স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর

Share Button

73272dbac01f3dc7af9c028aa311a08b

খালেদ উদ-দীন

স্বাধীন বাংলাদেশ সমগ্র দেশবাসীর বহুকাল লালিত মুক্তি ও সংগ্রামের অঙ্গিকারে ভাস্বর। এ দিন আমাদের আত্মপরিচয়ের গৌরবে উজ্জ্বল, ত্যাগে ও বেদনায় মহীয়ান। এক গৌরবময় সংগ্রামের ধারায় নিপীড়িত বঞ্চিত সাধারণ মানুষের শোষণ মুক্তির স্বপ্ন সাধ এই দিনে অর্জন করেছিল নতুন দিক নির্দেশনা। তা ভাস্বর হয়ে আছে দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের সুমহান ঐতিহ্য হয়ে।
সভ্যতার ক্রমবির্বতনে মানবের যে রথযাত্রা, সেখানে মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে শিখেছে স্বাধীনতার বোধকে। আড়াই তিন হাজার বছরের বাঙালি জাতিসত্তার যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসের এক মহান অধ্যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত এই ব-দ্বীপ সর্বপ্রথম এই মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাঙালির পূর্ণ শাসনক্ষমতার মধ্যে আসে। ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা সুজলা সুফলা এই বাংলার সবুজ মাটি স্বাধীন হয় রক্তাক্ষরের বর্ণমালায়। আমরা পাই স্বাধীন-সার্বভৌম এক দেশ। বিশ্ব সভ্যতায় নিজেদেরকে স্বাক্ষরিত করতে পারি আপন স্বাতন্ত্রে।
মৌর্য-পাল-সেন-মোঘল পাঠান শাসনামলে বাংলা শাসিত হয়েছে বহিরাগতদের দ্বারা। বাংলা কখনও বাঙালির শাসন ক্ষমতায় আসেনি। এই ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় বিংশ শতাব্দিতেও। বিংশ শতাব্দীতে যখন ব্রিটিশরাজ ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা দান করে তখন ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম হয়। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ট। তাই পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হলেও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের আদর্শগত কোন যোগসূত্র ছিল না। এর কারণ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের জাতি ও ভাষাগত বিরোধ। এ কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানের মৌলিক আর্দশের সাথে কোনদিন একাত্মতা অনুভব করতে পারেনি। পাকিস্তানের নব্য উপনিবেশবাদী,ক্ষমতালিপ্সু, উদ্ধত শাসকরা শুরু থেকেই এদেশের মানুষের উপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাতে থাকেন পশ্চিম পাকিস্থানিদের উন্নাসিক মানসিকতা,শাসন,শোসন,বঞ্চনা-অবহেলা এদেশের আপামর জনসাধারনকে আশাহত করে। তারা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়ে। এই প্রতিবাদ প্রতিরোধের,নায্য দাবি আদায়ের অধিকার আমাদের স্বাধীন ভূমির অধিকারকেই উৎসাহিত করে।
বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা পাকিস্তান রাষ্ট্রজন্ম হওয়ার এক বছরের মধ্যেই শুরু হয়। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ও ২৪ মার্চ দুটি জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দেন। এদেশের মানুষ এর বিরোধিতা করে। এই আন্দোলনের ক্রমযাত্রায় ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-জনতা মিছিল করে। পুলিশের গুলিতে নিহত হয় সালাম, রফিক, বরকত, শফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। বাঙালির অধিকারের বীজ এই আন্দোলনেই উপ্ত হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি এবং যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব বিজয় লাভ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির ক্ষমতার ভিতকে নড়বড়ে করে দেয়। ১৯৬৫ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের নামে আইয়ুব খান এক প্রসহসনের নির্বাচন দিয়ে এদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে নেয়। তখন থেকেই স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষে ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি ও উত্থাপিত হয়। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে আটক করা হয়। কিন্তু গণ আন্দোলনের মুখে তাকে আটকে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের জোয়ার উঠে। আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান ইয়াহিয়াখানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্যে ১৯৭০ সালে নির্বাচন দেন। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করে না। বাঙালিরাও তখন স্বাধীকারের জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠে। এমন এক প্রেক্ষিতে ছাত্র জনতার দাবির সাথে একাত্ম হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে জাতিকে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানান। সারা বাংলায় শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। বাংলা স্বায়ত্তশাসিত হবে না সার্বভৌমত্ব লাভ করবে এই নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক হয়। এ সময় ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোপনে সৈন্য অস্ত্রশস্ত্র এনে শক্তি বৃদ্ধি করে। ২৫ মার্চ রাত্রে শেখ মুজিবকে বন্দী করা হয়। ২৫ মার্চের রাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চলে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়। ২৭ মার্চ বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কালুরঘাট থেকে ‘মহান নেতা ও বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ হতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং মুক্তিসংগ্রামে ডাক দেন।
আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের এবার পয়তাল্লিশতম বছর। বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন, দেশবাসীর আত্মত্যাগের ফলেই আজ আমাদের এই স্বাধীনতা। এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ সুখি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ গুটি কয়েক মানুষের আরাম আয়েশের জন্য দেশের সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাংলার দুঃখী মানুষের ভাগ্য রয়েছে অপরিবর্তনীয়। সম্প্রতি আমাদের জাতীয় জীবনে নানা কারণে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলতা থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কলে- কারখানায়,অফিস-আদালতে,স্কুল-কলেজে,খেলার মাঠে,ঘরে বাইরে সর্বত্রই শৃঙ্খলার অভাব প্রকট। অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে স্বার্থন্বেষী মানুষ মাত্রই মেতে উঠেছে ক্ষমতাধর হওয়ার প্রতিযোগীতায়। কল্যাণমুখী রাজনীতি হয়ে পড়েছে কলুষিত। সমাজ জীবনের রন্ধে রন্ধ্র্রে দুর্নীতির থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। তার ফল হয়েছে ভয়াবহ। শিক্ষার ক্ষেত্রে,সমাজ জীবনের অলিতে গলিতে উচ্ছৃঙ্খলতার ভয়াবহ কলঙ্ক-স্বাক্ষর। সামান্য কারণেই চলে ভাংচুড়। চলে রাহাজানি,সন্ত্রাস। স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি এই স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বাধীনতার পর থেকেই প্রত্যেক রাজনৈতিক দল উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমাদের কাঙ্খিত উন্নয়ন আজও অধরা। নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ক্ষমতা বদলের সময় একটা নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরী করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ফলে বিদেশি-বিনিয়োগ বারবার বাধাগ্রস্থ হয়। গেল দুই বছরের রাজনৈতিক উত্তাপ এগিয়ে যাওয়া একটি জাতির জন্য বড় হোঁচট। যতদ্রুত আমরা একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী করতে পারব ততই মঙ্গল।
আশার কথা এই যে ব্যক্তি পর্যায়ে নানা উন্নয়ন কর্মকান্ড,ব্যপক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশির নিত্য বিনিযোগ বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার সহনীয়তার মূল কারণ। অনেকেই মনে করেন একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ এবং আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে রাখরে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই এগিয়ে যাবে। স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পর আমাদের বর্তমান এই যে অবস্থা কখনোই কাম্য ছিল না। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক একটা দেশ কখনো পিছিয়ে থাকতে পারে না। আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে এখন কেবল সমানে এগিয়ে যাবার পালা।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক।

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop