লোকমান আহম্মদ আপন’র মুক্তিযুদ্ধের গল্প

Share Button

WarOfLiberationYoung
মুতির যুদ্ধযাত্রা

 

-এই ছেলে, এখানে ঘুরঘূর করছ কেনো?
-না মানে ইয়ে।
-ইয়ে মানে কি? যাও এখান থেকে। স্কুল নেই তোমার।
-স্কুল তো বন্ধ।
-স্কুল বন্ধ তো এখানে কি? যাও বাড়ি যাও।
মুতি আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ সরে গেল সেখান থেকে। সেখান থেকে মানে, নজীব ফার্মেসীর সামনে থেকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে আবার ঘুরঘুর করতে থাকে।

দেশে হানা দিয়েছে পাকিস্থানী হায়েনারা। নির্বিচারে মারছে মানুষ, পোড়াচ্ছে বাড়ি ঘর। বাংলার দামাল ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে। দেশে চলছে চরম অবস্থা। সিলেটের বিয়ানীবাজার তখনো আক্রান্ত হয়নি। এই অবস্থায় কি করা যায় এ নিয়ে বিয়ানীবাজারের নজীব ফার্মেসীতে রুদ্ধদার বৈঠক করছেন নেতারা। এ বৈঠক থেকে কি সিদ্ধান্ত আসে সেটা জানার জন্যে বাইরে ভিড় করে আছে কৌতুহলী সাধারণ মানুষ। অন্য আর দশজনের মত কিশোর মুতিও ঘুরঘুর করছে ফার্মেসীর সামনে। সন্ধ্যা হয়ে আসায় সেদিনের মত বৈঠক সিদ্ধান্ত ছাড়াই সমাপ্ত করে যে যার বাড়িতে চলে যায়। মন খারাপ করে মুতিও তার বাড়িতে চলে আসে। মুক্তির স্বপ্নে বিভোর মুতির দু’চোখে এক ফাটোও ঘুম হয়নি সারারাত। তার ভাবনায় এখন শুধুই মুক্তিযুদ্ধে যাবার আকাংখা। বুক জুড়ে বাংলা মায়ের জন্যে কিছু একটা করবার তীব্র চেতনা। যেভাবেই হোক কিশোর মুতিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতেই হবে। বাংলা মায়ের স্বাধীনতা আনবার জন্যে প্রয়োজনে জান বাজি রাখতেও প্রস্তুত সে।

images

পরদিন আবার বৈঠক বসেছে। নজীব ফার্মেসীর বাইরের কৌতুহলী মানুষের কানাঘুষা থেকে মুতি জানতে পেরেছে, নেতারা এখানকার ছেলে ছোকরাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর জন্যে একত্র করছে। বিষয়টা জানার পর মুতির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। কারণ সে প্রতিজ্ঞা করেছে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবে। কিন্তু কোন সুযোগ পাচ্ছে না। বৈঠকের এক ফাঁকে আওয়ামী লীগ নেতা ফৈয়াজুর রহমান ফৈয়াজ বের হয়েছেন ফার্মেসী থেকে। বের হয়ে তিনি সোজা মসজিদের দিকে হাটা ধরলেন। তার হিসু পেয়েছে। মুতিও তার পেছন পেছন যায়। ফৈয়াজ মিয়া মসজিদের প্র¯্রাবখানা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে মুতি সোজা তার সামনে দাড়িয়ে বলল
-চাচা, আমি মুক্তি হবো।
-মানে! কে তুমি?
-আমি বড়দেশ গ্রামের হাদি মিয়ার ছেলে মুতি। আমি মুক্তিযুদ্ধে যাবো চাচা।
ফৈয়াজ মিয়া আশে পাশে দেখে নিয়ে বললেন
-চুপ চুপ। আস্তে আস্তে বলো। তুমি অনেক ছোট। তাই তোমাকে নেয়া যাবে না। যাও এখান থেকে। আর শোনো, এসব নিয়ে কারো সাথে এভাবে কথা বলবে না, বুঝেছ। বাড়ি যাও এখন।
বলেই দ্রুত পায়ে হেটে আবার নজীব ফার্মেসীতে ঢুকে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন।
মুতিও আস্তে আস্তে আবার চলে আসে নজীব ফার্মেসীর সামনে।

ক্লাস টেনে পড়া টগবগে কিশোর মুতি। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় তাদের স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। স্কুল নেই তারপরও মুতি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হয় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবে বলে। কিন্তু কিছুতেই সুযোগ পাচ্ছে না। প্রতিদিন নজীব ফার্মেসীর সামনে এসে ঘুরঘুর করে, নেতারা যদি একটু সুযোগ করে দেন। মুতি সরাসরি কোন সিদ্ধান্ত জানতে পারে না। বাইরের কৌতুহলী মানুষের কানাঘুষা থেকে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত আঁচ করতে পারে শুধু। মুতি একদিন জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর জন্যে বেশ কিছু তরুণকে একত্র করা হয়েছে। তাদেরকে আগামীকাল থেকে বাবুর বাজার মাঠে ট্রেনিং দেয়া হবে। খবরটি জানা পর মুতির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। নেচে উঠে মন। দেশের জন্যে কিছু একটা করতে পারার সম্ভাবনা হয়তো তৈরী হয়েছে ওর জন্যে। মুতি দপ করে মাটিতে বসে পড়ে। খুশিতে নেচে উঠে মন। এক মুটি মাটি হাতে নিয়ে শুন্যে ছুড়ে মারে। মাটিগুলো ছড়িয়ে পড়ে তার মাথায় ও শরীরে। আর বেশিক্ষণ নজীব ফার্মেসীর সামনে দাড়িয়ে থাকার প্রয়োজন মনে করেনি সে। সোজা বাড়ি চলে যায়। দু’চোখে ঘুম আসে না তার। আসবে কি করে? দেশ মায়ের ঘোরতর এ বিপদের সময় মায়ের প্রকৃত সন্তান কি শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকাতে পারে? পারে না। মুতিও তাই নির্ঘুম রাত পার করছে।

মুতি পরদিন খুব সকাল সকাল বাবুর বাজার মাঠে চলে আসে। ওখানে তখনও কেউ আসেনি। মুতি মাঠের পাশের একটি ঝোপের আড়ালে চুপ করে বাসে থাকে। একটু পরেই বেশ কিছু তরুণ এসে জড়ো হলো মাঠে। আরেকটু পরে মাঝ বয়সী একজন ভদ্রলোক আরো দশ বারোজন ছেলেকে নিয়ে মাঠে ঢুকলেন। সবাইকে লাইনে দাড় করিয়ে প্রত্যেকের হাতে একটি করে বাঁশের লাঠি দেয়া হলো। শুরু হলো প্রশিক্ষণ। লেফট, রাইট, লেফট, রাইট।
মুতি আস্তে করে বের হলো ঝোপের আড়াল থেকে। ওর সাহসের তারিফ না কের পারা যায়না। এত্তোটুকুন একটা ছেলে এতোক্ষণ ঝোপের আড়ালে বসেছিল একা। এখন আবার এতোগুলো ছেলের সামনে এভাবে সাহস করে বের হয়ে যাচ্ছে নি:সংকোচে। সংকোচ থাকবেই বা কেনো? তার ছোট্ট বুকের গহীনে মুক্তির মন্ত্র যে গেঁথে আছে। দেশ মায়ের জন্যে মুতি প্রাণ বাজি ধরে রেখেছে। এজন্যে তার সংকোচ,ভয়, কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে।
মুতি আস্তে করে পেছনের একটি সারির পাশে দাড়িয়ে পড়ে চুপচাপ। তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন এই এলাকারই সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত আনসার কমা-ার কাজী আলাউদ্দিন। হঠাৎ তার চোখ পড়ে কিশোর মুতির দিকে। তিনি মুতিকে হাত ইশারায় কাছে ডেকে বললেন
-কে তুমি? এখানে কেন এসেছ?
-আমার নাম মুতি। আমি মুক্তিযুদ্ধে যাবো স্যার।
-কিন্তু তুমি তো অনেক ছোট?
-আমি পারবো স্যার। আমাকে ট্রেনিং করতে দিন। তারপর দেখুন আমি পারি কি না।
কমান্ডার আলাউদ্দিন এক মুহুর্ত কি যেনো ভাবলেন। তারপর বললেন
-ওখান থেকে একটি বাঁশ তুলে নিয়ে সামনের সারিতে দাড়িয়ে যাও।
-ধন্যবাদ স্যার।
তখন মুতির খুশি কে দেখে। এক লাফে একটি বাঁশ তুলে নিয়ে লাইনে দাড়িয়ে পড়ে। ভালোমত সেদিনের প্রশিক্ষণ শেষ করে সে। পরের দিনের প্রশিক্ষণের স্থান নির্ধারণ করা হয় স্কুলের মাঠ। একেক দিনে একেক জায়গায় প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে। কারণ, যাতে কেউ সন্দেহ না করতে পারে। যদিও বিয়ানীবাজারে এখনও পাকিস্থানীরা ঘাটি গাড়েনি, কিন্তু যেকোন সময়ে চলে আসতে পারে। তাই প্রশিক্ষণ চলছে জোরে শোরে। যাতে যুদ্ধের সামান্যতম ধারণা দিয়েই এই ছেলেগুলোকে কোন মতে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া যায়। পরে তারা সেখান থেকে ভালোমত প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পকিস্থানী হানাদার হায়েনাদেরকে ধ্বংশ করে বাংলা মায়ের কাংখিত মুক্তি ছিনিয়ে আনতে পারে।

চারদিন পর খবর আসে পাকিস্থানী হায়েনারা এগিয়ে আসছে। দু একদিনের মধ্যে তারা বিয়ানীবাজার দখল করে নেবে। খবরটি শোনার সাথে সাথে টেনশনে ঘেমে নেয়ে উঠছেন নেতারা। তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
নেতারা আরো তৎপর হয়ে উঠলেন। উপায় খুঁজছেন, কি করে এদেরকে তাড়াতাড়ি ভারতে পাঠানো যায়? প্রশিক্ষণ নিয়েছে চল্লিশজন তরুণ। এর মধ্যে একজনই মাত্র কিশোর এই মুতি। নেতারা অনেক কষ্টে একটি লক্কড় মার্কা ট্রাক জোগাড় করে আনলেন। এই ট্রাক দিয়ে কোন মতে যাতে এই সূর্য সন্তানদেরকে মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া হয়ে ভারতের আগরতলা পাঠিয়ে দেয়া যায়।

এপ্রিলের মাঝামাঝির এক কাক ডাকা ভোরে সবাই এসে ঝড়ো হলো ডাক বাংলায়। এলেন এলাকার বড়বড় নেতারাও। ট্রাকে উঠে গেছে একে একে সবাই। কিন্তু ছোট্ট বলে কিশোর মুতি কিছুতেই উঠতে পারছিল না ট্রাকে। ফৈয়াজ মিয়া মুুিতকে দেখে ধমক দিয়ে বলেন
-এই ছেলে। তুমি এখানে কেন?
-আমি মুক্তিতে যাচ্ছি।
-তুমি মুক্তিতে যাচ্ছ মানে? তোমার কি জানের মায়া নাই মিয়া? তোমাকে কে যেতে বলেছে?
পাশেই দাড়িয়ে ছিলেন কমা-ার আলাউদ্দিন। জবাবটা তিনিই দিলেন।
-আমি বলেছি ভাইছাব। ছেলেটি প্রশিক্ষণও নিয়েছে।
-বলেন কি?
-জ্বি ভাইছাব।
-ও তো ট্রাকেই উঠতে পারছে না। যুদ্ধ করবে কি করে?
কমা-ার আলাউদ্দিন মুতিকে কোলে করে ট্রাকে তুলে দিতে দিতে বললেন
– ইনশাআল্লাহ, আমাদের এ ছোট্ট দামাল ছেলেরা সোনার বাংলার মুক্তি ছিনিয়ে আনবে ভাইছাব।
ফৈয়াজ মিয়া আর কথা না বাড়িয়ে ধমকের সুরে বললেন
-এই, ট্রাক স্টার্ট করো।
গর্জে উঠে ট্রাকের ইঞ্জিন। সেই সাথে একসাথে গর্জে উঠে চল্লিশ বীরের আশিটি মুষ্টিবদ্ধ হাত। সবাই একাসথে গর্জন করে উঠল-জয় বংলা।
শব্দটি প্রতিধ্বনি হতে হতে ছড়িয়ে গেলো সারা দেশের আনাচে কানাচে। বাংলা মাকে আজীবনের জন্যে মুক্ত করবার জন্যে দেশান্তরে যাত্রা করছে একঝাক দামাল ছেলে। কেউ ফিরবে কেউ হয়তো ফিরবে না। কিন্তু বাংলা মায়ের মুক্তি ফিরে আসবেই আসবে।

১৯ নভেম্বর ২০১৫, শ্রীধরা, বিয়ানীবাজার, সিলেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop