রাষ্ট্র পুলিশের নয়,পুলিশ রাষ্ট্রের

Share Button

Jamil-Sultan

ফারুক যোশী

গত ক’দিন থেকে বাংলাদেশে পুলিশের উপর গণমাধ্যমের যে রিপোর্টগুলো চোখে পড়ছে, তাতে যে কোন মানুষকেই ভাবিয়ে তোলবে। পুলিশের পক্ষ নিয়ে অনেকেই বলতে পারেন এগুলোর কি কোন ভিত্তি আছে কিংবা এ অভিযোগগুলো কি সত্যি ? যদি আমরা চোখ দেই সেই চা বিক্রেতা বাবুল মাতব্বরের প্রতি, যার মৃত্যুর পর পুলিশের উপর অভিযোগ উঠেছে গুরুতর। সবাই অভিযোগ করছে, চাঁদা চেয়েছিলো পুলিশ ,দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশি তান্ডবে একসময়ে ঐ নিরপরাধ মানুষটি শেষ পর্যন্ত মারা যান। কিংবা সেই রিক্সা চালক, যাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পায়ে গুলি করে তারপর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রেখে আসলো পুলিশ। কিংবা তার আগে ব্যংক কর্মকর্তা একসময়ের সাংবাদিক রাব্বির উপর পুলিশের নির্যাতন কিংবা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিদর্শক বিকাশ বড়–য়াকে মারধরের অভিযোগ উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। একইভাবে গত ৩১ জানুয়ারী এক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে এক পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে। এগুলো মাত্র এক মাসের উঠে আসা রিপোর্ট। বলা যাবে না এগুলো বিরোধী দলের কারো অভিযোগ এবং এ রিপোর্টগুলোর প্রায় সব কটিই শহর কেন্দ্রীক খবর। গণমাধ্যমে উঠে এসেছ এসব এবং এগুলোতে স্পষ্ট যে, প্রত্যেকটাতেই দেখা যাচ্ছে মূলত চাঁদাবজির কিংবা নৈতিকতাবিরোধী আচার-আচরনের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
যেহেতু গণমাধ্যমে এসেছে, সেহেতু এসব ঘঠনা নিয়ে নানাভাবেই আলোচনা আছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও বিভিন্নভাবে মন্তব্য আসছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ প্রসংগ এড়িয়ে চলার কোন সুযোগ নেই এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশে কোনকালেই জনগণের জন্যে শতভাগ পুলিশ বান্ধব ছিলো না। বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় ছিলো। সবসময়ই পুলিশেরবিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো। পুলিশের দায়ীত্বপ্রাপ্ত এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ছিলেন বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। আলতাফ হোসেন চৌধুরী কিংবা বাবরদের দুর্নীতি কিংবা গৃহপালিত পুলিশদের পক্ষ নিযে তখন তাদের মন্তব্য জাতির জন্যে হাস্যরসের সৃষ্ঠি করেছে। ‘আল্লাহ্র মাল আল্লায় নিছে’ বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য এখনও সম্ভবত সেরা নির্দয় কমেন্ট হিসেবে ইতিহাস হয়ে থাকবে এই বাংলাদেশে। ঠিক সেভাবেই রানা প্লাজা নিয়ে মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ‘ধাক্কা দিযে সহস্্রাধিক মানুষ হত্যা’র কমেন্টটিও হয়ে থাকবে হয়ত বাংলাদেশের সেরা নির্মম কমেন্টগুলোর একটা। সে হিসেবে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের রসালো-নির্মম উক্তিগুলোর যেন একটা ধারাবাহিকতা আছেই। এ বিবেচনায় বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুটা হলেও সংযত। মেপে মেপে কথা বলতে চেষ্টা করেন। যেহেতু বাংলাদেশে পুলিশ সরকারের একটা নির্ভরতার স্থান, হয়ত সেকারনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি তার এক বক্তৃতায় বলেছেন পুলিরাই দেশটাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। বিভিন্ন দুঃসময়ে এরাই অতন্দ্র প্রহরীর দায়ীত্ব পালন করছে।
২) দেশের শান্তি-শৃংখলা রক্ষা করা পুলিশের দায়ীত্বের মাঝেই পড়ে। এ দায়ীত্ব পালন তারা করছেও । সে কারনেই বিগত বিএনপি কিংবা জামাত জোটের মানুষ পুড়ানোর ‘আন্দোলনে’ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সরকার বিরোধী সন্ত্রাসীদের হাতে তারা নিহত হয়েছেন। একটা জাতিকে সুরক্ষা দিতে পুলিশের এই যে বিসর্জন, তা গোটা পুলিশ বিভাগকে শোকবিহবল করলেও পুলিশ বিভাগ এর জন্যে গৌরব করতে পারে। সে হিসেবে যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের পক্ষে বলেই থাকেন, তবে তাতে খুব একটা বাহুল্যতা নেই। তবে বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। আগেই উল্লেখ করেছি সরকার বদলের সাথে সাথে সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আবশ্যক হয়ে পড়ে। বিশ্বস্থতা সরকারের একটা বড় নির্ভরতা। যেহেতু বাংলাদেশ পশ্চিমা ধাচের কোন দেশ নয়। পশ্চিমা দেশগুলোতেও সরকার তার প্রয়োজনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন করেই। প্রত্যেকটা সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিজ দলের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ট নেতাদের দিয়ে সরকার গঠন করে। শুধু তাই নয়, দলের অভ্যন্তরেরও নিজের গ্রুপের নেতাদের নিয়ে কেবিনেট গঠন করে। ব্রিটেনে টনি ব্লেয়ার কিংবা গর্ডন ব্রাউনের সরকারের পরাজয়ের পর ব্লেয়ারতো বটেই তার সময়ের বড় বড় নেতারা এমনকি এখন রাজনীতি থেকেই অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এটাই নিয়ম। রাজনীতিতে ঠিকে থাকতে গেলে এসব করা কোন অবাস্তব অগণতান্ত্রিকতা নয়। কিন্তু সরকারী সকল কার্যক্রম আপাদমস্তক যখন দলীয় আবরনে আবৃত হয়ে যায়, মেধার বদলে মাস্তান কিংবা দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পেয়ে যে কোন পেশায় তরুনরা আসে, তখন দেশের চেয়ে দলের প্রতি আনুগত্যটা স্বাভাবিকভাবেই তাদের থেকে যায়। সেকারনে তারা তখন দেশকে সুরক্ষা করার চেয়ে দলীয় সুরক্ষাটা করে বেশী। এবং ক্রমেই এরা দলীয় ক্যাডার হিসেবেই বিবেচিত হয় সব জায়গায়। সহকর্মীরা এদের সমীহ করে। এমনকি উর্ধ্বতনরাও এদের ছোট ছোট অপরাধ-ত্রুটিকে এড়িয়ে যায়। এই সুযোগে এরা একসময় বেপরোয়া কিংবা দুর্দমনীয় হয়ে উঠে। আর এসবই ঘঠছে এখন বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগে। কিছু কিছু বেপরোয়া পুলিশ অফিসার নিজেদের পরিচয় এভাবেই দিচ্ছেন। যেমন রাব্বির ঘঠনায় জড়িত পুলিশ অফিসার বাড়তি সহানুভ’তির জন্যে যখন তার ফেইসবুক স্ট্যটাসে লিখেন ‘আমি মুজিবে সৈনিক, সেটাই আমার অপরাধ’, তখনই মনে হয় সরকার কিংবা জাতি তার কাছে কোন কিছুই নয়, মুজিব সৈনিক হওয়ার পরেও কেন তার এই অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখছে প্রশাসন কিংবা দেশের মুক্তিকামী মানুষ এটাই যেন তার জিজ্ঞাসা। আর এদেরকে তখনই উৎসাহিত করা হয়, যখন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মিডিয়ায় এসেই বলেন রাব্বির বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলাও হতে পারে কিংবা এই বিভাগ থেকেই বলা হয় পুলিশের এসব অপরাধের দায় পুলিশ বিভাগের উপর বর্তায় না। সে দায় তার ব্যক্তিগত।
আমরা স্বীকার করি প্রত্যেকটা মানুষকেই তার অপরাধের দায় ব্যক্তিগত ভাবে নিতে হয়। একজন খুনী যখন কাউকে খুন করে কিংবা বড় ধরনের অপরাধ সংগঠিত করে, তখন আমরা এটাকে একজন ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে ধরতে পারি, কিন্তু যখন আন্দোলনের নাম নিয়ে কতিপয় যুকব কিংবা একটা গুষ্ঠি মানুষ পোড়ায়, তখন আমরা এগুলোকে ব্যক্তির পুড়ানো হিসেবে দেখি না। আমরা তখন ধরেই নেই এটা সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস কিংবা মানুষ হত্যা করা। স্বাভাবিককারনেই তখন এর দায়ভার সেজন্যেই বিএনপি কিংবা জামাতীদের উপর পড়েছে। সেভাবেই নারায়নগনজের সাত খুনের সাথে যখন র‌্যাবের অফিসার তারেক সাঈদ কিংবা তার সহকর্মীরা সরাসরি জড়িয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত হন এবং অন্তরীন থাকেন জেলে, তখন এটাকে আমরা আর ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখতে পারি নি। সেজন্যে গোটা র‌্যাবই এ ঘঠনায় সমালোচিত হয়েছে। সেকারনে একজন পুলিশ অফিসার কিংবা একজন পুলিশ কনস্টেবলও যখন পুলিশের পোশাক পরে সাধারন নাগরিকদের উপর অনৈতিক আচরন করে, তখন এটা আর ব্যক্তির দোষ হিসেবে থাকে না, এটা প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তায়।
৩) গণমাধ্যমেই উঠে আসছে দেশের বিভিন্ন জায়গায কতিপয় পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠার খবর। এগুলো শুধু অভিযোগ নয়, সুস্পষ্ট প্রমানসহ এগুলো গণমাধ্যমে আসছে। সুতরাং পুলিশের এই অপরাধগুলো এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই। কতিপয় পুলিশের কারনে কেন-ই বা এ দায় কাঁধে নিচ্ছে পুলিশ বিভাগ। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র এই গোটা কয়েক পুলিশের নয়, কিংবা এ রাষ্ট্র পুলিশের নয়। পুলিশ রাষ্ট্রের সেবক। রাষ্ট্র যাতে শৃংখলিত থাকে, অপরাধ প্রবনতাকে নিরুৎসাহিত করতেই পুলিশ প্রশাসন কাজ করে। এ জায়গায় যদি পুলিশ নিজেই অপরাধের জন্ম দেয় ক্রমশ এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তারদেরও কেউ কেউ নিজেদের আরও বেশী দলীয় প্রমান করতে এইসব অপরাধীদের পক্ষ নেন, তাহলে এ রাষ্ট্র পুলিশী রাষ্ট্র হিসেবে মানুষ ভয় করতে শুরু করবে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই পুলিশ জনগণের আসলেও অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করছে এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি পুলিশের নয়। পুলিশ রাষ্ট্রের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop