সালেহা চৌধুরী’র গল্প

Share Button

4115068779_59a21e5554_o
একটি জাপানি গল্প

জায়গাটি জাপানের কিয়োটো শহর। চেরি ব্লসম নামের একটি রোমান্টিক হোটেলে উঠেছেন আফতাব সাহেব। লাউঞ্জের সামনে বাগানবিলাসের ভেতর দিয়ে একটা পথ। চারপাশে কেয়ারি করা গাছ। ফুলময়। একটা গাড়ি এসে থামে লাউঞ্জের দোরগোড়ায়। এ পথে দুটো গাড়ি পাশাপাশি চলে না। একটা গাড়িকে পথ দেখায় দারোয়ান।

দেশের নানা প্রকার সমস্যার যে কোন একটির বাণিজ্যিক সমাধানের কারণে তাকে প্রথমে টোকিও, তারপর ওসাকা এবং সবশেষে কিয়োটোতে আসতে হয়েছে। চমৎকার দেশ এই জাপান। চেরিব্লসম নামের এই চমৎকার হোটেলে সাকি নয় কফি পান করছেন আফতাব সাহেব। আজ তার তেমন কাজ নেই। আজ শহরটা ঘুরে দেখার কথা। একটু দেরিতে উঠে, বড় একটা শাওয়ার নিয়ে এখন কফির কাপ সামনে রেখে বেশ একটু আয়েসী ভঙ্গিতে একটা সাজানো গোছানো চারজনের টেবিলে একা বসে আছেন। কেমন এক আলসে ম্যাজমেজে ভাব তার মনে। রাতে নানা ধরণের স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নগুলো বিমূর্ত ছবির মত। পাখির মত ছোট মেয়েরা নীল আকাশে উড়ছে। একসময় কেবল পাখি হলো মেয়েরা। তারপর তার স্ত্রী প্রমার বাগানে ঘুরে আবার একটা প্রজাপতি হলো। তারপর দুটো মেয়ে হাসতে লাগলো। চমৎকার দুটো মেয়ে, অবিকল এক রকম।

দেশে ফিরতে আর মাত্র চারদিন বাঁকি। আর একটা প্রয়োজনীয় মিটিং, তারপর দেশে যাওয়া। ছেলে দুটো আর প্রমার জন্য নানাসব কেনাকাটা সেরেছেন। এখন প্রমার জন্য একটা স্পেশাল জিনিস কিনতে বাঁকি। সেটা যে কোথায় ভালো পাওয়া যায় তা তার জানা নেই।

কিন্তু এক ধরণের উদাস আলস্য তাকে অধিকার করেছে। এখন ভাবছেন এই ভাবে বসে বসে সারাদিন কাটিয়ে দেবেন। কোন কাজই করবেন না। পাখি, বসন্ত বিভাব, ব্লসম আর ঝুলে থাকা আকাশ দেখার মত কেমন এক ভঙ্গুর মন তার। যাকে ইংরাজিতে বলে ভার্নারেবল স্টেট। তিনি ভাবছেন কোন কাউকে পেলে জেনে নেবেন প্রমার পছন্দের সেই ভালো জিনিসটা কোথায় পাওয়া যায়। ম্যালা সময় হাতে। বাইরের ঘন সবুজ বড় বড় গাছ আর সুন্দর ফুলের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রমার মুখ ভাবছেন। আফতাব সাহেব তার স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। যেন এই প্রমা প্রথম দিনের প্রমার মত বেনারসি আর আতরের গন্ধভরা একজন। তিনিও ঠিক প্রথম দিনের মতই ভালোবাসেন। দশ বছরের বিবাহিত স্ত্রীকে। আবেগে, উত্তাপে গভীর নিবিড় ভাবে। স্ত্রীর জীবনের যে টুকু রহস্য আর গোপনীয়তা তাকে মেনে নেন শান্তভাবে। একটু গোলগাল হয়ে ওঠা প্রমার বাড়তি ওজনকে গ্লামার মনে করেন। গালের টোলের হাসিতে, চোখের ড্যাবডেবে কাজলে প্রমা চিরকালই আফতাবের চোখে থৈ থৈ লাবণ্যের সরোবর।

লাউঞ্জের কাঁচের ওপারে একটা চমৎকার মার্সিডেজ বেঞ্জ এসে থেমেছে। রংটা হালকা নীল যাকে বলা হয় আকাশ নীল। জাপানে জাপানি গাড়ি বাদ দিয়ে মার্সিডেজ? কার এমন শখ? গাড়ির দরজা খুলে যখন ড্রাইভার একপাশে দাঁড়ায় একটা জাপানি মেয়ে গাড়ি থেকে নামে। জাপানি ডলের মত জাতীয় পোশাকে অপরূপ একটি মেয়ে। শরীরে অনাবশ্যক কোয়ার্টার পাউন্ডও মেদ নেই। ড্রাইভার দরজা খুলে একটু বো করে। এখন কিমোনো পালাপার্বন ছাড়া কেউ পরে না। সকলেই গেঞ্জি ট্রাউজার বা ফ্রক। মেয়েটার মৌচাকের মত খোঁপা থেকে, সাদা হাতির দাঁতের কাটা, থেকে লাল ফিতে ঝুলে আছে। বয়স কত হবে ভাবছেন তিনি। খুব বেশি হলে পঁচিশ টচিশ। একটু হালকা পাতলা মেয়ে চুলে ফুল গুঁজে কিমোনো-কিংখাবে যেন বাতাসের উপর দিয়ে উড়ে আসছে।

মেয়েটা লাউঞ্জে ঢোকে। তারপাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে কি যেন প্রশ্ন করে রিসেপসনিস্টকে। তারপর উত্তর শুনে তার টেবিলের পরের টেবিলে একটা চেয়ার টেনে বসে। মেয়েটা তার টেবিলের দিকে তাকিয়েছিল কিন্তু বসেনি। ওর টেবিলটা দুজনার। বটুয়ার মত ব্যাগটা টেবিলে রাখে। ব্যাগখুলে আয়না বের করে নিজের মুখটা বেশ একটু অনেকসময় ধরে নিরীক্ষণ করে। তারপর নাকের কাছে কমপ্যাক্ট পাউডারের পাফ বুলোয়। চুলটা হাত দিয়ে পরখ করে। কাঁটা ঠিক আছে কিনা আঙুলে জেনে নেয়। একটা পারফিউম বেশ কয়েকবার স্প্রে করে। অপূর্ব একটা গন্ধে ভরে যায় মেয়েটার চারপাশ। সে গন্ধ আফতাব সাহেবও বুঝতে পারেন। অনেকটা নিনারিচি আর নারকেল বনের গন্ধের মত আবেগঘণ। প্রমার কারণে বেশ কিছু পারফিউমের নাম জানেন তিনি।

প্রমার পছন্দ পারফিউম। যেখানেই যান আফতাব সাহেব দু এক শিশি পারফিউম নিয়ে বাড়িতে ফেরেন। এখনও পারফিউম কেনা হয়নি। মনে হলো একবার জাপানি মেয়েটাকে কি জিজ্ঞাসা করবেন তাহিতি দ্বীপের পারফিউমের কি নাম? এমন পারফিউম পেলে প্রমা তাকে সাতদিন আদর করবে। সে দৃশ্য কল্পনা করে তিনি মনে মনে হাসেন। শাড়িতে পারফিউম মেখে বাতাসের ভেতর দিয়ে গান করতে করতে এমন সব প্রেমের নকশা এঁকে দেয় যার ঘোর রয়ে যায় অনেকদিন। এমন একটা ভাবনায় মুখটা হাসি হাসি। ভাবছেন উঠে গিয়ে প্রশ্ন করবেন কি নাম এমন সুবাসের। এক পট চা এসে গেছে মেয়েটার সামনে। তিনি সত্যিই ওঠেন এবং এক্সকিউজ মি বলে একটা প্রশ্ন করেন। মেয়েটা যখন তার দিকে তাকিয়ে হাসে মনে হয় চারপাশ আলো হয়ে গেল। এবং তার হৃদয়ের ভেতর একটু তোলপাড়। একই ভাবে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চমৎকার নাক, অপরূপ চোখ, সুচারু গাল, নিখুঁত চিবুক, কপালের বৈভব, সেসব থেকে চোখ ফেরাবেন সাধ্য কোথায়? মেয়েটার কাছে এমন অনিমেষ দৃষ্টি নতুন কিছু নয়। সে স্পষ্ট ইংরাজিতে বলে – ওন্ট ইউ সিটডাউন।

আমি বসব? তিনি একটু বিব্রত এবং জড়সড়ো। বলেন – আমি কোথায় বসব?

ওই তো একটা চেয়ার। প্লিজ বি সিটেড স্যার। মেয়েটা হাসছে। আফতাব সাহেব একেবারে ধন্য। গলে জল। হৃদয় দ্রিম দ্রিম। ভাবতেও পারেন নি মেয়েটা তাকে সামনের চেয়ারে বসতে বলবে।

আসলে আমি জানতে চেয়েছিলাম এই পারফিউমটার নাম কি? এবং কোথায় পাওয়া যায়?

পারফিউম? মেয়েটা তার ব্যাগ থেকে পারফিউমের শিশিটা বের করে। বলে – কোকো স্যানেলের নতুন ব্রান্ড। তাহিতি আর নিনারিচির মিলিত গন্ধ। তিনি একটু চমকান। এমন একটা তুলনা তার মাথায়ও এসেছিল। ‘প্রমিজ ডিউ’ নামটা বোতলের উপর জ্বল জ্বল করছে। হালকা নীল আর গোলাপি মিলে এমন একটা রং যেন হেনরি মাতিসের ছবি। যেখানে নামটাও বেশ একটু শৈল্পিক ও সুচারু। প্রতিজ্ঞার শিশির নামটাও জ্বল জ্বল করছে। তিনি পারফিউমের শিশিটা হাতে নেন। মেয়েটা একটু হেসে বলে- একটু দামি। বাট ওয়ার্থ এভরি পেনি।

আই বেট। বেশ একটু কায়দা করে বলেন তিনি। বিদেশ ঘুরে এসব কায়দা বা কতোদূর, কথাবার্তায় তিনি চমৎকার। তাছাড়া তার স্মার্টনেসও অবহেলার নয়। তবে ভেতরে ভেতরে একটা দুঃখ আছে তার একটি মেয়ে হবে যে দেখতে তার মায়ের মত এবং যার নাম রাখবেন তিনি প্রমি, সে ঘটনা ঘটছে না। সাত বছর হলো এই ইচ্ছাটা বাস্তবে রূপ পায়নি। এখন মনে হলো তার মেয়ে এই জাপানি মেয়েটার মত হলেও বা ক্ষতি কি? নাম রাখবেন চেরি বা সাচি। বলেন তিনি – তুমি একটু কষ্ট করে নামটা লিখবে একটু? মানে পারফিউমের নাম? যদিও ইংরেজি ইউ কিন্তু মনে মনে ভাবছেন তুমি।
নাম? লিখছি।
এই বলে ব্যাগ থেকে সোনা রংএর একটা কলম বের করে। তাহিতি আর নিনারচির মিলিত গন্ধের পারফিউম প্রতিজ্ঞার শিশির হয়ে সামনে রাখা। বলেন তিনি -সরি টু ট্রাবল ইউ।

নট এ্যাট অল স্যার। মেয়েটার হাতের লেখা ঝকঝকে। একটা ছোট কাগজে প্রতিজ্ঞার শিশির নামটা গোটা গোটা হয়ে ফুটে আছে। এরপর একটু সহজ বা রিলাক্সড হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন – কিমোনো পরেছো কেন? আজ কি কোন স্পেশাল দিন।

আজ? ঝক ঝক করছে দাঁত। মেয়েটা হাসছে। অত্যন্ত স্পেশাল দিন। কিন্তু কেন আজ বিশেষ দিন তার কোন ব্যাখ্যা করে না। এরপর দু একটা কথা হয়েছে কি হয়নি একজন রিসেপসনিষ্ট কাছে এসে জাপানি ভাষায় মেয়েটাকে কি যেন বলে। মেয়েটা প্রথমে একটু বিষণ্ন তারপর একটু হাসি এসে ছোঁয় তার চেরিফুলের মত গালে। বলে সে রিসেপসনিস্টকে – ঠিক আছে আমি অপেক্ষা করছি। রিসেপসনিস্ট চলে যায়। মেয়েটা তাকায় তার দিকে। আফতাব সাহেব সেই স্পেশাল জিনিসটার নাম করেন। বলেন -বলতে পারো জিনিসটা কোথায় পাওয়া যায়? মেয়েটা একটু ভাবে। তারপর একটা জায়গার নাম বলে। যখন তিনি জায়গাটার কথা বুঝতে পারেন না মেয়েটা আর একটা ছোট কাগজে সেই জায়গার নাম ঠিকানা লেখে। তিনি লক্ষ করেন পাখির ডিমের মত একটা হিরে মেয়েটার অনামিকায়। বিয়ের আংটির পাশে। ও মেয়েটা তাহলে বিবাহিত। কোন বিশেষ ঘরাণার গেইশা সে নয়। মনে এমন একটা ভাবনা এসেছিল মনে – মেয়েটা গেইশা। তাহলে আজ কি ওদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি? কিন্তু হুট করে এমন একটা প্রশ্ন করা যায় না। বলেন কেবল – হিরে এত বড় হয় সেটা আমার জানা ছিল না। মেয়েটা হাসে। তিনি লক্ষ করেন মেয়েটার দুই কানে দুটো হিরে। এবং ব্রেসলেটে কয়েকটি। মেয়েটা একটা ওয়েট্রেসকে ডাক দেয়। কথা হয় ইংরেজিতে। বোধকরি তিনি আছেন তাই। বলে সেই ওয়েট্রেস – কেমন আছো সুকি?

ভালো মিচিকো।
আমাদের আরো চা দাও। ওয়েট্রেস এবার জাপানি ভাষায় কি যেন বলে। এরপর দুজনেই হাসে। এরপর মিচিকো নামের মেয়েটা চা আনতে চলে যায়। সুকি তাকে গ্রীন টি আনতে বলে। – আরো কিছু গ্রিন টি মিচিকো। সঙ্গে দু টুকরো আদার কেক।

অবশ্যই! এই বলে মিচিকো দ্রুত চলে গেছে। আফতাব সাহেব প্রশ্ন করেন মিচিকো চা দিয়ে চলে গেলে-তুমি বুঝি প্রায়ই এখানে আসো?
এখন বেশি আসতে পারি না। সময় পেলেই আসি। জায়গাটা আমার চেনা। এখানে আমি পাঁচ বছর কাজ করেছি।

তুমি কাজ করেছো? কী কাজ?
বিনা সংকোচে মেয়েটা বলে ওয়েট্রেস। মিচিকোর মত। এমন কথা শুনে মিচিকোর আনা সবুজ চায়ের কাপে চা ঝলকে পড়ে। তিনি অবাক হন। পাখির ডিমের মত হিরে আর ডালিমের মত কুচি কুচি হিরের তারা সারা শরীরে জ্বলছে যার তার দিকে ভালো করে দেখতে হয়। মনে পড়ে যায় সোফার ড্রিভেন মার্সিডিজে যে মেয়েটা এসেছে। যে অপরূপ এক রাজকুমারীর মত। মেয়েটা চা সিপ করছে আপনমনে। বলে সে এবার – আপনি কত নম্বর ঘরে থাকেন?

আমার রুম নাম্বারটা মজার। বলেন আফতাব সাহেব।
কেমন মজার?
আমার রুম নম্বর সাত সাত সাত। সাতলায় থাকি।
কি বললেন? চায়ের কাপ তাড়াতাড়ি নামিয়ে রেখেছে মেয়েটা। বলেন আবার আফতাব সাহেব – একেবারে জেসমবন্ডের হিরোর মত নম্বর- সাত সাত সাত। সেভেনের কারবার। আর কোন রুম ছিল না বলে ওই ঘরটা দিতে বাধ্য হয়েছে। এমন কিছু বলছিলেন ম্যানেজার।
সেভেন একটা ম্যাজিকাল নাম্বার। সত্যিই তাই। এই বলে মেয়েটার নরম, দীর্ঘ, সুন্দর আঙুল টেবিলের ফুলদানির ফুল গুলোতে আলতো স্পর্শ রাখে। ওর চোখে নেমে আসে এক ধরণের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। যেন সাত সাত সাত ঘরে থাকার জন্য মিস্টার আফতাব একজন বিশেষ ব্যক্তি। মেয়েটা বলে -আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশী হলাম। আফতাব সাহেব বলেন – তুমি কি সংখ্যাতত্ব বিশ্বাস কর সুকি?

মেয়েটা হাসে। এত সহজে সুকি বলে যে ডাকছে তাকে ওর ভালো লাগে। বলে – আগে করতাম না। এখন করি। আমি জানি সাত একটা ম্যাজিকাল নাম্বার। আর তিনটা সাত একসঙ্গে একেবারে ম্যাজিকাল ঘটনা। আর সেটা আমি জেনেছি ওই ঘরের কারণে। আফতাব সাহেব বেশ একটু নড়ে চড়ে বসেন। মনে হয় এখনো সুকির হাতে কিছু সময় আছে। সে বললেই ওই ঘরটা নিয়ে একটা বিশেষ গল্প করবে। মেয়েটা তার ঘড়িতে চোখ রাখে। ছোট ছোট হিরের দানায় যেখানে সময় লেখা। তারপর একটা গল্প বলবে বলে যখন মুখ তোলে, ওর মুখটায় সকালের প্রথম সূর্যের আলোর ফেসপাউডারের স্পর্শ লাগে – উজ্জ্বল আর কোমল।
সুকি একটা গল্প শুরু করেছে। একটা গভীর, নীরব, একা, হ্রদের জলে ছোট ছোট নুড়ি ফেলছে কেউ।

-আজ তোমার জন্মদিন। আজ ছুটি নিলেই তো পারতে। কাজে এসেছো কেন?
-আমার জন্ম দিন নিয়ে হৈ চৈ করবে তেমন তো কেউ নেই আমার স্যার। হোটেলের ম্যানেজার কুরোশুয়োকে বলেছিল সুকি। মা, বাবা, ভাইবোন কেউ নেই আমার স্যার। সেদিন ছিল মার্চের সাত নয় চার তারিখ। তখন সুকি একটা সাধারণ মেয়ে। সাতদিনই কাজ করে নিজের জন্য। ঘর ভাড়া, খাওয়া, কাপড়চোপড়। সাতদিন কাজ না করে উপায় আছে? যেমন করে আর দশটা কর্মজীবি মেয়ে বাঁচে তেমনি করেই বেঁচেছিল সে। কেবল ওর চাঁদের মত অমলিন কপালে যখন দু একটা কুচো চুল উড়ে এসে পড়তো সে দৃশ্য থেকে চোখ ফেরাতে পারতো না অনেকে। অমলিন কপাল। যাকে উর্দুভাষায় বলে মাহজাবিন। সুকিকে বলেছিলেন ম্যানেজার কুরোশুয়ো – তোমাকে একটা দায়িত্ব দিলাম আজ। কাজটা মন দিয়ে করবে। আজ আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে। সাত সাত সাত ঘরের সবকিছু কয়েকদিন হলো আমি নিজে দেখছি। তুমি কী খেযাল করেছো? সুকি বলে – করেছি।

ওখানকার খাবার দাবার, দেখাশোনা আমি নিজে করছি। কারণ ওখানে একজন বিশেষ মানুষ আছেন।
কেমন মানুষ?
শুধু মনে রাখবে তিনি একজন অসাধরণ মানুষ। বলতে পারো তিনি এ জগতের আবার এ জগতের নন। তুমি খুব যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে তার খাবার দেবে। তোমাকে বললাম। কারণ প্রিয় বা সুন্দর মুখের একটা ব্যাপার আছে তোমার। কিন্তু মনে রাখবে লোকটা সত্যিকার অর্থেই একজন অসাধারণ। ফল দেবে প্রচুর। সসে ভেজানো দু এক টুকরো মাছও দিতে পার। মাংস নয়। তার কোন কথায় বা কাজে প্রশ্ন করবে না। ঠিক আছে?

আচ্ছা স্যার। কুরোশুয়োর এমন কথায় সুকি একটু ভয় পেয়েছিল। কে আছে সাত সাত সাত ঘরে। ও ঘরে সুকি কখনো আগে কাউকে খাবার দিতে বা আপ্যায়ন করতে যায়নি। সাত তলার ঘর। ঈশ্বরের বাগানের ধারে।

সুকি লাল তরমুজ, লাল ডালিম, ডুমুর, আর কিছু কালো আঙুর প্লেটে সাজিয়ে নেয়। যেন খাবার নয় জাপানি আর্ট। তার সঙ্গে নিয়েছিল সসে ভেজানো মাছ। স্পেশাল গ্রিন টি। সেখানে রাখলো যুগলবন্দি ওয়েস্টেরিয়া ফুল। আজ ওর পঁচিশতম জন্মদিন। আজ সে একা। সুকির এই জীবনে দু একজন ভাব জমাতে এসেছিল। আসাই স্বাভাবিক। সুকির কাউকে মনের মত মনে হযনি। কেউ সহজেই শরীর অধিকার করতে চায়, কেউ কথা বলে বিশ্রি করে। যখন বৃষ্টি পড়ে তখনো। আবার একটা ভালোলাগা বসন্তের বিকেল বিশ্রি ভাষায় ঝগড়া শুরু করে না হলে তর্ক। কেউ কেবল খাবার ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে ভালো করে কথা বলতে জানে না। কেউ অপরুপ প্রকৃতির বাগানে প্রথমেই সুকির তনে হাত রাখতে চায়। তারপর বিশ্রি করে হাসে। কেউ এমন করে চুমু খাবার জন্য উদগ্রিব যেন চুমু নয় আগুনের তাপে গিলে খাবে সুকির সবকিছু। কেউ কোমল নয়, শান্ত নয়, সুশীল নয়। হোটেলে কাজ করে বলে ধরে নেয় এসবে সুকির রুচি আছে। জোর করে কারো মনের মত হতে হবে এটা সুকি বিশ্বাস করে না। এই হোটেলে যারা থাকতে আসে তাদের ধারণা সুকিকে ডাকলেই তার সঙ্গে বেডকভারের তলায় রাত কাটবে সুকি।

কিন্তু কুরোশুয়ো হোটেলে থাকতে আসা কামাতুরদের জন্য যেসব শরীর বরাদ্দ করেছেন সেখানে হোটেলে যারা কাজ করে তাদের নাম নেই। দরকার মত ট্রেতে করে সেগুলো পাঠানো হয, প্রয়োজনমত মেয়েরা আসে। হোটেলে যারা কাজ করে তাদের ক্যারেকটর ও কনডাক্ট হতে হবে শানিত এবং উন্নত। কর্মচারিদের ‘কোড অব কনডাক্টের’ উপর জোর দেন তিনি । ‘নো হাংকি পাংকি।

সাত সাত সাত ঘরের দরজা খোলা ছিল। হয়তো সেই অসাধারণ মানুষের এখন খাবার সময়। জানালায় মুখ করে পিঠ রেখেছেন দরজার দিকে। লোকটা খুব বেশি লম্বা নয়। টেনে টুনে পাঁচ ফুট তিন। পাতলা শরীর। মাথায় তেমন চুল নেই। ঘরে ঢুকতে গিয়ে সুকি একটু চমকে যায়। জানালা উঁচু। সেই উঁচু জানালা দিয়ে তিনি বাইরে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু তার পা দুটো কোন কিছুর উপর দাঁড়িয়ে নেই। যেন শূন্যে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। মুহূর্ত! সুকি ঘটনাটি দেখেছিল মুহূর্তের জন্য। এবার ফট করে পিছু ফিরে সুকির মুখের দিকে তাকান। সুকিও খুব নরম করে হেসে খাবারের ট্রেটা ঘরের মাঝখানের টেবিলে রাখে। তিনি হাসিমুখে সুকির পাশে এসে দাঁড়ান। বলেন – হ্যালো তরুনি কি নাম তোমার?

সুকি তার নাম বলে। তিনি শুন্যে আঙুল দিয়ে নামটা লেখেন। বলেন – সুকি ইয়াৎ সান। এটা পুরো নাম হলে হবে –
এটাই আমার পুরো নাম। বলে সুকি।
তারপর যদি একটা ওয়াকার হয় তাহলে?
তিনি মজা করছেন। সুকি বলে – ওয়াকার বলে আমি কাউকে চিনি না স্যার। তিনি বলেন – আমিও না। তারপর ট্রের একপাশ থেকে তুলে ওয়েস্টেরিয়ার ছোট ফুলদানি টেবিলের মাঝখানে রাখেন। বলেন -ওয়েস্টেরিয়া/ নীল পাতার ঘ্রান/ স্মৃতি অম্লান। তারপর বলেন – এখন হাইকু থাক।
আপনি হাইকু লেখেন?
ওতো সকলেই লেখে। কেবল কলাপাতার ঝোপে বসবাস করা বাশো নয়। বা মাশওয়াকা শিকি নামের ভবঘুরে নয়। তোমার দেখার চোখ থাকলেই হাইকু লিখতে পারবে। পাতা আর ফুল, আলো আর রোদ। কত সব হাইকু কত সব সেনরিয়ু সেখানে মেয়ে। তানাকাও বানাতে পারো। না হলে একশো পংক্তির রেংগা। সুকি বলে – আমি কি চা ঢেলে দেব?
দাও। নরম, ফুলের কুঁড়ির মত আঙুলে চা ঢালে সুকি। আঙুল ধরে আছে চাযের পট। কিছু কুচো চুল উড়ে এসে পড়েছে কপালে। তিনি ছোট ফুলদানি থেকে একটা ওয়েস্টেরিয়া তুলে নিয়ে মনে হয় তার কপাল থেকে কি যেন মুছে দিলেন। সুকি দেখতে পায় না জিনিসটা কি। অসাধারণ এই প্রাচীন মানুষের কোন কাজ নিয়ে প্রশ্ন করবে না এমনই নির্দেশ ছিল। কপালে তখনো লেগে আছে ওয়েস্টেরিযার স্পর্শ। তিনি বলেন – কপালটা একটু গুছিয়ে দিলাম। বেশ কপাল তোমার। কেবল । একটু থামেন। তারপর বলেন ইংরাজিতে -আই টাইডিআপ ইয়োর ফরহেড।
আজ সুকির পঁচিশতম জন্মদিন। একটা অসাধারণ মানুষ তার কপাল স্পর্শ করেছে। ছল ছল সুকি। চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠেছে। কোমল ভারী গলায় বলে কেবল – কি ভাগ্য বলুনতো। আজ আমার জন্মদিন। আপনার মত একজন আমার কপাল স্পর্শ করেছে।
আজ কি তোমার পঁচিশ বছর হলো?
সুকি মাথা নাড়ে। তিনি একটা চেযারে বসে চা সিপ করছেন। সুকির মনে হলো খুব স্বচ্ছ ফুলদানির কাচের মত তার গলা। চা যখন গলা দিয়ে নিচে নামে সে দৃশ্যও চোখে পড়ে। সুকি চোখ মোছে। এ হয়তো ভেজা চোখের ভুল।
জন্মদিনে কাজে এসেছো? জন্মদিন পালন করবে না?
– না স্যার। আমার এমন কেউ নেই জন্মদিন নিয়ে ভাবে। মা, বাবা, ভাইবোন, চাচা, মামা, কেউ না। তিনি চায়ের কাপটা টেবিলে রাখেন। বলেন হাত পাতো। প্রার্থনার মত করে দুহাত এক সঙ্গে রাখো। একটা উইশ কর। একটার বেশি নয়। যা তুমি পেতে চাও তারই একটা উইশ। একটার বেশি নয় কেমন। চোখ বন্ধ কর। মনে মনে একটা উইশ ভাবো। দুটো নয়। খানিক পর বলে সুকি – আমি ভেবেছি আমি কি চাই। চোখ খুলবো?

বিশ পর্যšত মনে মনে গোন তারপর চোখ খোল। যখন চোখ খোলে জানালা থেকে এক বাতি আলো এসে ঘরে খেলা করছে। ওয়েস্টেরিযার ফুলদানি সোনালি হয়ে আছে। তিনি তখন সেখানে নেই। বোধহয় বাথরুমের ভেতর থেকে শব্দটা পেয়েছিল সুকি। -এখন যাও। শুভ জন্মদিন।
সুকি সেই আলো ভরা সাত সাত সাত ঘরের ভেতর দিয়ে যখন হাঁটছিল মনে হয়েছে ও শুন্যের উপর দিয়ে হাঁটছে। ওর পা মেঝে স্পর্শ করছে না। কপালের যে জায়গাটা গুছিয়ে দিয়েছেন তা কেমল আর নরম এখন।
যেন কপালের কয়েকটা রেখার রকমফের করেছেন। একটা অপার্থিব অনুভব মুহূর্তের জন্য। ঘর থেকে বেরুতেই আজকের জগতের মুখোমুখি। একটা দীর্ঘ করিডোর। যেখানে নানা ঘরের চাদর বেডকভার স্তুপ করা। কাপড় টানার ট্রলিটা এক পাশে। যে কোন মুহূর্তে এসে পড়বে ক্লিনার। করিডোরে বাতি জ্বলছে। সূর্য এখানে নেই। সাত তালার বিশেষ কয়েকটি ঘর। সবচাইতে বিশেষ সাত সাত সাত। কিয়োটো শহরটাও আছে আগের মত। পুরো ঘটনা কল্পনা মনে হয়েছে ওর। লাউঞ্জে একটা ওয়েস্টেরিয়ার ছবি বাঁধানো। যেখানে একটা পাপড়ি নেই।

পুরো গল্প শুনে আফতাব সাহেব তাকিয়ে থাকেন সুকির মুখের দিকে। সুকি তখন নরম দীর্ঘ ফুলের কুঁড়ির মত আঙুলে চা ঢালছে। মুখ নিচু করে কি যেন ভাবতে ভাবতে বলে – সেই বছরই সাত সাত সাত ঘরে এসেছিলেন মিস্টার ওয়াকার। মিস্টার ওয়াকার একজন বড় গাড়ির ব্যবসায়ী। ইয়টও বিক্রি করেন। রবিন ওয়াকার। নামের পরে কখনো তিনি ফোর্ড লেখেন না। আফতাব সাহেবের চা পান শেষ। সুকি একটা নোট খাতা বের করে বলে আপনি আমার জন্য একটা কিছু লিখুন।
আমি? আফতাব সাহের অবাক হয়ে বলেন – আমি কি লিখবো?
লিখুন যা মনে হয়।
কেন?
আপনি সাত সাত সাত ঘরে থাকেন। আর আজ আমার চৌত্রিশতম জন্মদিন। আফতাব সাহেব একটু ভাবেন। তারপর কলমে লেখেন – সুকি তুমি যাদের প্রতিক্ষা করছো যে কোন মুহূর্তে –
তাঁর লেখা শেষ হয় না। লাউঞ্জের দরজা ঠেলে প্রথমে প্রবেশ করে এক জোড়া সাত বছরের মেয়ে। দুজনেই জাপানের ডলের মত অপরুপ। সুকি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর আসে চার বছরের এক জোড়া ছেলে। আমেরিকার শিশুদের মত স্মার্ট। সুকির মুখটা আলোয় উদ্ভাসিত। আর ওদের পেছনে একজন মানুষ। লোকটা জাপানি নয়, আমেরিকান। এক জোড়া জমজ। সাত আর চার। পেছনে গির্জার ¯ম্ভভের মত একজন আসছে। বলিষ্ঠ, সহাস্য, সমৃদ্ধ।
মনে হয় আফতাব সাহেবের কথা বেমালুম ভুলে গেছে সুকি। সে উড়ে উড়ে ছুটে চলেছে তার পরিবারের জগতে। কি সব বলতে বলতে প্রজাপতির মত ভাসছে সুকি। ওরাও কিচ কিচ করে ওঠে। পেছনের মানুষটা ভরাট গলায় বলেন -সরি সুকি একটু লেট হলো। একটু তাড়াতাড়ি গেলে কিচ্ছু মিস হবে না। পার্টির আযোজন খুব ভালোমত হয়েছে। রেনবো দ্বীপে যেত ঘন্টাখানেক লাগবে।
রেনবো দ্বীপ? সুকি অবাক হয়ে তাকায়। আমাকে কিছু বলনিতো?
সারপ্রাইজ সুকি।
ইউ আর ফুল অফ সারপ্রাইজেস ওয়াকার।
আর কিচ কিচ পাখিরা জাপানি ভাষায় যা বলছে তার সবটুকু না বুঝতে পারলেও মা শব্দটা বুঝতে অসুবিধা হলো না আফতাব সাহেবের। পৃথিবীর সব দেশেই শব্দটা এক। একজোড়া নয় দুই জোড়া সšতান আর একজন আলোর বাতির মত মানুষ। পাখির ডিমের মত বড় হিরে। দামি গাড়ি। সারপ্রাইজ পার্টি। সমৃদ্ধি, সুখ, নিরাপত্তা। সেই একটি প্রার্থনা কি ছিল আফতাব সাহেব বুঝতে পারেন না। একটি প্রার্থনায় এত কিছু? টেন ইন ওয়ান? সুকি কি চেয়েছিল?
আর সুকি যখন হেটে গেল তার পা দুটো মুহূর্তের জন্য হলেও মেঝে স্পর্শ করেনি।
এখন আফতাব সাহেবের মনের ভেতর প্রমি আর মিমি নামের এক জোড়া নাম পিংপং বলের মত খেলা করছে। না হলে সুকি আর সাচি। না হলে মিচিকো আর কারিকো। যাদের মুখ তার দশ বছরের বিবাহিত স্ত্রী প্রমার মুখের মত অপরূপ গোলালো। কাল রাতের স্বপ্ন। দুটো পাখি। আ দুটো পাখি। তিনি শান্ত হয়ে বসে আছেন। কি নামে ডাকবো তোমাদের বল। কাকে বলছেন নি? বাতাসকে? নিজেকে? তিনি বুঝতে পারেন তার পা দুটো শূন্য থেকে একটু উপরে উঠেছে। আর তার মনটা বেলুনের মত চাঁদ হয়ে একটা ভালো লাগা অনুভূতির আকাশে ঝুলে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop