শিল্প আর সংগ্রামে হাজং সম্প্রদায়

Share Button
 ‘আইও হাপাল গালা জাখা মারা জাং, জাখামারা না জালে হাঙ মারা জাং
কি ফুল ফুটিছে মাইলেঙ্গা ফুল, নাইসা নাইসা কয় তাও হাত ধরে তুল
ঐ কুলে এ কুলে ছয় কুড়ি নাও , নাওনি ভাহিসে দুর্গা মাও…’
এই গানটি গাইছিল কলমাকান্দার বনবেড়া গ্রামের সান্তনা, বিশাখা, বিনিতা ও সারনী। ছোটবেলায় অনেক অগ্রজদের এ গানটির সঙ্গে নাচতে দেখেছি। এটি যে হাজংদের সেটা জানলাম প্রথম। আমি গানটি শুনে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলাম ওদের দিকে। ওদের একজন গানটি লিখে দিল আমায়। এরপর সবাই ঐ জায়গায় দাঁড়িয়েই তালে তালে নাচ শুরু করলাম। ঠিক তখনই ভেবে নিলাম এই মুহূর্তটাকে নিয়েই কিছু একটা এঁকে রাখবো আসছে শারদীয়ায়।
জাতি বৈচিত্রের দেশ বাংলাদেশ। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসতি রয়েছে বর্মন, ডালু, কোচ,হদি, বানাই, রাজবংশী, গারো ও হাজংদের। হাজং  নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশই বসবাস করে নেত্রকোনার জেলার সুসং দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, ধোবাউরা, ময়মনসিংহের নালিতাবাড়ি ও শ্রীবর্দি এবং বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ, তাহেরপুর ও ধরমপাশা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। বৃহত্তর ঢাকার গাজীপুর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, টাঙ্গাইল জেলার  বিভিন্ন অঞ্চলে ও হাজং সম্প্রদায় বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছে বলে জানা যায়।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী  জাতিসত্ত্বার মধ্যে মোঙ্গলীয় হাজং সম্প্রদায় অন্যতম । নৃতত্ত্ববিদ হাডসনের মতে, কাছাড়ি  শব্দ  ‘হাজো’ থেকে ‘হাজং’ শব্দটি এসেছে। কাছাড়ি ভাষায় ‘হা’ অর্থ পাহাড় এবং ‘জো’ অর্থ পর্বত। পাহার পর্বতে ঘুরে বেড়ানো এ জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ‘হাজো’ বা ‘হাজং’। গাড়ো ভাষায় ‘হা’ অর্থ মাটি আর ‘জং’ অর্থ ‘কীট বা পোকা’। অর্থাৎ হাজং শব্দের অর্থ দাঁড়ায় মাটির পোকা। কোচ ভাষায় হাজংদের বলা হয় হাচং। হা অর্থ মাটি আর এবং চং অর্থ পোকা। এছাড়াও নৃতত্ত্বাতিকদের মতানুসারে  কাছাড়ি  শব্দ ‘হাজাই’ থেকেই ‘হাজং’ শব্দের উৎপত্তি। তাদের মতে কাছাড়িয়া দুটি দলে বিভক্ত; সমতলবাসী ও পর্বতবাসী। হাজংরা কাছাড়িদের একটি শাখা বলে মনে করে।
১৯৯১ সালের বাংলাদেশের  সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে হাজং জনসংখ্যা ১১ হাজার ৪শ ৭৭ জন। মতিলাল হাজং উপজাতীয় এক সাহিত্য সাময়িকীতে উল্লেখ করেন, বাংলা ১৩৩৯ সনে এ অঞ্চলে ৪০ হাজারের বেশি হাজং ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে এ অঞ্চলে ১৫ হাজারের মত হাজং বাস করছে। জনশ্রুতি রয়েছে, নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা, খারনৈ, রংছাতি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আনুমানিক প্রায় ৭৫০০ জন হাজং বসবাস করছে। মূলত এ অঞ্চলে হাজংদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। হাজংদের কখনো কখনো হিন্দুদের সাথে গণনা করা হয় তাই তাদের প্রকৃত সংখ্যা গবেষণার প্রতিবেদনে আসেনা। অন্যদিকে হিন্দু ধর্ম পালন করায় বিভিন্ন বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর হাজংদের নিয়ে গারোদের মত বিশেষ কোন গবেষণার পরিকল্পনা থাকে না ।
হাজং নারী পুরুষ উভয়ই পরিশ্রমী। জীবনে ধারণে গৃহস্থালী কাজ থেকে শুরু করে মাছ ধরা, জমিতে চাষ করা, ব্যবসা বাণিজ্য, কয়লা সংগ্রহ, টিলা বা পাহাড় থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করায় হাজং নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘকাল বাঙালিদের সাথে বসবাসরত হাজংদের শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিস্থিতি গারোদের চেয়েও অনুন্নত। গারো শিশুদের জন্য যেমন ওর্য়াল্ড ভিশনের স্পনসরশিপ, ইসিডি সহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। হাজং শিশুরা সে সকল সুযোগ সুবিধা পায়না। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় পাহাড় ঘেষা গ্রাম যেমন আটচেপ্পা, বামনগাঁও, রানীগাও, নয়নকান্দি, বনবেড়া, বগাডুবিসহ বিভিন্ন গ্রামের  হাজং শিশুদের সাথে শিক্ষার সম্পর্ক বেশ নাজুক।  হাজং গ্রামগুলোর রাস্তাঘাট, বন্যার পানি, বাবা মায়ের অসচেতনতা, ভাষার দুর্বোধ্যতা, বিদ্যালয়ের অপর্যাপ্ততা ইত্যাদি কারনে হাজং শিশুদের লেখাপড়ার হার খুবই কম। এটা যে শুধু হাজংদের ক্ষেত্রেই তা নয়। তবে ঐ এলাকায় বসবাসরত মান্দিদের চেয়ে হাজং জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার কম।
হাজংদের ভাষার কোন লিপি বা লিখিত রূপ না থাকায় বর্তমানে  বাংলা  ভাষায়ও তারা  পারদর্শী। পালি ও চাকমা ভাষার সাথেও হাজংদের ভাষার যথেষ্ট মিল রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। গ্রিয়াসর্ন  এ সম্প্রদায়ের ভাষাকে টিবেটো বর্মন  জনগোষ্ঠীর ভাষা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন হাজং ভাষা বাংলারই উপভাষা। অহমিয়া ভাষার সাথে হাজং ভাষার সদৃশ্যের কথা বলেছেন তিনি।
ক্রমশ শহরমুখী হওয়ায় হাজংরা তাদের এতিহ্যবাহী পোশাক কম পড়ছে। বর্তমান প্রজন্মের হাজং শিশুরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পাথিন পরতে  চায়না। দুর্গাপুর গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির  ছাত্রী অনন্যা হাজং জানায় তার পাথিন ভাল লাগে না। পাথিন এর চেয়ে সালোয়ার কামিজ আরামদায়ক। তাছাড়া পাথিন পরে অন্য এলাকায় গেলে সবাই তাকিয়ে থাকে। তার নিজেকে তখন অন্য মানুষ মনে হয়। এটা অস্বস্তিকর।  ৬০ বছর বয়সী  সাধনা হাজং জানায়, সে যখন খুজিগড়া তার এলাকায় ছিল তখন তাদের পোশাক পড়ত। এখন শহরে থাকে তাই তাকে শাড়ি পড়তে হয়। তবে শাড়ির চেয়ে পাথিন পড়লে তার কাজ করতে সুবিধা হয়। তার ভাষায় ‘ময় দুর্গাপুরনি থাকে । পুলা, বউ শিক্ষিত, চাকরি করে। নাতি পুতি লেখাপড়া করে উদাবেদেন দুবরা পিনিব লাগে। আসলে আরাম লাগে পাথিন পিনিব লাগে।’
এ সম্প্রদায়ের  শিল্প-সাহিত্য ও সংগ্রামে ইতিহাস অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। সাহিত্য সমীক্ষায় হাজংদের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য গানের কথা জানা যায়। যেমন রসিগান, ভাঙা নৌকার গান, গীতলুগীত, গোপিনীগীত, বানাগড়া গান,  গীত চোর চোর মাগা গান, গুটুরগুটুর গীত, চপমাত্রা, বোঘাল গানো গান, টেংলা গান, নয়া খাওয়া গান ইত্যাদি। বর্তমান হাজংদের বেশির ভাগই এই সকল গান গাইতে পারে না।  হাজংদের নিজস্ব ভাষায় অনেক ছড়া রয়েছে। হাজং হরিদাসের এক লিখনির একটি ছড়া;
‘এক  টিপসা হাপালা,
  নিতাই নাম,
  ধান মসা পাড়কে দেয়
  সোনার গাং’- অর্থাৎ এইটুকু ছেলেটা নিতাই নাম ধরে, ভবনদী পাড়ি দিতে সাহায্য সে করে।
ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী এ জাতিসত্তার রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস।  উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাজংরা হাতিখেদা আন্দোলন সংঘটিত করে। জমিদার হাজং সম্প্রদায়কে জংলী হাতি শিকার এর মত ঝুঁকিপূর্ন কাজে ব্যবহার করে। খেদার ফাঁদে হাতি আটকাতে গিয়ে প্রায়ই পিষ্ট হতো হাজংরা। কিন্তু হাতির লাভজনক বিক্রির কোনো অংশ তারা পেতনা। জংলী হাতি বিক্রির টাকা খরচ হত জমিদারদের ভোগ বিলাসে। এই পরিস্থিতিতে মনা সর্দারের নেতৃত্বে বিদ্রোহের দানা বাঁধতে থাকলে জমিদাররা মনা সর্দারকে হাতির তলায় পিষ্ট করে মেরে ফেলে। খবর পেয়ে তার অনুসারিরা অস্ত্র তুলে নেয় হাতে। বিদ্রোহীরা চেংনী, ধেনকি, বিজয়পুর, ভরতপুর, ফারাংপাড়াসহ অনেক জায়গার হাতি ধরার খেদা ভেঙ্গে ফেলে। আন্দোলনের তোপে জমিদার ভয়ে আশ্রয় নেয় নেত্রকোনায়।
১৯৪৬ -৫০ সালে হিন্দু জমিদারের ধান্যকর বা খাজনা আদায়ের বিরোধিতায় কমরেড মনিসিংহ এর নেতৃত্বে সংঘটিত টংক আন্দোলনে অগণিত হাজং প্রাণ বিসর্জন দেয়। রানী রাসমনি হাজংদের পক্ষ থেকে এ আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশ সেনাদল টংক আন্দোলন নস্যাৎ করতে হাজং পুরুষের খুঁজে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরের বহেরাতলী গ্রামে প্রবেশ করে। কাউকে না পেয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। লংকেশ্বর হাজং এর নববধু কুমুদীনীকে ধরে নিয়ে যেতে থাকে। খবর পেয়ে রানী রাশিমনি বলেন ‘ময় তিমৗ. ময় জানি তিমৗদলৗ মান। ময় রুক্ষা কুরিব না তে মনিবু। তুরা থাক তুমলৗ নীতি নিয়ৗ বুইয়ৗ থাক’ অর্থাৎ আমি নারী আমি জানি নারীর সম্ভ্রমের মান। নারীর মান আমি রক্ষা করবো, নয় মরবো তোরা থাক তোদের নীতি নিয়ে বসে। এরপর তাঁর নেতৃত্বে একদল হাজং নারী  ব্রিটিশ সেনাদলের পথরোধ করে এবং  এ আন্দোলনে প্রাণ হারায় রাশিমনী হাজং ও সুরেন্দ্র হাজং এর মত অনেক হাজং প্রাণ।
ক্ষুত্র এ জাতিগোষ্ঠী  সনাতন ধর্মানুসারী। বাঙালি হিন্দুদের  মত সকল দেবদেবীর উপাসনাই তারা করে। তবে অঞ্চলভেদে নিজস্ব কিছু পার্বণও তারা করে। কামাক্ষা মা হাজংদের প্রধান দেবতা বলে দাবী করেন কোন কোন হাজং বয়জোষ্ঠ্য। বাঙ্গালি হিন্দুদের মত দুর্গাপূজাও তারা সাধ্যানুসারে ধূমধাম করে পালন করে। দুর্গাপূজার আয়োজন নিয়ে আমেনা হাজং বলেন, ‘আমলা দুর্গাপূজার সময় টেকা পয়সা না থাকে। এডায় আমরা নয়া কাপড় কিনিবা না পায়। ওদি আমলা ছাওয়া সতাগালাগে নয়া কাপড় কিনিবা না পায়। দুর্গা পূজার সময় দেও বানাইলে বাখার পয়সা লাগে উদি আমলা চার পাজা পাড়া মিইল্যা দেও বানাই।’ অর্থের জন্য হাজং জনগোষ্ঠী কয়েকটা গ্রাম বা পাড়া মিলে একজায়গায় দুর্গাপূজার আয়োজন করলেও মা যে কয়েকদিন থাকে তারা তাদের সাধ্যানুযায়ী পূজা দেয় মাকে। নিজেদের ভাষার গান গায়, নাচ করে। আনন্দ শেষে  বিসর্জনের সন্ধ্যোয় নারী পুরুষ সবাই মিলে মায়ের ভাসানে যায়। শেষ হয়ে যায় পূজার আনন্দ। জীবন চলে আবার জীবনের মত।
আত্ম সচেতন, স্বাধীনতাপ্রিয় ও পরিশ্রমী হিসেবে হাজংদের সুনাম সর্বত্র। আচার, আচরণ, রীতিনীতি ও নিজস্ব ঐতিহ্যে তারা স্বাতন্ত্রের অধিকারী। অথচ এই হাজংদের ঐতিহ্যবাহী  সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে। অভাব অনটন অবহেলার বেড়াজালে এ নৃগোষ্ঠী পারছেনা সংরক্ষণ করতে তাদের ঐতিহ্য। এই সংকট থেকে হাজংদের রক্ষাকরণে সরকারি ও বেসরকারি  সহযোগিতা  মানসিকতা সৃষ্টি না হলে ভূখ- হারাবে হাজংদের বৈচিত্র্য। কোন একদিন হয়ত এ জনগোষ্ঠির শারীরিক স্বাতন্ত্র ছাড়া আর কোন স্বাতন্ত্রই খুঁজে পাওয়া যাবে না। শারদীয়ায় আমাদের প্রার্থনা ও প্রত্যাশা হোক আমাদের ভূখ-ে আমরা সব জাতিসত্তা বেড়ে উঠবো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk