মূলধারার সাথে আমরা কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন নই আতাউর রহমান মিলাদ এর সাক্ষাৎকার

Share Button
Ataur-rahman-milad1
আতাউর রহমান মিলাদ লেখালেখির শুরু আশির দশকের  গোড়া থেকে। এ পর্যন্ত তাঁর ৬টি কবিতা ও ২টি গল্পের বই বেরিয়েছে।বই গুলো হলো-দূঃসময়ের চিৎকার, হৃদয়ের জানালা খুলে, আর যদি একটা গুলি চলে, কবিতার চেশবই, স্মৃতিহীন অচিন আঁধার, স্বরচিত অন্ধকার(কবিতা) এবং গল্পের বই-তোমার দেয়া দূঃখ, স্বপ্ন ও ছায়া।
আশির দশক থেকে যুক্ত আছেন ছোটকাগজ সম্পাদনায়-সাহিত্য কাগজ শাপলা, কাব্য সংকলন -ভালোবেসে অন্ধ হই , সাহিত্যের কাগজ- সাম্প্রতিক সাহিত্য এবং বর্তমানে লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাহিত্যের কাগজ- শব্দপাঠ এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আতাউর রহমান মিলাদ বাঙালীর মৌলিক চিন্তা-চেতনা লব্দ আপাদমস্তক মানবিক মানুষ ও অন্যতম কবি।তাঁর লেখনীসত্বায় বাঙালীর সুকুমার ও শুদ্ধতম সৃজন,শৈলী তাঁকে নিয়ে গেছে অন্যরকম আপন উচ্চতায়। তার মৌলিক কর্ম বাংলাদেশ,ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্নদেশের কাগজে সরব ও উচ্চারিত হলেও, বরাবরই প্রচার বিমুখ বিনয়ী কবি আতাউর রহমান মিলাদ দুই হাজার আট সালে সংহতি সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক কবিতার জন্য পুরস্কৃত হন।  আতাউর রহমান মিলাদের জন্ম ১৬ই অক্টোবর ১৯৬১ সালে, মনু নদীবেষ্টিত জেলা সদর মৌলবীবাজারের শ্রীরাই নগর গ্রামে। 
বাঙলা সাহিত্যে উচ্চারিত কবি আতাউর রহমান মিলাদ এর সাথে আনোয়ারুল ইসলাম অভি’র কথোপকথোন –
পৃথিবীর যেখান থেকেই বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যচর্চা করি না কেন
মুলধারার সাথে আমরা কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন নই, বরং তাদেরই অংশ
আ.ই অভি:এই মূহুর্তে কি লিখছেন?
আ.র.মিলাদ : কবিতা অবশ্যই। পাশাপাশি গল্পও লিখছি এক-আধটু। প্রতিদিন হামাগুড়ি দিচ্ছি। শব্দের নান্দনিক মাঠে এবং দাঁড়াবার চেষ্টা করছি।
আ.ই অভি:আপনার কবিতায় একটা সুকুমার আবহ থাকে। কবিতা শেষ হলেও তার আবহগন্ধ কর্পুলের মতো ছড়িয়ে যায় মূহুর্তে। কবি ভাবনা গুলো একটু শেয়ার করবেন?
আ.র.মিলাদ : ব্যক্তি-সমাজ-স্থান কালকে ঘিরেই কবিতার স্বতস্ফুর্ত প্রকাশ।এ জীবনে চোখের দেখায়, পথের রেখায়, ঘাসে ও ফুলে, প্রাপ্তি ও ভুলে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় চলমান বাস্ততায় নিজের ভেতর ভাঙ্গা গড়ায় যে ভাবনাগুলো যুক্ত হয় সে গুলো মুক্তি পায় কবিতায়। কবিতায় আমিও খুঁজে নিয়েছি এক জীবনের পূর্ণতা- হয়তো তারই আবহ অনুরণিত হয়।
আ.ই অভি: আরেকটি বিষয় লক্ষনীয়, প্রেম,দ্রোহ,প্রতিবাদের ভাষাও আপনার কবিতায় অন্যরকম মানবিক বোধের মিশেলে উঠে আসে বলে মনে হয়?
আ.র.মিলাদ: আমি যে জীবন লালন করি, ধারণ করি, যে বিশ্বাস বহন করি -সেখানে প্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ, মানুষ, মানবতার জয়গান বিদ্যমান। আমার কবিতা ‘ স্বরচিত অন্ধকার’ এ দিয়েছে ‘দুঃসময়ের চিৎকার’ ‘হৃদয়ের জানালা খুলে’ দিয়েছি ‘স্মৃতিহীন অচিন আঁধার’ এ। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয়েছে ‘আর যদি একটা গুলি চলে’। ‘কবিতার চেক বই’য়ে লিখে দিয়েছি আত্মমোচনের দৃপ্ত অঙ্গীকার।
মনের ও মানবতার আবর্তে কবিতা বেঁচে থাকে জীবনের স্পন্দনে। কবিতাতো বিশ্বমানবের মানবতার সঙ্গীত।
আ.ই অভি:  বলা হয়ে থাকে লেখা লেখির অন্য শাখা গুলোতে ফাঁকি দেয়া গেলেও কবিতায় ফাঁকি দেয়া যায়না! আপনি কি বলেন?
আ.র.মিলাদ : শুধু কবিতা কেন শিল্পের কোন শাখায়ই ফাঁকির সুযোগ নেই। বোধের অক্ষমতায় যদি শুন্যতা থেকেই যায় সে দায় স্রষ্টার, শিল্পের নয়। যেহেতু কবিতার পাঠকেরা মননশীল চর্চায় অগ্রসরমান অবস্থানে থাকেন, সেহেতু ফাঁক কিংবা ফাঁকিগুলো তাদের চোখ এড়ায় না। একটা কবিতা রচনার প্রাক্কালে তাই কবিকে অনেক সাবধানী হতে হয়।
আ.ই অভি: একটি কবিতা কখন কবিতা হয়ে উঠে?
আ.র.মিলাদ : এ প্রশ্নের সোজাসাপটা কোন জবাব দেয়া কঠিন। কারণ আমার বিচারে যে কবিতা উৎকৃষ্ট মনে হতে পারে সেটা অন্যজনের বিবেচনায় গৌন বলে বিবেচিত হতে পারে। একটা কবিতা বিষয় বৈচিত্রে, শব্দ শৈলীতে, প্রকাশ প্রকরণে, প্রতীক ও চিত্রকল্পে- যে কোন একটি কারণে একটি কবিতা উৎরে যেতে পারে। খোলাভাবে বলতে গেলে যে কবিতা পাঠে কিংবা শ্রবণে মনকে আলোড়িত করে বা বোধের গভীরে নাড়া দিয়ে যায় সেটাই কবিতা।
আ.ই অভি: কবিতায় সময়,বিষয় অনেক জরুরী না হলেও এর গুরুত্বকে অস¦ীকার করার উপায় নেই। ইদানিং আমাদের কবিতায় ছন্দের চেয়ে গদ্য বেশী ঢুকে যাচ্ছে বলে অনেক কবিবোদ্বা  মনে  করেন-
আ.র.মিলাদ : কালের বিবর্তনে কবিতার গতিপথেও এসেছে পরিবর্তনের ঢেউ। বিনির্মানের ভেতর দিয়ে চলছে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা। ব্যর্থতা- সফলতা দু’টোই এসেছে। সৃষ্টির অভিনবত্বে কবিতাতেও ভিন্নমাত্রা যোগ করতে কবিরা সব সময় তৎপর।
গদ্য কবিতা চর্চার বয়স অনেকদিনের। অনেকেই গদ্যকবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এটা দোষের নয়। গদ্য কবিতায়ও কাব্যিক অনুষঙ্গের উপস্থিতি থাকে, থাকে ছন্দের বিচিত্র বিহার। কবিতা পাঠে আসে তৃপ্তি, রসাস্বাদনে ব্যাঘাত ঘটেনা। ‘মুক্তগদ্য’ নামে মুক্ত ছন্দে অনেক লেখালেখি হচ্ছে, সেখানে যেমন কবিতার আবহ আছে, তেমনি গদ্যের প্রবাহমানতাও আছে।
আ.ই অভি:  বক্তব্যধর্মী গদ্যকবিতায়  ছন্দরীতি  অনেকে মেনে চলেননা এবং অনেক সময় দেখা যায়  কবিতাগুলো আন্দাজেও বুঝে উঠা যায়না যে,আসলেই এটা কবিতা না অন্যভাবে কবির অনুভূতির বহিপ্রকাশ?
আ.র.মিলাদ : কবিতাতো কবির অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। কবির চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের মোড়ক উন্মোচিত হয় কবিতায়। বক্তব্যধর্মী কবিতায় বক্তব্য থাকবেই স্বাভাবিকভাবে কিন্তু সেটা যাতে কাব্যিক স্বভাব পরিহার করে শুধু আবেগ সর্বস্ব নিজস্বকথন বা বয়ান না হয় সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে। গদ্য কবিতা প্রাঞ্জল কাব্যভাষার ব্যবহারে ও সৃজনশীলতার স্বকীয়তায় পূর্ণতা পেতে পারে।
আ.ই অভি:  কবিতা লেখার শিশুকাল কেমন ছিল?
আ.র.মিলাদ : আসলে কবিতার শিশুকাল শুরু হয়েছে আমার কৈশোরে। সমাজের চারপাশে নানা অসঙ্গতি, আত্মগত অবক্ষয়, আত্মপ্রতিষ্টার নির্লজ্জতা, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি এসব দেখে দেখে মনের ভেতর আকুপাকু করতো। এসবের বিরুদ্ধে লুকিয়ে লুকিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে যা লিখতাম তা কবিতা ছিল না হয়তো, তবে ভাবনার বহিঃপ্রকাশ সেই থেকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা আমার কৈশোরের বিশ্বাসে প্রচন্ড আঘাত হানে। জাতির জনকের এ মৃত্যু বুকে নিয়ে আমি খাতা ভরেছি প্রতিবাদী শব্দে। সেই থেকে পথ চলা। আশির শুরু থেকে কবিতার সাথে বসবাস।
আ.ই অভি: লেখক হিসাবে কৈশোর সময়টা কেটেছে মুন নদী আর শ্রীরাই নগর গ্রামের প্রকৃতিঘেরা আবহে। আপনার লেখক সত্বায়ও এগুলো অনেক মৌলিকভাবে উঠে এসেছে।একটু ব্যাখ্যা দেবেন?
আ.র.মিলাদ : প্রকৃতি আমাদের মানুষ হবার শিক্ষা দেয়। জীবনের ম্যারপ্যাচে এসে স্খলন শুরু হয়। জন্মগ্রাম শ্রীরাইনগর ও তার পাশে বয়ে চলা ‘মনু’নদী আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আর্শীবাদ। এখানেই মাটির কাছে, ঘাসের কাছে, নদীর কাছে, জলের কাছে পেয়েছি মানবতার প্রথম সবক। ব্যক্তি-মানস বিকাশে নিসর্গ ও নদীর ভূমিকা অপরিসীম। জীবনকে তাই ভাসিয়ে দিয়েছি উজান স্রোতে, শব্দের মায়াবী জালে, বিশ্বমেলার মহামুগ্ধতায়।
আ.ই অভি:  আপনার লেখক স্বত্তায় তিনজন ব্যক্তিত্বের প্রভাব ও অনুপ্রেরণা কাজ করেছে বলে আপনি বলে থাকেন? বোধের জায়গায় তাদের অনুপ্রেরণা কি রকম ছিল?
আ.র.মিলাদ : ধার করা জীবনে গ্রহণ বর্জনের ভেতর দিয়েই বেড়ে ওঠা। বাবা মায়ের মুষ্টিবদ্ধ হাত ছেড়ে খোলা দুনিয়ায় প্রবেশের সাথে সাথে সান্নিধ্যে ঘটে বিভিন্ন মানুষের। আমার জীবনে সে রকম ভাবেই যে দুজন মানুষের সান্নিধ্য ঘটে আলোকবর্তিকা হিসেবে তারা আমার শ্রদ্ধেয় দু’জন শিক্ষক, জনাব অধ্যাপক শাহজাহান হাফিজ ও ড. সফিউদ্দিন আহমদ। তাদের দেখানো কবিতার পথে, আলোর পথে, সম্প্রিতির পথে, মানবতার পথে, বিশুদ্ধতার পথে, প্রগতির পথে, সাম্যের পথে, অসাম্প্রদায়িকতার পথে বেড়ে উঠছি বিশুদ্ধ করতলে, বোধনের রঙিন মুখরতায়।
আ.ই অভি:  আপনার লেখালেখির সময় শুরুতে বাংলাদেশে এবং বর্তমানে বিলেতে কাটছে। আপনার দুইটি পরিবেশে বেড়ে উঠায় মৌলিক কাজ গুলোতে ব্যবধান আছে বলে মনে হয়?
আ.র.মিলাদ : দুই দেশের দুই প্রকার পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রভাব ভিন্ন। দুই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিক, সাংস্কৃতিক, জীবনযাপন, আচার আচরণ, মনোজগৎ ভাষা ও প্রকাশরীতিতে ভিন্নতা যেমন আছে, তেমনি সাদৃশ্যও প্রচুর লক্ষণীয়। কখনও কোথাও আবার সাংঘর্ষিক ও বটে। এই দু’য়ের প্রভাবেই মৌলিক কর্ম ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে, যোগ হচ্ছে নতুন নতুন উপাদান। সমৃদ্ধ হচ্ছে চিন্তা ও চেতনার জগত। একজন লেখক বা কবির জন্য এ প্রাপ্তি মৌলিক সৃজনশীলতার মাঠকে পরিপুষ্ট করতে সহায়তা করে।
আ.ই অভি: পরিবেশ মানুষকে প্রভাবিত করে বিধায় মৌলিক কর্মগুলোতেও ছায়াপড়ে।আমাদের রবীন্দ্রনাথ,নজরুল,মধুসুদন,এলিয়েটস,দ্যান্তে,টলস্টয়সহ অনেক উদাহরণ দেয়া যায়-
আ.র.মিলাদ: যে কোন মানুষের জীবনে পরিবেশ, প্রতিবেশের প্রভাব অনস্বীকায্য। তা’ হতে পারে ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব, জীবনদর্শনের প্রভাব, বিশেষ সময়ের প্রভাব, সংস্কৃতি ও সংস্কারের প্রভাব, প্রকৃতি ও জলবায়ুর প্রভাব। কবিতাতো ধারন করে সময়ের বিবর্তন চিহ্ন। ইতিহাস ঐতিহ্যের শেকড়, যুগ প্রাসঙ্গিকতার ছায়া।
আ.ই অভি: যে দেশে বসে আমরা লিখছি,আমাদের প্রজন্মরা বাংলা পড়তে, লিখতে জানেনা বললেই চলে। যদিও স্কুলে বাংলা ভাষা শিক্ষার সুযোগ হয়েছে কিন্তু তার প্রভাব খুব ক্ষিন্ন! আমাদের লেখা গুলো বলতে গেলে সবই বাংলা ভাষায় মূদ্রিত। বই গুলোর ইংরেজী অনুবাদও বের হচ্ছেনা। হাতে গুনা কয়েকটি মাত্র।নিকট ভবিষ্যতে অভিবাসে আমাদের প্রজন্মরা আমাদের মৌলিক কর্ম গুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সম্ভাবনা নিশ্চয় খাটো করে দেখা যায় না?
আ.র.মিলাদ : এ বিষয়টা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের মাঝে কথা হয়েছে। এ শঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না কোন ভাবেই। ইংরেজী অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের কর্মগুলোকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে এবং এখানে যারা ইংরেজী ভাষায় সাহিত্য চর্চা করছেন তাদের কর্মগুলো বাংলায় রূপান্তরিত করে একটা যোগসূত্র স্থাপন তৈরী করতে হবে। নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের সাথে ভাব বিনিময়ে সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সাহিত্য বিষয়ক কর্মশালা, সভা সেমিনার যৌথভাবে আয়োজনের মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানো যেতে পারে। আমাদের মৌলিক কর্মগুলোর অনুবাদ করা জরুরী। তা হলে পরবর্তী প্রজন্মের পাশাপাশি এখানকার মূলধারার লেখক ও পাঠক কর্মগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারেন।
আ.ই অভি:  বলা হয়ে থাকে একজন লেখক মূলত তার মৌলিক কর্মে মানুষ খুঁজেন।হতে পারে অদৃশ্য মানুষ,কখনও পুরুষ মানুষ,কখনও নারী মানুষ।প্রেম,বিরহ,দূ:খ,আনন্দ,আলো,অন্ধকার,মানবিক, প্রতিবাদ,দ্রোহ,বিদ্রোহ সবখানে মানুষই প্রধানতম বিষয়। মাঝে মাঝে এই লেখক মানুষরাই আবার অমানুষ হয়ে উঠে।অমানুষদের পক্ষে যায়,যুদ্ববাজদের পক্ষে যায়,মানবতা বিরোধীদের পক্ষে লেখে! আপনার ব্যক্তিগত ওমৌলিক জীবন চরিত থেকে একটা বিষয় সুস্পস্ট, আপনি বাঙালী ও বাংলাদেশের শিকড় সংস্কৃতি ও মহান মুক্তিযোদ্বের পক্ষের একজন নিবেদিত প্রাণ লেখক। বোধের জায়গা থেকে আপনি বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
আ.র.মিলাদ : কবি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। তাকে বলা হয়ে থাকে মানবীয় অবয়বে জাগতিক ঈশ্বর মানুষ ও মানবতার কল্যাণে কবিরা সদা তৎপর। একজন বাংলাভাষার কবি হিসেবে বাংলা, বাঙালী ও বাংলাদেশ আমার অস্থিত্ব, চেতনার শেকড়। পৃথিবীর যেখানেই অবস্থান হউক আমি বাংলায় কথা বলি। এ আমার অহংকার।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিভ্রান্তির কারণে আমরা সব সময় দ্বিধাপীড়িত ও দিশেহারা। সময়ের ভুল বিচারে আত্মপ্রচারিত হয়ে অনেকেই সত্যের বিপক্ষে দাঁড়ায়, অথবা হীনস্বার্থে। এক সময় অনেকেই ফিরে আসে সত্যের আলোয় অনুশোচনাদগ্ধ হয়ে। আলো আধারের জীবনে আলোটাই সত্য বাকী সব বুদবুদ।
আ.ই অভি:  আসলেই কি আমাদের মৌলিক জায়গায় নৈতিক দ্বায়বদ্বতায় দৈন্যতার দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে দিন দিন ?
আ.র.মিলাদ : চারপাশে শুধু পরিবর্তনের ঢেউ আর ঢেউ। বৈশ্বিক পরিবর্তন, সামাজিক পরিবর্তন, তথ্য প্রযুক্তির আগ্রাসন, চিন্তার বানিজ্যকরণ, বিজ্ঞাপনী রঙিন প্রচ্ছদ, ক্রমশ সময়কে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সব প্রতিযোগিতায় নৈতিকতার অবস্থান ভঙ্গুর ও নড়বড়ে। ভিন্নমাত্রিক জীবন ও জটিলতায় মানুষ খুঁজছে সহজ ও সরল পথ।
ভাগে ও ভোগে মত্ত সবাই। উপরে যাবার প্রতিযোগিতায় শিখে নিচ্ছে বাণিজ্যিক ভাষা। দায়বোধের পরিধি ক্ষীণ হচ্ছে দিন দিন। কবিতার ভাষায়  ‘উপরে যাবো, বিশ্বায়নের হরিলুটে ভাগ বসাবো বেনারসি সুখের জন্য/ সময়টা আজ বিজ্ঞাপনের দেশে দেশে মানুষগুলো দারুণ পণ্য’’। তারপরও মানবিক বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যায়নি বলেই পৃথিবী এখনো মানুষের বাসযোগ্য ভুমি।
আ.ই অভি: ইতিহাস অনেক বিষয় আপনা আপনি স্পষ্ট করে দেয়, সমাজে অথবা গোত্রে চিহ্ন এঁেক দেয়- মানবতা বিরোধী অপরাধের রায়ের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে গণজাগরণে আমাদের লেখক সমাজে লুকিয়ে থাকা স্বাধীনতা বিরোধীচক্র আজ ভেসে উঠেছে তাদের অন্ধকার স্বরুপ নিয়ে। এতো দিন দেশের শিকড়,সংস্কৃতির মৌলিকত্বের দোহাই দিয়ে থাকা দলটির পেছনে যে একটা লেজ ছিল, দেশের এই দূ:সময়ে খোদ বিলাতে আমরা স্পস্ট দেখতে পেয়েছি। আপনি এটাকে কি ভাবে দেখেন?
আ.র.মিলাদ : বর্ণচোরা বুদ্ধিজীবিরা এ সমাজেরই অংশ। বাইরের চেহারা দেখে ভেতর স্পর্শ করা খুব কঠিন। তাদের অস্থিত্বের লেজে পা’ পড়লেই এঁরা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে। সাপ স্বভাবী ওরা সব সময়ই বিষধর। রাজনৈতিক ব্যর্থতায় দীর্ঘদিন স্বাধীনতা বিরুধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন না করায় ত্রিশলাখ শহীদের ঋণ যেমন শোধ হয়নি তেমনি স্বাধীনতা বিরুধী চক্রের উত্তরণে সহায়ক হয়েছে। এমন কি দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে সংবিধানও কাঁটাছেড়া করেছে। এখন যখন বিচারকার্য শুরু হয়েছে তখনই নিজেদের অস্থিত্বের লড়াইয়ে ওরা জোটবদ্ধ হয়েছে। বিলেতেও তার ব্যতিক্রম নয়।
আ.ই অভি: তোমার দেয়া দূ:খ- গল্পের বইটির মাধ্যমে একজন গল্পকার হিসাবে পাঠক পেয়েছে। যদিও  আপনি গল্প লিখছেন অনেক আগে থেকে। এটি আপনার প্রথম প্রকাশিত গল্পের বই।বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের পটভূমি,যোগ-বিয়োগ,স্বপ্নভঙ্গ,স্নৃতির করতলে হেটে যাওয়া স্বদেশ ইত্যাদি প্রকাশ  বইটিকে পাঠক অনেক ভালো ভাবে গ্রহন করেছে। একজন কবির গল্লকার হওয়া বা গল্পকার হয়ে উঠার পেছনে কি কোন গল্প আছে?
আ.র.মিলাদ : লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকা অবশ্যম্ভাবী। এই সমাজের একজন বলে সামাজিক বিভ্রান্তি, যাপিত জীবনের মিহিন যন্ত্রণা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অর্জন কিংবা আকাঙ্খার বাস্তব প্রতিফলন নিজের ভিতর প্রতিধ্বনিত হয়। পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলি ও অভিজ্ঞতার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ও বিশ্বাসের আনুগত্যে এক সময় মনে হয় এই বিচিত্র ভ্রমণ, সমাজ বাস্তবতা গদ্যে চিত্রিত করি। সেই থেকে গল্পের মাঠে বিচরণ। গল্পের বিশাল ক্যানভাসে নিজেকে কিংবা নিজস্ব দর্শনকে বিশ্লেষণের সুযোগ ঘটে।
আ.ই অভি:  বিলেতে গল্পকারদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এবং লক্ষ্যণীয় যে,গল্পগুলোর সিংহভাগই বাংলাদেশ এর পটভূমি অথবা বাংলাদেশ এর স্মৃতিকেন্দ্রিক! খোদ বিলেতে আমাদের একটি শক্ত পরিচিতি আছে। আমাদের ঘর সংসার,আত্মীয়, ঘরকুটুম, প্রতিবেশী, ব্যবসা, রাজনীতি, ঝগড়া বিবাদ, মাল্টিকালচারার সমাজে যুগপথ চলা ইত্যাদি সবই আছে। এখানে আমরা যারা বাস করি এবং লিখি অথচ আমাদের বাসভূমি আমাদের মাঝেই উপেক্ষিত?
আ.র.মিলাদ : মূলতঃ আমরা যারা বিলেতে বাংলাভাষায় সাহিত্য  কর্মের সাথে জড়িত, আমাদের অনেকেরই বেড়ে উঠা বাংলাদেশের জলমাটিতে। বিলেতে বাস করেও নাড়ির বাঁধনটা ছেঁড়া যায়নি বলেই স্মৃতিরা তাড়িত করে কিংবা সুখ দূঃখ ভাবিত করে এবং তারই প্রতিফলন ঘটে গল্পে কবিতায়। আমরা বাঙ্গালীত্ব এবং ব্রিটিশত্ব নিয়ে বেড়ে উঠেছি। দ্বৈত সময়ের মূর্ত ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে লেখাগুলোতে। আমাদের বাসভূমি আমাদের মাঝেই উপেক্ষিত এ অভিযোগ পুরোপুরি মানতে রাজি নই। এই বিলেতের যাযাবর জীবন, সামাজিক উত্থান পতন, প্রাপ্তি ও হতাশাকে আবলম্বন করে গল্প উপন্যাস কম লিখা হয়নি। এবং ক্রমশ তা আরো বেড়েই চলেছে। শেকড় যত গভীরে প্রোথিত হবে, লিখা ততই বাড়বে।
আ.ই অভি: বিলেত  থেকে অনেকে খুব ভালো গল্প লেখেন-সালেহা চৌধুরী,সাঈম চৌধুরীর গল্প গুলোতে আমরা অভিবাসের যাপিত জীবন ও তার চারপাশ ঘুরে দেখি,উপভোগ করি। পাঠকরাও খুব ভালো ভাবে এসব গ্রহন করেছে-
আ.র.মিলাদ : যে সমাজে আমরা বাস করি, আমরা তো সে সমাজেরই প্রতিনিধি। স্বভাবতই গল্পের পটভূমি আবর্তিত হবে অভিবাসী জীবনের হাসি, আনন্দ বেদনার স্পর্শে। সমাজ ও জীবনের অভিজ্ঞতার উপলব্ধিকে গল্পকাররা নান্দনিক ভাবে উপস্থাপন করেন বলেই পাঠকেরা তা উপভোগ করেন। সময়ের দর্পনে নিজেদের মিলিয়ে নিতে গিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন অথবা ফেলেন গভীর নিঃশ্বাস। গল্পের চরিত্রগুলো পাঠকের জীবন ঘনিষ্ট বলে খুব সহজ ভাবে গ্রহণ করে নেন।
আ.ই অভি:  ছোটকাগজ আন্দোলনে আপনার ভূমিকা অগ্রগন্য।দেশে দীর্ঘসময় সম্পাদনা করেছেন ছোটকাগজ শাপলা।বিলেতে এসে সম্পাদনায় আছেন শব্দপাঠ।আপনি শব্দপাঠ এর প্রধান সম্পাদক। শব্দপাঠ বিলেতে একটা জায়গা করে নিয়েছে সন্দেহ নেই।অসম্ভব ব্যস্ততার মাঝে নিয়মিত এবং আকারে অনেক বড় লিটল ম্যাগটি প্রকাশ করা সহজ কথা না।নেপথ্য অথবা দূ:খসুখ অনেক আছে নিশ্চয়?
আ.র.মিলাদ : ‘শব্দপাঠ’ দীর্ঘদিন থেকে বাংলাভাষী লেখকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়ে আসছে। এক সময় বছরে ২/৩ সংখ্যা প্রকাশিত হলেও বর্তমানে প্রতি বৎসর একটি সংখ্যা বর্ধিত আকারে, বাংলা একাডেমি বইমেলায় প্রকাশ পায়। সব সৃষ্টির পেছেনেই সুখ দুঃখের সংমিশ্রণ থাকে। শুরুতে লেখা সংকটে ভুগতে হতো, নতুন কাগজ হিসেবে যা হয়- এখন সে সমস্যা হয় না। ‘শব্দপাঠ’ সু-সম্পাদিত একটা সাহিত্য কাগজ হিসেবে বাংলাভাষী লেখক পাঠকের মাঝে একটা স্বতন্ত্র জায়গা তৈরী করে নিতে সক্ষম হয়েছে। সময় মতো লেখা আদায় দুরূহ কাজ। যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে কাগজটাকে নিখুঁতভাবে পাঠকের হাতে তুলে দেবার ইচ্ছে থাকে কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে লেখা না পৌঁছায় কিংবা বিলম্বে পৌঁছায় তা’ নিজের মনোমতো হয় না। তদুপরি প্রকাশনার কাজটা বাংলাদেশ থেকে হয় বলে প্রকাশনার খুঁটিনাটি কাজগুলো সুচারু রূপে সম্পন্ন হয় না। একটা অতৃপ্তি থেকেই যায়। তবে ‘শব্দপাঠ’ কে একটি শিল্পমান সমৃদ্ধ সাহিত্যকাগজ হিসাবে দাঁড় করাতে সম্পাদক আবু মকসুদ, প্রকাশক কাজল রশীদ এবং বাংলাদেশের কবি মুজাহিদ আহমদ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ‘শব্দপাঠ’ এর পাঠকও শুভাকাঙ্খীদের ভালবাসা অব্যাহত আছে বলেই আমাদের উদ্যম থেমে যায়নি।
আ.ই অভি:  বিলেত থেকে অনেক গুলো ছোটকাগজ বের হয়-শব্দপাঠ, কবিতাপত্র, লোকন,ম্পন্দন বৈভব  ইত্যাদি। এখানে একঝাঁক সাহিত্যকর্মী, লেখক ও পাঠক তৈরীতে ছোটকাগজ অনন্য ভূমিকা রাখছে সন্দেহ নেই। দূ:খজনক হলেও সত্যি, এখানেও, ছোটকাগজ গুলো প্রকাশে সম্পাদনাবোর্ডকে ব্যক্তিগত টাকার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়। তারপর প্রকাশনার চেয়ে দ্বিগুন টাকা ব্যায়ে বাংলাদেশ থেকে ছোটকাগজ গুলো আনাতে হয়। অভিঞ্গতা গুলো শেয়ার করবেন?
আ.র.মিলাদ : লেখক সৃষ্টিতে ছোট কাগজের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও শিল্পসাহিত্যের পৃষ্টপোষকের অভাব সব সময়েই। তাই ব্যক্তিগত উদ্যেগেই বেশীর ভাগ কাগজ প্রকাশিত হয়। এর ফলে প্রকাশনাগুলো স্বল্পায়ু হয়। মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়ে। এখানে প্রকাশনা অনেক ব্যয় বহুল, তাই প্রকাশনার কাজটা বাংলাদেশে করতে হয়। এখনও অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে আছে। সমস্যা পোহাতে হয় দেশ থেকে ‘শব্দপাঠ’ আনতে গিয়ে, আজকাল এটা অনেক ব্যয় বহুল। বাধ্য হয়ে সীমিত সংখ্যক কাগজ আনাতে হয়। এখানে বড় সমস্যা বিক্রি ও বিপণনের। এ ব্যাপারে সরকারী বা বেসরকারি প্রতিষ্টানের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। সকল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে অনেক সাহিত্যকাগজ প্রকাশনা হচ্ছে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বোধ থেকে।
আ.ই অভি:  বিলেতে  এখন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার একটি উর্বর ভূমি বলা যায়।যদিও এই পথ অতীতে অনেক বৈরী ছিল। আশির দশক থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির  ধারাবাহিক চর্চার সুফল আজকের এই সূর্যমূখী সম্ভাবনা ও পরিবেশ-
আ.র.মিলাদ : আমি বিলেত আসি ৮৭ সালের মার্চ মাসে। মনের ভেতর দ্বিধা ছিলো এখানে এসে বাংলা সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে পারব কিনা। কিন্তু সমস্যা পোহাতে হয়নি বরং সুবিদাই হয়েছে।আশির দশকে বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উজ্জ্বল ভূমিকার কারণে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্য পরিষদের কথা না বললেই নয়।তাদের তৎপরতা ছিলো চোখে পড়ার মতো। তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ততার সুযোগ হয়েছিল বলে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি। তা ছাড়া সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো সাহিত্যপাতা প্রকাশ করার ফলে লেখকরা উৎসাহবোধ করতেন। সাপ্তাহিক সুরমার ‘ইয়ং রাইটার্স গ্রুপ’ তরুণ লেখক সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া সংহতি, নজরুল সেন্টারসহ আরো কিছু সংগঠন সাহিত্য ও সাংস্কৃতি বিকাশে সহায়ক ছিলো।
আ.ই অভি:  ইতিহাস বলে, বিলাতে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আশির দশকে যে ইয়ুথ আন্দোলন হয়ে ছিল সে সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃত কর্মীরাই মূলত এর অগ্রণী যোদ্বা ছিল-
আ.র.মিলাদ : আপনি যদি লক্ষ্য করেন পৃথিবীজুড়ে যে কোন অশুভ শক্তির বিপক্ষে সাহিত্য ও সাংস্কৃতি কর্মীরাই সর্বপ্রথম রুখে দাড়িয়েছে, জ্বলে উঠেছে। আশির দশকে আমাদের দেশের দিকে চোখ ফিরালে দেখবেন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলো। এখানে আশির দশকে বর্ণবাদ বিরোধী ইয়ুথ আন্দোলনে বিলেতের অন্যান্য সংগঠনের পাশাপাশি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাদের সৃষ্টিকর্মে, মিটিং মিছিলে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছিল নিঃসন্দেহে।
আ.ই অভি:  সংহতি সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে  বিলেতের প্রথম কবিতা উৎসবে কবি পদক ২০০৮ পেয়েছেন। তৃতীয় বাংলা খ্যাত বিলাতে সংহতি কবিতা উৎসব এখন অভিবাসে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব হিসাবে বিবেচিত। সংহতি কবি পদক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে লেখকবোদ্বারা মনে করেন। আতারউর রহমান মিলাদ প্রথম কবি যিনি সংহতির প্রথম কবি পদকটি পেয়েছেন! অনুভূতিটা জানতে চাচ্ছি-
আ.র.মিলাদ : কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সংহতি পরিবারের প্রতি, আমাকে পুরস্কারে সম্মানিত করার জন্য।সংহতি আয়োজিত কবিতা উৎসব অভিবাসী সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম উৎসব এতে কোন দ্বিধা নেই। সকলেই প্রতীক্ষায় থাকে কখন অনুষ্টিত হবে এ উৎসব। যে কোন প্রাপ্তিই আনন্দের। সংহতি পদক প্রাপ্তিতে যেমন আনন্দিত হয়েছিলাম তেমনি শংকিত ও।কারণ পদকের ভার বহন করার ক্ষমতা খুব কঠিন। তবে আমাকে লেখালেখিতে প্রেরণা যুগিয়েছে।
আ.ই অভি: বাংলা একাডেমি গেল কবছর থেকে প্রবাসী সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করছে।যেখানে ব্রিটেন প্রবাসী লেখকদের  পদক প্রাপ্তির সংখ্যাটি এখন পর্যন্ত সর্বাগ্রে । বাংলা একাডেমি বইমেলাও ব্রিটেনে অনুষ্টিত হচ্ছে  ২০১০ সাল থেকে। অনেকে বলছেন প্রবাসী সাহিত্য লেখক  বলে আমাদের কে ব্রাকেট বন্দি করা হচ্ছে! আপনার অভিমত কি?
আ.র.মিলাদ : অবস্থানগত কারণে ‘প্রবাসী লেখক’ আখ্যায়িত করাকে আমি সহজ চোখে দেখিনা। আমরা পৃথিবীর যেখানেই থাকি বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যচর্চা করি। মুলধারার সাথে আমরা কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন নই, বরং তাদেরই অংশ। ‘প্রবাসী লেখক পুরষ্কার’ অভিবাসী লেখকদের অনুপ্রেরণা যোগাবে,যদিও পদকের নামকরণ নিয়ে দ্বিমত আছে।
আ.ই অভি: বাঙালীদের জন্য, ব্রিটেনকে বলা হয় -তৃতীয় বাংলা।সংখ্যাধিক্যের দিক বিবেচরায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পর ব্রিটেনে বাঙালীদের অবস্থান না হলেও মেধা,মনন,শৈলী ও বাঙালীদের সাহিত্য,সংস্কৃতি,ইতিহাস,ঐতিহ্য, উৎসবের  আলো ঝলমল দিক গুলো  বিশ্বে  বহু সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে দেবার জন্য মূলত বিলাতকে বলা হয় তৃতীয় বাংলা। তৃতীয় বাংলা অভিধাটি আপনার কাছে কেমন মনে হয়?
আ.র.মিলাদ : সার্বিক বিচারেই বিলেতকে ‘তৃতীয় বাংলা’নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এখান থেকে প্রকাশিত বইপত্র, সাহিত্য কাগজ, সাময়িকী, সাহিত্য সম্মেলন, কবিতা উৎসব, নাটক, বইমেলা, বিশেষ দিবস উদযাপন-এসব কিছুই তার সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশ ও কলকাতার বাইরে এখানেই বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতির উজ্জ্বল চাষাবাদ।
আ.ই.অভি:  শেষ প্রশ্ন, কবি গল্পকার আতাউর রহমান এর সুকুমার স্বপ্ন ও ভাবনা গুলো  জানতে চাই?
আ.র.মিলাদ : জীবনে দুঃখবোধ বা কষ্ট না থাকলে পূর্ণতা অনুভূত হয় না। কষ্টগুলো মানুষকে শুদ্ধ করে, দুঃখবোধ নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। দুঃখ কষ্ট হতাশা-সৃষ্টিশীলতাকে সমৃদ্ধ করে। প্রতিদিন নিজেকে ভেঙ্গে দেখার চেষ্টা করি জীবনের আয়নায়, মাটির দর্পণে আঁকি মানুষের মানচিত্র। আমি ক্রমাগত ছুটছি, পূর্বে পশ্চিমে, উত্তরে দক্ষিণে, গানে ও প্রাণে, জলে ও জালে-মানবিক শুদ্ধতায়।
আ.ই অভি:  আপনার নিরন্তন সাফল্য কামনা করি। অনেক ধন্যবাদ।
আ.র.মিলাদ : আপনাকে ও ধন্যবাদ।
আতাউর রহমান মিলাদ এর কবিতা
ঋতু ধর্ম
তুমি ভেজো শীতে, চারপাশে শীতকালিন ভেজাগন্ধ
কুয়াশার চাদরে স্পর্শ জড়ানো অন্তর্গত দ্বিধাদন্ধ
আড়মোড়া ভাঙ্গে সকালের রোদ, পাহাড় নদী ও ঘাস
মেলেছে আত্মমগ্ন চোখ, তুমি খুলোনি সুরক্ষিত অন্তর্বাস
শীতের সকাল, রোদের মগ্ন আলোড়ন, চোখ খুলে
সহসা দেখোনি তুমি আলোরা খেলছে চুলে ও আঙুলে
কি এতো আত্মমুখী সতর্ক পাহারা, চায়ের কাপে অন্যমনস্কতা
উৎসবে জাগেনা বন, বনে বনে পাখিদের নেই মুখরতা
এক মাঘে যায়না শীত, বছরে বছরে তার ব্যস্ত আয়োজন
শীতের কি দোষ! ঋতুধর্মে ফিরে আসে হাঁড়ের কাঁপন
তুমিতো ধারণ করো শীতবিন্দু কণা, শীত বস্ত্র ভুলে
ত্রিভুজ সংসারে দাড়াওনি মুখোমুখি রহস্যজট খুলে
রাতের প্রতিকৃতি
রাতের নীরবতা ভেঙ্গে জেগে উঠে যে জীবন
বিভ্রান্তির অন্ধকারে আমরা চিনিনা তাকে
আঁধারে সন্দেহ থাকে
ঘাপটি মারা ভয়
কে আসে কে যায়, জানা হয়না পরিচয়।
থেমে যায় মুখরতা, অস্থিত্বের জলোচ্ছাস
নিদ্রাহীন জোসনায় তারাভরা হাহাকার
মুখঢাকা করতলে
পিছলে পরা ভুল
অসফল ভ্রমন শেষে সম্ভ্রম হারানো ত্রিকুল।
রাতভর,
অস্থির বিশ্বাস বাড়ায় কষ্ট প্রহর।
আত্মমগ্ন প্রলেপ অথবা প্রলাপ
নিঃসঙ্গ নিজের ভেতর। তার ছেঁড়া বিচ্ছিন্নতা।আলোহীন অন্ধকার। স্বাভাবিক ভুল।
প্রতিদিন হাহাকার পাঠ। আত্মার নোনাঘাম।অতৃপ্তির অনাত্মীয় স্বাদ। পাজামা হারানো
আকুল ক্রন্দন।
কখনও কখনও সময় বিচ্ছিন্ন করে মানুষকে কিংবা মানুষ সময়কে। হিসেবী চশমাটা
গাঢ় হয়ে উঠে ভ্রমণকালীন ভোরে। স্বার্থপরতার রহস্য পূর্ণিমায় হারানো দীর্ঘশ্বাস ধারণ
করে জটিল আকার। চারপাশের কোলাহল বেজে উঠেনা ঘুঙুর পায়ে। মায়া মায়া ভুল,
স্বঘোষিত মায়ার কৌশল, অসময়ে নেচে যায় আঙুল ডগায়। আহত নদীর পাশে মুগ্ধ
ভায়োলিন বাজে কর্কশ সুরে।
আত্মমগ্ন পরিচিত আঁল ধরে মফস্বলী ক্লান্ত পা’ থেমে থেমে চলে যায় গন্তব্যহীন,
অসমাপ্ত গল্পের রাফখাতায়। কোথাও কোন বিমূর্ত ছাপ নেই, নেই ভাঁজকরা কোন বিরহশিল্প।
তবু কোন কোন সন্ধ্যায় পৃথিবীটা জলরং ছবি হয়ে যায়, নিমিষে।
সর্ম্পকের তৈলচিত্র
ভেঙ্গে পড়ে সুরক্ষিত দেয়াল, তিনভাগ মায়া
ভগ্নাংশ স্মৃতি নিয়ে বিকেলের বাদামী রং
আঁকে সম্পর্কের তৈলচিত্র
সময়ের কূটচাল
খসে পড়া পলেস্তারা, জামদানি শাড়ী
খাটের নিচে পরগাছা অন্ধকার।
বেড়ে উঠে মধ্যবয়সী নারীর প্যাচাল, খুড়োখুড়ি
গোপন স্বভাবে ফিরে আসে অমুদ্রিত ভুল
ভেঙ্গে পড়ে স্মৃতির কাপ
কফির অস্ফষ্ট ধোঁয়া
অসমাপ্ত সিগারেট, উপলব্ধির অচেনা ছবি
টেবিলে সাজানো গুচ্ছ গুচ্ছ মৃতফুল।
প্রতিদিন পসরা সাজানো বিজ্ঞাপনী ভাষা
অন্তর্দহনের নিভৃত শ্বাস
সেলাইয়ের হাত করে সোনামুখি সুইয়ের তালাশ।

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop