনিকতার জমি ও আকাশ তাই ফুরোয় না কখনও।

নগরকেন্দ্রিক অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্প ও সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো সমানতালে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বা যথাবস্থায় থিতু রাখা সহজসাধ্য। নিজের ভূখণ্ডকে ভালোবাসা মানেই সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য এবং ভাষাকে ভালোবাসা; তা যদি হতো, তবে আমাদের চারদিকের ব্যাপ্ত সংস্কৃতির চেহারা এমন রুগ্ণ, শিকড়হীন হতো না।

যৌবনে আমরা যখন আধিপত্যবাদী অনুশাসন নিয়ে খুব মাতামাতি করতাম তখন অনেককে বলতে শুনেছি, কৃষিকর্মের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভাষাকে অন্ন-জলে পুষ্ট করা যায় না। এ জন্য জাতির পূর্বাপর ধারাবাহিকতা জানতে হয়, উপলব্ধি করতে হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য বহুবিধ জটিলতা স্বীকার করে নিতে হয়। বাস্তব কখনও কখনও খোঁড়া হয়ে, বিকৃত হয়ে জন্মে। আত্মার ভেতর থাকে কূটকৌশল, ক্রোধ, অশালীনতা, ধর্মের কট্টরতা। সত্য তাৎপর্য হারায়। ঐতিহ্যের অনুশাসন অনুসারে অনিবার্য হয়ে ওঠে জীবনের অন্যতম চাহিদা- শিল্প-সংস্কৃতির চাহিদা।

রবীন্দ্রনাথই একমাত্র নজিরবিহীন মানুষ, যিনি শিল্পের জন্য কীভাবে ইমোশন চার্জ হয় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সত্তরে পেঁৗছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যথার্থ শতকীয় মানসিকতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব-দ্বান্দ্বিকতার বাঁকা স্রোতে। শুধু তাই নয়; প্রাত্যহিক বাঁচার সপক্ষে যে প্রত্যয় জরুরি, এবং সে জন্য সে সূক্ষ্ম বোধসম্পন্ন যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োজন তথা সৎ-সিদ্ধান্ত্ত সরাসরি তাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বুদ্ধিমানের আভিজাত্য তথা ইতিহাসের নিখুঁত স্পর্ধা এমনই, ধর্মের ধ্বজা, ঐশ্বর্যের চমক, অকল্যাণের অধিকার ক্রমাগত ঝামরে দেয়। বিশ্বায়নের পাকা ব্যবসায়ীরা মার্কেট কব্জা করার আগেই দেউলিয়া বিশুদ্ধবাদীরা মহীনের ঘোড়াগুলো ছুটিয়ে দেয় সূর্যের মহিমা ক্ষুণ্ন করতে। কিন্তু রবীন্দ্র-সমগ্র এতদিন আমাদের শিখিয়েছে ‘অংশ -পৃথিবী’ বলে বস্তুত কিছু নেই। সাংস্কৃতিক বিকল্প একমাত্র পথ বিচ্ছিন্নতাকে এড়ানোর, সর্বস্তরে ভারসাম্য রক্ষা করার। রবীন্দ্রনাথ কখনোই শ্রেণি-সংস্কৃতি, জাতীয়-সংস্কৃতি, উচ্চ-সংস্কৃতি ইত্যাদি কথায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, চেতনা তথা জীবন-জাগরণের গাণিতিক ব্যাখ্যা হয় না। মানুষের মুক্ত ইচ্ছা মানেই সচেতনতা, বোধ-তত্ত্বজ্ঞতা। সময় যেমন সীমিত নয়, জগতের সব অন্তর্গঠনও অসীম যুগপৎ, যার বাইরে ও ভিতরে অবিরাম সৃষ্টির পুনঃসৃষ্টি তরঙ্গ স্পন্দন যে কোনো কর্মব্যবস্থায় সময়চিন্তায় তথা বিচার পদ্ধতিতে রবীন্দ্রনাথ শিকড়সমেত বর্তমান। সব খোলস মায়া-মোহ টেনে ছিঁড়ে ফেলে কবি ঐশী দুঃসাহসের পথে হেঁটেছেন। জাতীয়তাবাদী চেতনার শুরুর দিকে সাহিত্যিক পাঠবস্তু ছিল সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত, অবাস্তব। চোখ ঝলসানো পোশাকে চরিত্রগুলো সাজানো হতো। তারা সিংহের মতো আস্ফালন করে কথা বলত, অলীক স্বপ্নের মধ্যে চলে যেত। পাঠক ভাবতেন, এটাই সত্যিকারের জীবন। রবীন্দ্রনাথ সব বাতিল করে দিয়ে নতুন রীতির প্রবর্তন করলেন। সময়, সমাজ, সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব-দ্বান্দ্বিকতার প্রতিফলন ঘটল। সংস্কৃতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের আত্মীয়তা বেড়ে গেল। সাহিত্য, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, দৃশ্যকলায় নিজের জীবনের ছবি দেখে মুগ্ধ হলো। একেই আমরা বলতে পারি জীবন যাপনে সরল সম্পূর্ণ সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথকে শ্রেণিবিভক্ত করা যায় না; কালানুক্রমিক তালিকাভুক্ত করা যায় না। সময়কে তিনি একটি অভিনব উদ্যান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যার নাম দেওয়া যেতে পারে তত্ত্ববোধ। এই বোধ ও দ্বন্দ্ব-দ্বান্দ্বিকতা বিবর্তনের ধারায় পুষ্ট। যদিও আজকাল, এই বিশ্বায়নের হাজারো মজার যুগে প্রায়শ শোনা যায় :রবীন্দ্রনাথ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তার সাত দশকের শতকৌণিকতা ক্রমশ নিম্নমুখী। তিনি আর Cultfigure নন। রবীন্দ্রজ্যোতিতে এখন Halo Effect, তার নামে কি বিশ্বায়িত পৃথিবীতে শিল্প-সংস্কৃতির বিবিধতা বেড়েছে? এই কি cultural দ্বন্দ্ব-ঝড়? নাকি বিশ্বায়নের ফলে রুচি-বিকার?

শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়টি নিয়ে বেশ গোলমাল তৈরি হয়েছে। এর অভ্যন্তরীণ স্থিতি, প্রেক্ষিত, ক্ষেত্র ও সম্পূর্ণতার সংজ্ঞায়ন করা যাক। এ বিষয়ে সমাজতাত্তি্ব্বক অ্যান্টনি স্মিথ বলেছেন, সংস্কৃতি a particular way of life shaped by values, beliefs, traditions, material objects and territory. Culture is a complex, dynamic ecology of people, things, world views, activities and settings that fundamentally induces that is also changed in natural communication and social interaction,…..

বিশ্বায়ন পর্বে এই সংজ্ঞা বাতিল। This is an era of disorder, even increasing disorder. This disorder is of a global nature.. সুতরাং বিভ্রান্তি ও সংকটও বিশ্বজোড়া, স্বরূপ অভিন্ন। এহেন সুচারু বিশ্লেষণ করেছেন সমাজতত্ত্ব্ববিদ জোনাথন ফ্রিডম্যান। ব্র্যান্ডেড নতুন বাজার কালচার জীবন-সংগ্রামের খতিয়ান লিপিবদ্ধ করে না। সবকিছুতেই পতন, ক্ষুদ্রতা ও ভাঙনের সূচনা। সংক্ষেপে বলা যায়, ‘দ্য কালচারাল আইডেনটিটি ক্রাইসিস’।

বিষয়টি যেভাবেই নেওয়া হোক, মিডিয়ার কলরব জীবনের ট্রেডমার্ক বদলে নিয়ে হৃদয়-সমস্যার আকার-প্রকার বদলে দিচ্ছে। ফলে, বাঁচার ফরমুলাও বদলাচ্ছে। কিন্তু এ কথাও সত্য, মানুষ সম্ভাবনার পসরা যতই বেছে নিক, জীবনযাত্রার সত্য রূপ আসছে না।

বিষয় নির্বাচন ও চরিত্র গঠনে রবীন্দ্রনাথের সময়োচিত মিথ ভোলা যায় না। ১৯২২ সালে চৌরিচৌরার দাঙ্গা শুরুর সময় তার লেখা ‘মুক্তধারা’য় ধনঞ্জয় অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে লড়েছে। জোতদার ও কৃষক, কারখানার মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে যে দ্বন্দ্বের এলাকা অর্থাৎ এরিয়া অব কন্উফিশন রবীন্দ্র-নাটকে পাওয়া যায়, তা নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল। আধুনিকতা কখনও সময়-সন-তারিখের সঙ্গে যুক্ত নয়। আধুনিকতা সমাজের প্রতি স্তরের মানুষের মনন-চিন্তন, ভাব-ভাবনা, আঙ্গিক-ভঙ্গিমা, মানসিকতা-বাস্তবতা। রবীন্দ্রনাথ তার time-zone গাণিতিক সমীকরণে, প্রাসঙ্গিকতায় নিত্য আধুনিক। ‘রক্তকরবী’, ‘রাজা’ ও ‘কালের যাত্রা’র রাজনৈতিক মিথ এক স্বতন্ত্র multi dimensional concept–এ পরিপ্লুত। স্তরে স্তরে মুক্ত সূচনার ইঙ্গিত। এভাবেই অন্যান্য রচনাতেও দেশপ্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধের কথা এসেছে। রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যান, যার ফলে ব্রিটিশ ব্যাপকভাবে নাট্যসাহিত্যকে নিষিদ্ধ করতে থাকে। এ সময়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা যারা ‘নারীমুক্তি’র কথা বলি, তারা কি একবারও ভাবতে পারি, রবীন্দ্রনাথ কতকাল আগে ব্যাপারটিতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন! জীবনের ট্রেডমার্ক বদলেছে হৃদ-সমস্যার আকার-প্রকার ভিন্নরূপ নিচ্ছে। ফলে বাঁচার ফরমুলা বিপরীত হয়ে যাচ্ছে। তাই বলে জীবনের মৌল সত্য রূপটি বদলাচ্ছে কি?

স্থূলার্থে সূক্ষ্মার্থে, লড়াই সে কারণে। একালেও রবীন্দ্রনাথের সতর্ক আচরণ, বাণী, বিধি-নিয়ম মেনে চলতে হচ্ছে। এই অনিবার্য। প্রায়ই নজরে পড়ে, ‘ইচ্ছামৃত্যু’ নিন্দনীয়। গতকালও ছিল আজও আছে। কৃতকর্মের জন্য একদা প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। এখনও হয়। কত রকম রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক উচাটন। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মহীরুহ আড়াল হয়ে যাচ্ছে। তাই বলে কি ধরে নেওয়া হবে- ভবিষ্যৎ অতীতবিহীন? রবীন্দ্রনাথের সময় মিডিয়া-সংস্কৃতি ছিল না। মোবাইল ছিল না। বৈদ্যুতিন ধামাকা ছিল না। অভিজ্ঞতা, রুচি, নিত্যপ্রত্যাশায় কিঞ্চিৎ উল্লঙ্ঘন তো আসবেই। কিন্তু এসবই তো উপরিতলের ব্যাপার। হৃদয় আছে, যেমন ছিল। দুঃখ বিমর্ষতা আছে, যেমন ছিল। সুতরাং বৈশ্বিক নিগড়ে আটকে থাকার প্রশ্ন আসে কিসে?

এ কথা অনস্বীকার্য, পুঁজি একটি অসাধারণ বলশালী শক্তি, যা অন্ধ ও নির্মম, মারাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক। কিন্তু এও সত্য, সংস্কৃতির কর্মকাণ্ড এবং মাধ্যমগুলো কম বুনিয়াদি এবং বলশালী নয়। বিশ্বায়ন যখন চারদিক থেকে সমাজ ও সংস্কৃতিকে দেউলিয়া করে দিতে তৎপর, রবীন্দ্রনাথ তখন আমাদের অন্যতম পুঁজি (কালচারাল ক্যাপিটাল)। আন্তর্জাতিক হাওয়ার সঙ্গে সহযোগ রেখে চলতে গেলে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্র দরকার। সে জন্য রবীন্দ্রনাথের স্মরণ অনিবার্য। এই তীর পরিবর্তনের কালে, বহুজাতিক সংস্থার প্রবেশের ফলে যে ভাংচুর, বন্যার বিস্তার চলেছে, সেখানে সাংস্কৃতিক সংস্কার মেনে চললে অস্পৃশ্য আদি অপর হয়েই থাকতে হবে।

অপরীকরণ ভুলতে হবে এবং তার জন্য তখন এবং এখন-এর দোহাই পাড়া চলবে না। প্রকৃত প্রস্তাবে টুঁড়ে-ফুঁড়ে দেখলে বোঝা যাবে অদূর ভবিষ্যতের উজ্জ্বল নৈতিক দিশা ‘অতীত ও বর্তমান’ দুয়ের মধ্যেই সুন্দরভাবে শোভিত। নিছক বাংলার প্রতিভা নয়; রবীন্দ্রনাথকেই ভাবা যেতে পারে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির এক দিকপাল। আজকে এই সময় বিশ্বায়নের ঐতিহাসিক তুফান তোলা দিনে, বহু মানুষের সঙ্গে সমতালে হাঁটতে হলে রবীন্দ্রনাথের পথ ধরেই হাঁটতে হবে। সংস্কৃতির বিসঙ্গতি ঐক্যের বিনাশ বা অবসান ঘটানোর যে ক্রিয়া, তা থেকেই দ্বন্দ্ব-দ্বান্দ্বিকতা। সম্পর্কের গঠন অস্তিত্বের সুফল লাভের জন্যই এই ইচ্ছা দ্বন্দ্ব, সৃৃষ্টি দ্বন্দ্ব, ক্রিয়া বিশ্বায়নের হাজার হাজার জাদু- বর্ণালির সঙ্গে হাজার হাজার বিসঙ্গতির ঐক্য, যা ক্রমশ সমাজ ও সংস্কৃতিকে সংক্রামিত করে যূথবদ্ধ ও এই বিসঙ্গতি বিনাশের জন্যই দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বান্দ্বিকতার তিন রূপ, যা মানব অস্তিত্বের ক্লেশ, দুর্দশা, শোক-তাপ, হাসি, বিসঙ্গতি বিলোপ করে সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগের স্টম্ফুটন ঘটায়।

তবুও অনন্তর জীবনের পথে মানুষ যাত্রা করে। এই পথ-জিজ্ঞাসার দুটি দিক আছে :প্রশ্ন ও প্রার্থনা। আর একটি হলো সঙ্গতি বিধান বা সামঞ্জস্য ব্যাকুলতা। সামঞ্জস্য মানবসত্তার, অস্তিত্বের দৃশ্যমান কর্মবৃতি ও পথ-প্রবাহ।

All problems of existance are essentially problems of harmony বলেছেন শ্রী অরবিন্দ। তাই হঠাৎ হঠাৎ রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি রহস্যময় মনে হতে পারে। দগ্ধ গোরস্তানের ছবির মতো সাম্প্রতিক অঘোর বাস্তবের সামান্যতম মিল নেই কোথাও। তার চিন্তা ও অনুভূতি আজকের এই বহমান সাম্প্রতিকে মানবোত্তর অপবিশ্বে বিশ্বায়নের সুবর্ণকালে কোন কাজে লাগবে? এর জবাব একই সঙ্গে খুঁজে নিতে হবে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা-বিশ্বে এবং আমাদের অস্থির ও অনিশ্চিত সাম্প্রতিকে। গভীরতর কোন শুশ্রূষার আশায় আজ রূঢ় ও নির্দয় সময়ের ক্রান্তিবেলায় এই বিবেচনা আরও বেশি প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk