অর্থ খোঁয়া: রাষ্ট্র এবং ‘বলির পাঠা’

Share Button

cartoon

ফারুক যোশী : বাংলাদেশ ব্যাংকের  ৮০০ কোটি টাকা খোঁয়া গেছে কিংবা হ্যাকিং হয়ে গেছে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কথা শোনবার অপেক্ষায় ছিলো সারা দেশবাসী। কিন্তু এখনও অস্পষ্টই থেকে গেছে সব। বলতে গেলে এখনও দেশের মানুষ অন্ধকারে।  ৮ বিলিয়ন থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ নিয়ে এসেছেন বলে দাবী করেছেন পদত্যাগি গভর্ণর, যদিও অর্থমন্ত্রী মোটা দাগেই বলেছেন, মূলত প্রবাসীদের অর্থেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ফুলে-ফেফে উঠেছে। আপাতদৃষ্ঠিতে আমরা ধরে নিতে পারি, সাবেক গভর্নরের এ দাবী তার সার্থকতা। সার্থকতা সাফাই তিনি গাইলেও পাহাড়সম ব্যর্থতা নিয়েই তাকে বিদায় নিতে হলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। বলা হচ্ছে হ্যাকিং হয়ে গেছে তথ্য। আর এই তথ্য পাচারেই এই শত শত কোটি টাকা হারিয়ে যাওয়া।  বর্তমান পৃথিবীর প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতিতে হ্যাকিং যে একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে, তা কোন রাখ-ঢাকের ব্যাপার নয়,। এটাই চরম সত্য, এবং এটা ঘঠছে সারা বিশ্বময়। সেজন্যেই হ্যাকিং রোধে সকল প্রতিষ্টানগুলোরই শাখা-প্রশাখা থাকে। তারপরও পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানীগুলোর তথ্য হ্যাকিং হবার খবর পড়ি আমরা কদাচিৎ।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে হ্যাকিং যে পজেটিভ ইমপেক্টও সৃষ্টি করছে , তা-ও বলা যায়। উইকিলিকস তার একটা বড় উদাহরন বৈ-কি। কিন্তু তারপরও এটা অপরাধ। সুতরাং হ্যাকিং রোধে একটা বিরাট পদ্ধতিগত দেয়াল সৃষ্ঠি করতে হয়, প্রযুক্তির সাথে ন্যূনতমও যারা কাজ করেন সে কথাটি তারা জানেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সে দেয়াল সৃষ্ঠি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে ব্যর্থতার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নিতে হবে। আপাতদৃষ্ঠিতে মনে হচ্ছে সে দায় নিয়েছেন ডঃ আতিউর রহমান। ব্যর্থতার দায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন, এটাই সবার কাছে একটা উদাহরণ। আতিউর রহমান তার সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও না-কি বলেছেন, এরকম উদারতার নজির বাংলাদেশে বিরল। কিন্তু এই বিরল উদাহরণের পর অর্থাৎ তাঁর পদত্যাগের পরও এর রেশ কাটবে না। কাটছেও না। অনেকেই বলেছেন আতিউরকে বলির পাঠা বানানো হয়েছে। ‘বলির পাঠা’ বানানো হয়েছে বলে কিসের ইঙ্গিত করা হচ্ছে ? বলির পাঠা বলে মূলত তার ব্যর্থতাকেও এখানে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হচ্ছে যে, এই অর্থ সরানোকে শুধু শুধু হ্যাকিং শব্দ দিয়ে সিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ ভেতরের ব্যাপার অন্যকিছু। অর্থমন্ত্রী নিজে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অথর্ব। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অথর্ব আখ্যায়িত করেতো অর্থমন্ত্রী নিজেরও  সমালোচনা করলেন। বলতে গেলে নিজের অপরাগতা এবং অসহায়ত্বকেই তোলে ধরলেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকা খোয়া গেছে। এতে যতটুকু তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার চেয়ে বেশী মনে হয়েছে এই টাকা খোয়া নিয়ে তিনি ছিলেন এক অস্বস্থিকর অবস্থায়। কারন এই বিরাট অংকের অর্থ উধাও হয়ে গেলো  অথচ তিনি যেন সাঁতার কেটেছেন ঘোলা পানির মাঝে, প্রায় মাস দিন তিনি কিছুই জানলেন না। সুতরাং উদ্বেগের সাথে অস্বস্থিতে থাকাটাও অযৌক্তিক কিছু নয়।  আতিউর রহমান তার একটা বিদায়ী ছাড়পত্র দিয়ে দায় ছেড়েছেন কিন্তু একটা পাহাড়সম দায় চাপিয়ে দিয়ে গেছেন অর্থ মন্ত্রনালয় তথা সারা বাংলাদেশের উপর। অর্থমন্ত্রী যাকে নিয়োগ দিয়েছেন (হয়ত প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুসারে), যে মন্ত্রনালয় তারই নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, তাকে অন্ধকারে রেখে দেশের আটশত কোটি টাকা উবে গেলো এবং আরও কয়েক হাজার কোটি হারিয়ে যাবার পথে ছিলো, অথচ অর্থমন্ত্রীকে এসব না জানিয়ে চলল অর্থ ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। সে কি কোনো যুক্তির মাঝে পড়ে ? পৃথিবীর যে কোন দেশ যে কোন রকেমের বিপাক-বিপত্তিতে পড়তে পারে। ব্রিটেনেও দেখেছি, যে কোন রকমের রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী অবগত হন, ঠিকই রাষ্ট্রীয় দুর্বিপাকে প্রধানমন্ত্রী এমনকি বিদেশের নির্ধারিত মিটিং ফেলে তার দেশ রক্ষার প্রয়োজনে ফিরে আসেন। রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ঠেকাতে ঘোষনা দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন মানুষদের নিয়ে ‘কোবরা’ নামক বিশেষ সভা করে রাষ্ট্রের নিতী-নির্ধারনী প্রেস ব্রিফিং করে জনসাধারনকে আস্বস্থ করেন। অথচ এত বড় ব্যাংক  ডাকাতির পর তাৎক্ষনিকভাবে অর্থমন্ত্রী জানলেন না, এটা কি গ্রহনযোগ্য হতে পারে। রাষ্ট্রীয় কোন বিশেষ সভা  না করে সারা দেশকে একরকম অন্ধকারে রেখে আবেগ দিয়ে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করে ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করলেন, তা-তো হতে পারে না। আবেগ দিয়ে কাব্য সাধনা করা যায়, কান্নার কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর অনেক কাছের লোক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, কিংবা দেশের তথা সরকারের সহানুভ’তি পাওয়ার চেষ্টা চলতে পারে, কিন্তু অনাচার বিপর্যয় রোধ করতে হলে যে কমিটমেন্ট লাগে, সেই কমিন্টমেন্ট কিংবা  দৃঢ়চিত্তের উদাহরন কি তিনি দেখাতে পেরেছেন ?। ডঃ আতিউর রহমান সে কমিন্টমেন্ট দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।  তিনি তার ইগো‘র কারনেই হোক কিংবা মন্ত্রনালয়ের সাথে তার সমন্বয়হীনতার কারনেই হোক তিনি নিদারুনভাবে ব্যর্থ হয়েছেন অর্থ পাহারা দিতে। শুধু তাই না, তার যাবার সময়ে তার নিয়োগদাতার সাথে এমনকি পেশাদারিত্ব দেখাতেও ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থমন্ত্রী দেশে থাকাকালীন সময়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র না দিয়ে শুধু যে অর্থমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে যে অপমান করেছেন, তা নয়, বলতে গেলে গোটা সিস্টেমের সাথেই একধরনের একগুয়েমী করেছেন।

২) ড: আতিউর রহমান তার পদত্যাগের পর সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্যি দিয়ে অবশ্য বুঝাতে পেরেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কি গভীর আস্থা নিয়েই কাজ করেছেন তিনি। আর সেজন্যেই তিনি তার মন্ত্রণালয়কে পাশ কেটে পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছেই দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন হওয়া একটা বিরাট সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর স্নেহ কিংবা আস্থা অনেক সময় বিশ্বস্থ ঐ মানুষটাকে বেপরোয়া করে তোলে। কারন দেশের সর্বোচ্চ মানুষ যখন কাউকে বিশ্বাস করে কিংবা নির্ভর করে , তখন ঐ মানুষটা আর সাধারন হিসেবে থাকেন না। হয়ত সে কারনেই এরা অনেক সময ভুলে যান, সবকিছুর উর্ধ্বে যে রাষ্ট্র আছে। প্রধানমন্ত্রীকে খুশী করা মানে রাষ্ট্রের কল্যাণ করা। কিন্তু রাষ্ট্রের অকল্যান সাধন করলে প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীকেই হেয় করা হয়। আর সেজন্যেই হয়ত প্রধানমন্ত্রী কেঁদেছেন,যখন তিনি দেখেছেন তার আস্থার মানুষটিই তাকে কিংবা তার সরকারকে বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদিও আতিউর রহমান এটাকে তার ‘কৃতিত্ব’ হিসেবেই দেখাতে চেয়েছেন। রাষ্ট্রের ৮০০ কোটি টাকা খোয়ার ঘঠনা কোন দেশের প্রধানমন্ত্রীই সুখের ব্যাপার হিসেবে দেখবেন না, এটাইতো স্বাভাবিক। তিনি এটাকে রাষ্ট্রিয় সম্পদ ভাবছেন, কাব্য দিয়ে বিবেচনা করেন নি সেজন্যেই কেঁদেছেন। তবে অতিরীক্ত আস্থাবানরা যে ক্ষমতার দাপট দেখান, তা এর আগে আমরা দেখেছি। হাল আমলের একজন বিদায়ী শিক্ষা সচিবেরও দাপটের কাছে মন্ত্রনালয় ছিলো একরকমের জিম্মি। সেকারনেই অনেক কষ্ঠে-সৃষ্টে তাকে বিদায় দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয় হাফ ছেড়ে বেচেছে । শুধু তা না, এখানেও দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর সাথে জীবনে দেখা হয়েছে কি-না সন্দেহ,তবুও দেখি কেউ কেউ বয়ে বেড়ায় আপা আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন।

৩) দিন অনেকটা চলে গেছে, কিন্তু আজও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোন কিছু বলা হচ্ছে না। যদিও অর্থমন্ত্রী মিডিয়ায় বিশেষ করে প্রথম আলোতে  তার একটা সাক্ষাৎকার দিয়ে কিছুটা হলেও তার ক্ষোভ কিংবা দায়মুক্তির চেষ্টা করেছেন, কিন্তু চাপ যে কত মারাত্বক হতে পারে আমরা দেখেছি পরের দিন তার একটা বিৃবতির মধ্যে। তিনি বলেছেন তার সাক্ষাৎকার টুইস্ট করা হয়েছে। এবং সেজন্যে প্রথম আলোকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। কিন্তু প্রথম আলোর যে বিপর্যয় চলছে এখন, তারপর কি আমরা মনে করতে পারি প্রথম আলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তথ্য বিভ্রাট ঘঠাবে। এখন প্রশ্ন হলো আসলেই কি অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন কর্নার থেকে একাকী হয়ে যাচ্ছেন। ৮০০ কোটি টাকা কোথায় গেলো – ব্যাংকের কর্মকর্তা কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে কে কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের রাগব-বোয়াল কে জড়িত হতে পারে তা না করে অর্থমন্ত্রীকে সমন্বয়হীন এক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্টা করার চেষ্টা চলছে এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টর থেকে। মুল ইস্যুকে বাদ দিয়ে এমনকি অহেতুক বিএনপিকে টেনে আনা হচ্ছে ঐ ৮ শত কোটি টাকার ঘঠনায়। তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার কিংবা অন্যান্য প্রচার-প্রচারনা আছে। কিন্তু একজন সাবেক মন্ত্রী আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ন মানুষ যখন বলেন এর সাথে তারেক জিয়া জড়িত থাকতে পারেন, তখন জনগণ মনে করতেই পারে যে মুল ঘঠনাকে রাজনৈতিক রং দিয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে । তাছাড়া প্রযুক্তিবিদ জোহার গুম কিংবা গ্রেফতার বিষয়টাও ভাবিয়ে তোলেছে জনগণকে। জোহাকে গ্রেফতার করা হলে তার ব্যাখ্যা পাওয়ারও অধিকার রাখে জনগণ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক কাউকে কিংবা কোন প্রতিষ্টানকে বাঁচানোর একটা পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে কি না। জোহার গুম কিংবা গ্রেফতার অথবা সাবেক মন্ত্রীর এরকম কথা রাজনৈতিক গসিপ আরও বৃদ্ধি করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। কারন এর আগে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তসরুপ হয়েছে। কিন্তু কি এক অদৃশ্য হাতের আঙ্গুলে শেষপর্যন্ত সবকিছুই ভেস্তে গেছে। আমরা বিএনপি‘র সময়কার কথা উল্লেখ করলে যেমন খাম্বা কিংবা হাওয়া ভবন প্রভৃতির কথা উল্লেখ করে থাকি, আজকের সময়ে এরকম কি কোন ‘পীর’ কিংবা ‘ধুমকেতু’র দেখা পাচ্ছে দেশ ? একটা আবহ আছে চারদিকে সে আবহ ভেসে বেড়াচ্ছে দেশ থেকে বিদেশে। সেজন্যে হলমার্কের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়, শেয়ার মার্কেটে ধ্বস নেমে মিলিয়নারদের সংখ্যা বাড়ে বাংলাদেশে, এবং একসময় আমাদের গা-সওয়া হয়ে যায় সব কিছু।

ডঃ আতিউর রহমানকে বলির পাঠা বলছেন কেউ কেউ। অনেকেই অর্থমন্ত্রীরও পদত্যাগ চাইছেন এখন। সেটা কতটুকু যৌক্তিক ভেবে দেখতে হবে। কারণ অর্থ খোয়ার ঘটনা যদি আমাদের চিন্তার চেয়েও ব্যাপক হয়, এর গভীরে যদি আরও লুকিয়ে থাকে কিছু, তাহলে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যি দিয়ে আরেকটা ‘পাঠা বলি’র দিকেই তো এগিয়ে যাবে দেশ ।

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop