কুয়াশার জাল

Share Button

prot

ময়নূর রহমান বাবুল

ফিলাডেলফিয়া থেকে প্রায় দু’হাজার মাইল দূরে পাহাড়ি কলোরাডো’র নিজের বাসার ব্যলকোনিতে বসে চল্লিশ বছর আগের এক বেদনাময় স্মৃতির কথা এতক্ষন তন্ময় হয়ে ভাবছিলেন পূরবী দত্ত। পাশে ট্রিপয়ের পীঠের উপর একটা ছোট্র সিডি প্লেয়ারে সেই কবে থেকেই বেজে চলেছে সাগরসেনের দরাজ গলায় একটার পর আরেকটা রবীন্দ্রসংগীত। ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার…’ তারপর ‘দিবসরজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি…’ ইত্যাদি। পূরবীর ভাবনা আর সাগর সেনের বিরামহীন গাওয়া শীতপ্রধান দেশের মধ্যআগষ্টের এই উষ্ণ গ্রীষ্মের দুপুরকে আরো যেন উষ্ণ মাদকতাময় করে তুলছে। ভাবের সাগরে স্মৃতির ঘামে পুরোটাই ডুবে যান পূরবী।

চল্লিশ বছর আগের গভীর বেদনাময় এক স্মৃতি। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে কতো সময়, আরো কতো বিষয়। জীবনের অভিজ্ঞতার কাপড়ে তালি লাগতে লাগতে গত চল্লিশ বছরে অভিজ্ঞতার কাঁথায় রূপান্তরিত হয়েছে। ধলেশ্বরী মিসিসিপিতে গড়িয়েছে কতো জল। ফেলেআসা ধলেশ্বরী পাড়ের মুন্সীগঞ্জ থেকে শুরু করে মাঝখানে আরো কতো জায়গা, পাহাড়, টিলা, সাগর, শহর বন্দর পেরিয়ে মিসিসিপির এই কিনারা। এরই মধ্যে কতো সাদা কালো বাদামী মানুষ আর লোকালয় গঞ্জের স্মৃতির স্থূপ আর ঢেউ ডিঙিয়ে আসা। যার অনেক কিছুই আজ আর মনে নেই। স্মৃতিতে সুবিন্যাস্থ, স্থূপাকার পড়ে নেই। ঝাপসা আলো আবছায় যা কিছু আছে তার মধ্যে সুস্পষ্ট শুধু সেই চল্লিশ বছর আগের অষ্টাদশী পুরবী, যে কিশোরী বয়সে জ্যোতিপ্রকাশ বসু নামের এক লেখকের একখানা গল্পের বই পড়ে তাকে ভালবেসে ফেলে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালিন সময়ে সেই লেখকের সাথে সাক্ষাৎ দেখা হলে, নিজের পরিবারের বয়:কনিষ্ঠ সন্তান হয়েও বড় এক ভাই আর এক বোনকে রেখে নিজে তাদের আগেই বিয়ে করে বসে জ্যোতি বাবুকে।

মাধ্যমিক শিক্ষা মুন্সীগঞ্জ শহরে। মফস্বল শহর মুন্সীগঞ্জ। চারদিকে নদী বেষ্টিত, বিচ্ছিন্ন একাকী এক দ্বীপের মতো। অবশ্য ছিমছাম ছোট্র একটি শহর। এক রাস্তার এই শহরের প্রধান পাকা রাস্তাটি শুরু হয়েছিল নদীর ধারে গুদারা ঘাট থেকে। চলে গিয়েছিল শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। এই রাস্তার দু’ধারেই সারি সারি দোকান পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস আদালত। এ রাস্তার ধার ঘেঁষেই মাধ্যমিক স্কুল আর কলেজও। এটুকুই ব্যস ! মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক শেষে তার চেয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কেউ প্রস্তুত থাকলে যেতে হতো রাজধানী শহরে।

রাস্তার দু’পাশে ভিতরে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট আবাসিক এলাকা। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। বসুপাড়া, জমিদার পাড়া, পাঠপাড়া, শ্রীপল্লী, দত্তপাড়া, লক্ষী-নারায়ন পাড়া, বাগমাদুলালী, সরকারপাড়া, কুরুয়া, কাবাড়িপাড়া, খালপার ইত্যাদি।

পূরবীদের পরিবার যখন দত্তপাড়ায় বাস করেন, সে সময়ে মুন্সীগঞ্জ শহরে কোন গাড়ি বা যন্ত্র চালিত ইঞ্জিন চালিত যানবাহন ছিলনা। ট্রেনের সাথে এ শহরের লোকজনের কোন পরিচয় নাই। নিজেদের চলাচলে সামর্থবানদের ছিল সাইকেল। দু’একটা রিক্সা ছিল। আভ্যন্তরিন আর বাইরের সাথে নৌকো, ডিঙ্গি নৌকাই ছিল প্রধান বাহন। অবশ্য শহরে একটি মাত্র মোটর যানের সাথে শহরবাসীর কিছুটা সখ্যতা ছিল। লাল রঙের বহু পুরানো একটি ট্রাক। ফায়ার বিগ্রেডের মালিকানায় এ যন্ত্র যানটা দু’বছরে চার বছরে একবার রাস্তায় বেরুত। সেই লাল গাড়ি ঢং ঢং ঘন্টা বাজিয়ে বড় রাস্তা দিয়ে যখন চলে যেত, এর সঙ্গে কারো কোন দূর্ভাগ্য বা অশুভ ঘটনার যে যোগাযোগ থাকতে পারে, এ কথা তখন বাচ্চাদের মনেই আসতোনা। পূরবীরাও দূরথেকে ঢং ঢং শব্দ শোনা মাত্র বেরিয়ে আসতো বড় রাস্তায়। মন ভরে দেখতো লাল রঙের গাড়িখানা। লালরঙের এ গাড়িখানাকে দেখে বা ঢং ঢং ডাক শোনে তখন ‘দমকল যাচ্চে’ বলেও কেউ কেউ রব তুলতো।

সে সময়ই ‘কুয়াশা’ নামের একখানা ছোট গল্পের বই কি ভাবে যেন তার হাতে আসে। এটা বলাই বাহুল্য যে, পূরবী সেই ছোটবেলা থেকেই নিজের ক্লাসের বই, পাঠ্যবই ছাড়াও সব সময় কবিতার বই গল্পের বইয়ের সাথে লেগেই থাকতো। তার বড়দা আর বড়বোন মালতি’দি তাদের স্কুল লাইব্রেরী থেকে অথবা শহরের পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই ধার আনতো বাড়িতে। এগুলো তারা সবাই মিলে কখনো একসাথে আবার কখনো যে যার পাঠ দিতো। খতম দিতো। বাবা নিয়মিত পত্রিকা ম্যাগাজিন আনতেন বাসায়। তাও পূরবীরা পড়তো। সে রকমই ‘কুয়াশা’ গ্রন্থখানা কোন না কোন ভাবে তার হাতে আসে। সে পড়ে। বার বার পড়ে। অনেকবার পড়ে। যতবার পড়ে ততবারই তার কাছে নতুন মনে হয়। চমকপ্রদ মনে হয়। পড়তে পড়তে তার কাছে যেন কুয়াশা কেঁটে যায়। আলো জ্বলে উঠে; জ্যোৎ¯œা ফুটে উঠে।

সেবার তার ছোট ভাইয়ের জন্মদিনে সে কুয়াশা বইখানা শহরের বইয়ের দোকান থেকে কিনে এনে উপহার দেয়। গল্পগুলো নিজে আবার পড়ে। পড়তে পড়তে বইয়ের লেখক গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ বসুকে সে কল্পনা করে। বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে লেখা লেখকের জীবনী খানা সে পড়ে। তারচেয়ে খুব একটা বেশী নয় গল্পকারের বয়স। মাত্র ছয় বছরের বড়। ছাত্রাবস্থায় নিজের লেখাপড়ার খরছ মেটাবার জন্য বইটা লিখেন ও প্রকাশ করেন। এ বিষয়টা পূরবীকে আরো যেন আগ্রহী করে তোলে। উথলা করে তোলে। কিন্তু পূরবীর এতো উথলা ভাব বাবা মা অন্য আরো বড় ছোট ভাই বোন কেউই টের পায়না, বুঝতে পারেননা। একাকী নিজের মনের গভীরে তা লালন পোষন করেন পূরবী।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন পূরবী অত্যন্ত সম্মানের সাথে। সারা মুন্সীগঞ্জে নয় Ñ সমস্থ দেশের মধ্যে প্রথম স্থান, সর্ব্বোচ্চ নম্বার পেয়ে কৃতকার্য্য হন। অবশ্য শিক্ষা জীবনে পূরবী নিজের ক্লাসে বা কোন পরীক্ষায় প্রথম স্থান ছাড়া অন্যকোন স্থানের সাথে পরিচিত হন নি। বাবা শহরের জজকোর্টের নমকরা আর ডাকসাইটে উকিল। মা মেডিকেলের ডাক্তার। তারা সব ভাই বোন লেখাপড়ায় কেউ থেকে কেউ যেন কম নয়।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে আর বৃত্তি নিয়ে পূরবী চলে যান রাজধানীর সর্ব্বোচ্চ বিদ্যানিকেতনে। সেখানে বায়োক্যামিষ্ট্রি বিষয় নিয়ে স্মাতক শ্রেণীতে ভর্ত্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রীহলে অপর দুই সহপাঠি খুকি ও দুলি’র সাথে একটি কক্ষে থাকেন।

পূরবীর বাবা বিহারীলাল দত্ত। শহরে এ নামে সবাই চিনে। শুধু একজন নামকরা উকিল হিসাবেই নয়। একটা নামকরা খান্দানী পরিবারের লোক এবং একজন জ্ঞানী লোক হিসাবেও। নিজের ছেলে মেয়েদেরও গড়ে তুলেছেন নিজের আদর্শে আর শিক্ষায়। শহরের মধ্যে উদাহরনতুল্য পরিবার বিহারী বাবুর।

বাবার সাথে পূরবীর খুবই সখ্যতা। পৃথিবীতে কোন একান্ত বন্ধু আর অনুসরনযোগ্য আদর্শ হিসাবে পূরবীর সামনে শুধু বাবা এবং বাবার আদর্শই। বাবাও সকল ছেলে মেয়েদের সাথে সে রকমই। পূরবীর সাথেতো অবশ্যই।

নিজেদের মফস্বল জেলা শহর ছেড়ে রাজধানী শহরের সর্ব্বোচ্চ বিদ্যানিকেতনে যখন ভর্ত্তি হতে যান তখন বাবা একটা প্রধান শর্ত দিয়েছিলেন পূরবীকে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রীনিবাস তথা আবাসিক হল ছাড়া আর বাইরে কোথাও যাওয়া যাবেনা। কলেজে অধ্যয়নকালিন পূরবী ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে দেশের নামকরা এবং আদর্শভিত্তিক সুশৃঙ্খল একটা বামপ্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে কাজ করেন। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তখন পূরবী সে সংগঠনের নেতৃত্বদেন এবং কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদের সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তার ছাত্ররাজনীতি, লেখালেখি, সাংস্কৃতিক চর্চা ইত্যাদি লেখাপড়ার সঙ্গে একই সাথে চালিয়ে গেলেও পূরবী অক্ষরে অক্ষরে প্রথম দু’বছর বাবার সে শর্ত পালনও করেছিলেন। তৃতীয়বর্ষের শেষের দিকে হঠাৎ একদিন তা ভঙ্গ হয়ে যায়। নিজের যোগ-বিয়োগে কি যেন কি হয়েগেল হঠাৎ সেদিন। বাবার কোন উপদেশ বা শর্ত এই প্রথম পূরবী ভঙ্গ বা অমান্য করলেন।

পূরবী আর দুলি খুকিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের যে কক্ষটিতে থাকেন তার ঠিক উল্টোদিকে সেক্রেটারিয়েট রোডে পাঁচ নম্বার বাসা। লাল ইটের গাথুঁনী দেয়া একটা বাসা। নিজের কক্ষে পড়ার টেবিলে বসে বসে প্রায়ই আনমনা চেয়ে থাকতেন পূরবী এ বাসাটার দিকে। অবশ্য অন্য কোন কারনে বা আকর্ষনে নয়। নিজের টেবিলের উপরদিয়ে খোলা জানালায় তাকালে সরলরেখায় পড়ে এই লালরঙের বাড়িটি, তাই।

দুলির সাথে বিকালবেলা সঙ্গ দিতেই মুলত পূরবী যান ঐ বাড়িটিতে। নিজের জরুরী কোন কাজে অভিবাবকের কাছে যাচ্ছেন দুলি। অন্য জেলা থেকে আসা দুলির রাজধানী শহরের অভিবাবক অর্থ্যাৎ লোকাল গার্জিয়ান হচ্ছেন ড. দেব। থাকেন এই  বাসায়। দুলি প্রায়ই এবাসায় যাওয়া আসা করেন। আজ যাওয়ার সময় পূরবীকে সাথে যেতে অনুরোধ করলে পূরবীও তা রক্ষা করেন। ড. দেব একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং অন্য একটি আবাসিক হলের প্রোভোস্ট হিসাবে পাঁচ নম্বর সেক্রেটারিয়েট রোডের এই বাড়িতে থাকেন। তিনিই দুলির স্থানীয় অভিবাবক। অতসব আগে কখনো জানা ছিলনা পূরবীর। আজই তা প্রথম জানাহলো। চিরকুমার প্রফেসর দেব তার এক ছেলে সহ থাকেন এ বাড়িতে। ছেলে বলতে পালকপুত্র।

দুলির সাথে সেই বিকালে পূরবী যখন গিয়ে পাঁচ নম্বার সেক্রেটারিয়েট রোডের বাড়িতে পৌঁছলেন, তখন প্রথমেই দুলির লোকাল গার্জিয়ান ড. দেব-এর সাথে দেখা হলো। বাড়ির সামনে লনের এক পাশে বাঁধানো রাস্তাটির ওপর ক্রমাগত পায়চারি করছিলেন ড. দেব। ঋষিতুল্য মানুষ ড. দেব। দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। দুলি আর পূরবীকে দেখে তিনি তাদেরকে সাথে করে ঘরের ভিতরে নিয়ে যান। ঘরের ভিতরে বসার কক্ষে ঢুকেই পরিচয় হয় যার সাথে তিনি প্রবল সর্দিতে আক্রান্ত। তিনি তখন টেবিলের উপর বিশাল এক গামলায় ফুটন্ত জল রেখে তোয়ালে দিয়ে পুরো মাথা ঢেকে চেয়ারে বসে মুখ নিচু করে স্টিম নিচ্ছেন। ড. দেব পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য তার নাম ধরে ডাকলে, মাথা থেকে তোয়ালে সরিয়ে ফোলা ফোলা লালচে নাক-চোখ সহ পুরো মুখটা বেরকরে পূরবীদের দিকে তাকান। পূরবীও সলাজে চোখ তুলে তাকান আর দু’খানি হাত জোড়করে নমষ্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়ান। দু’জোড়া চোখ একই সরল রেখায় অবস্থান করে। তখন ড. দেব পরিচয় করিয়ে দেন : আমার পুত্র, জ্যোতিপ্রকাশ বসু।

নামটি শোনার পরেই পূরবীর চোখজোড়া ঘুরে ঘুরে গোল হয়ে ফুলে উঠে। আরো মোটা হয়ে যায়। প্রশ্নকরে : আপনি কি গল্প লেখক জ্যোতিপ্রকাশ বসু ? আপনার প্রকাশিত একটা গল্পের বই কু য়া.. (পূরবী শেষ করতে পারেননা, জ্যোতি বলে দেন ) : হ্যা, ‘কুয়াশা’। উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় প্রকাশ হয়েছিল। অনেকদিন হয়ে গেল।

পূরবী তখন তার চারদিকে ঝিল্মিল্ ঝিল্মিল্ জোনাকী পোকার উড়াউড়ি দেখতে পান ! আসলে মূহুর্তে পূরবী যেন চৈতন্য হারিয়ে ফেলেন। তার মনের মধ্যে লালন পোষন করা সেই জ্যোতিবাবু, সে ই কুয়াশা’র লেখক ! এভাবে আজ দুলির সাথে এসে এখানে পেয়ে যাবেন তা ভাবতেও পারেননা। মুহুর্তে তার মনের গতিবিধি চলেযায় সেই বয়সে। কুয়াশা পড়ার সময়ে, বাল্যাবস্থায়। কিশোর রহস্যোপন্যাস পড়তে পড়তে টান টান উত্তেজনা আর মন কেড়ে নেয়া গল্পের বিষয়বস্তু…। দুলির আলতো হাতে পীঠে স্পর্শ পড়ে পূরবীর। সম্বিৎ ফিরে পান যেন পূরবী।

দুলি পূরবী এদিন জলখাবার আর চা শেষে ফিরে আসেন তাদের হলে। কিন্তু জ্যোতিবাবুর অনুরোধে পরের রোববারে তার নিজের হাতের রান্নাকরা খিচুড়ি খেতে আর গল্প শোনতে যাওয়ার কথা পাকা হয়ে যায়।

পরের রোববার দুপুরবেলা আবার ঠিকই যাওয়া হয়। খাওয়া হয় পুরুষালী হাতে রান্নাকরা খিচুড়ি। শোনা হয় গল্প…। সবার অনুরোধে পূরবীকে একটা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাতে হয় তখন। এরপর আরো একদিন এরকম দুলির সাথে ঐ বাসায় পূরবী গিয়েছিলেন। আর একদিন ঐ রাস্তাদিয়ে যাওয়ার সময় বাসার সামনে জ্যোতির সাথে দেখা হয়েছিল এবং কিছু কথা হয়েছিল পূরবীর।

কোনকিছু বুঝার বয়স হওয়ার আগেই পূরবীর মন পড়ে রয়েছিল কুয়াশা’র গল্পকার জ্যোতিবাবুর কাছে। এবার মাত্র তিনদিনের পরিচয়েই জ্যোতিবাবুও কেমন যেন হারিয়ে গেলেন পূরবীর মাঝে।

কোন রাখডাক, কোন ভণিতা ভূমিকা ছাড়াই তাদের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যায় একের সাথে অন্যের যৌথ জীবন করার। জ্যোতি আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ চলে যাবেন। অতএব যাবার আগে তিনি পূরবীর কাছথেকে নিশ্চয়তা চান যে, তার ফিরে না আসা পর্যন্ত পূরবী অপেক্ষা করবেন। কিন্তু এক্ষত্রে ড. দেব আর জ্যোতির বন্ধু মাহমুদ সবাই চাইলেন, অপেক্ষার আর দরকার কি ? বাগদান দিয়ে আর ঝুলিয়ে রেখে কি লাভ ? শুভ কাজটা সম্পন্ন করে গেলেইতো ভাল হয় জ্যোতির জন্য। অবশ্য পূরবীর তখন এ ব্যাপারে ঘোর আপত্তি। মধ্যবিত্ত পরিবার। বড় ভাইয়ের বিষয়ে কোন চিন্তা না হলেও মালতি’দি, যিনি পূরবীর তিনবছরের বড়। তাকে রেখে পূরবীর বিয়ে আগে হয়েগেলে মালতির জন্য পরে এনিয়ে অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে। এরআগে দুই তিনটা ভাল সম্মন্ধ এসেছিল মালতির জন্য। কিন্তু লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে দিয়ে দেয়াতে বিহারীবাবুর খুবই অমত থাকায় তা আর এগোয়নি। এখন সেই মালতিকে রেখে পূরবীর বিয়ের প্রস্থাবের বিষয়টা বাবা জানতে পারলে খুব আহত হবেন। অনেক কিছুই পূরবী মেনে নিতে পারে কিন্তু বাবাকে দুঃখ দিতে পারবেনা সে কখনো।

এভাবেই আশা আর আশঙ্কার দোলায় দোলতে থাকে প্রস্থাবটা। দু’দিন পরে ড. দেব ই তা চূড়ান্ত করেন জ্যোতির বন্ধু মাহমুদের মাধ্যমে। ড. দেব এর কথার কোন বরখেলাপ করেন না পূরবীর বাবা বিহারী বাবু। কিন্তু মনে ও হৃদয়ে খুবই আহত হন Ñ বিদ্ধস্থ হন। সে দিন রাতে বিছানায় শুধু এপাশ ওপাশ করেন। যেন কোর্টে দিনে একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিনি হেরে গেছেন। অথবা আগামীকালের কোর্টে চাঞ্চল্যকর কোন মার্ডার কেইসের আরগুমেন্ট তার মাথায় পাক-প্যাচ খায়। দুনিয়ার সব এক্ট আর ধারাগুলো ঘুরপাক খায় তার মাথার মগজের পরতে পরতে। বাড়ির অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়াও তাই। সকলের মানসিক অবস্থা দেখলে মনেহয় অদ্য যেন দত্ত বাড়িতে একটা টর্নেডোর ঝাপটায় সব ওলটপালট হয়ে গেছে।

অবশেষে মালতির কথা অমিমাংসিত রেখেই তিনি পূরবীর বিয়েতে সম্মতি দেন ড. দেব এর পালকপুত্র জ্যোতিপ্রকাশ বসুর সাথে। তারিখ দিন ক্ষন ঠিক হয়। সব আয়োজন সম্পন্ন হয়। ধার-দেনা করে তাৎক্ষনিক সব খরছ-ব্যয় সংকোলান হয়। সুসম্পন্ন হয় পূরবী জ্যোতির শুভপরিণয়। বিষয়টা খুব তড়িঘড়ি করে করতে হয় কারন জ্যোতির উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ যাবার তারিখ বদলানো যাবেনা তাই।

সামনে ফাইন্যাল পরীক্ষা। সম্মুখে পড়ে থাকা জীবনের উজ্জ্বল দিনগুলো। কিন্তু বিয়ের পিঁড়ি নিয়ে এই অনেকটা অসময়েই অপ্রস্তুত ভাবেই ঘাটাঘাটি করতে হলো পূরবীকে। দেখা হলোনা কুষ্ঠি, জানা হলোনা চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্রের শুভ অশুভ সময় দিন। খোঁজা হলোনা লোকনাথ পঞ্জিকার পাতায় শুভ লগ্নটি। হাতে সময় নাই। তাই এভাবেই জ্যোতির বিদেশ যাবার মাত্র তিনদিন আগে সম্পন্ন হলো তাদের বিয়ে।

কিছু বরযাত্রী সমেত জ্যোতি পূরবীদের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের কাজ সুসম্পন্ন করে পূরবীকে নিয়ে এসে নিজের বাসায় উঠেন। বাসায়তো বাবা ড. দেব আর ছেলে জ্যোতি ছাড়া আর একটি মাত্র প্রাণী ঘর দেখাশোনার লোক রজনীকান্ত ছাড়া আর কেউ নাই। জ্যোতি আর ড. দেব তো বর আর বরযাত্রী হিসাবে সাথেই আছেন। অতএব বাসায় কড়া নাড়তেই ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে এসে দরজা খোলে দেন রজনীকান্ত। কোন স্বাগত, রাকডাক নাই, বধূবরনের আনুষ্টানিকতা নাই। পাঁচ নম্বার সেক্রেটারিয়েট রোডের লাল ইটের বাড়িটার চৌকাট পেরিয়ে পূরবী বাড়িতে ঢুকেন এবাড়ির বধূ হিসাবে। মনেপড়ে তার এই মাত্র কিছুদিন আগে তিনি আরো তিনবার এ চৌকাট ডিঙ্গিয়েছিলেন দুলির বান্ধবী সহপাঠি হিসাবে। অতিথি হিসাবে।

পরের দিন বিকাল বেলা পূরবীর মামা আসেন দেখা করতে। কিন্তু পূরবীর বুক কেমন ধূকপুক করে। মামাকে অন্যরকম মনে হয়। সে মামাকে বার বার একে একে বাড়ির সবার কথা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাস করে। ঘুরে ফিরে বার বার তার বাবার কথা জানতে চায়। বাবা কেমন আছেন, কি করছেন তার প্রতিক্রিয়া কি ইত্যাদি। মামা কেমন জানি এসব প্রশ্নে বিব্রত হন, প্রসঙ্গ পাল্টান। তেমন কিছু বলতে চাননা। পূরবীও ছাড়তে নারাজ। ঘুরে ফিরে ওসব প্রশ্নই করে। এরই মধ্যে সে জ্যোতির এবং তার শশুড় মশাই ড. দেব এর মন মর্জিও ভিন্ন রকম দেখতে পায়। তার কেবল সন্দেহ হয়। অথচ কিছু বলতেও পারেনা। মামা সন্ধ্যায়ই চলে যান। মামা চলে যাবার পর জ্যোতি এবং ড. দেব একটা জরুরী প্রয়োজনের কথা বলে বাইরে যান।

সময় যায়। রাত গভীর হয়। তারা আর ফিরে আসেন না। বিয়ের পর দ্বিতীয় রজনী। পূরবী আশ্চর্য্য হন তাদের এমন আচরনে। কিন্তু কিছুই অনুমান করতে পারেন না। সারাটা রাত তার ঘর আর বরান্দায় পায়চারী করেই কেটে যায়। রজনীকান্তও এব্যাপারে কিছুই জানেন না। ইতোপূর্বে ড. দেব অথবা জ্যোতি বাবুর এরকম অস্পষ্ট নিরুদ্দেশ তিনি কখনো দেখেনওনি।

সকালবেলা তারা দু’জনেই ফিরে আসেন। কিন্তু পূরবীকে ভাল বা স্পষ্ট কোন কিছু বলতে পারেন না। শুধু জরুরী একটা বিষয়ের দোহাই দেন। পূরবী বুঝেন এরকম বিষয়ে অন্তত: বিয়ের পরে এই দ্বিতীয় রজনীতে তাকে একা বাড়িতে ফেলে এভাবে নিরুদ্দেশ হওয়ার আর স্পষ্ট তাকে কিছু না বলা তাদের ক্ষেত্রে ঠিক হচ্ছেনা Ñ এটুকু জানার অধিকার তার আছে। গতকাল থেকেতো এই পরিবারেরই একজন পূরবী। গতকাল থেকে এই পরিবারের ভাল মন্দ সবকিছুর সাথে পূরবীরও সম্পর্ক রচিত হয়ে গেছে। কিন্তু সেটাও সত্যি যে পূরবী এখনও নববধু। কারো সম্পর্কে ভাল কিছু বুঝে উঠার আগে এখনই এতো অধিকার সচেতন হওয়া কতটুকু ঠিক বা উচিৎ হবে তাও সে ভাবে।

অনিবার্য্য কিছু কারনে তারিখ পরিবর্তনের কোন সুযোগ না থাকায়, এর একদিন পরই জ্যোতি তার পূর্ব নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ চলে যায়। যাবার সময় বিমর্ষ জ্যোতিকে দেখে অবাক হয়ে আৎকে উঠেছিল পূরবী। বিদেশ যাচ্ছে। এতো ভেঙ্গে পড়ারতো কথা নয়। পরে আবার ভেবেছে, নতুন বিয়ে। বিয়ের তিনদিনের মাথায়ই স্ত্রীকে রেখে এভাবে বিদেশ চলে যাচ্ছে তাই হয়তো মন এতা বেশী খারাপ !

জ্যোতি বিদেশ চলে যাবার পরেরদিন পূরবীর শশুড় ড. দেব তারই অনুজপ্রতিম সহকর্মী এবং পূরবীর বাবার বন্ধু দ্বিজেন শর্মা বাবুকে ডেকে আনেন। দু’জনে মিলে পূরবীকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জে যান পূরবীদের বাড়িতে।

যেদিন কন্যাদান শেষে বরযাত্রীসহ বিদায় জানানো হয় পূরবীকে। শশুড় বাড়ির পথে পূরবী জ্যোতি আর বরযাত্রীদের নৌকা যখন মধ্য নদীতে। পূরবীর বাড়িতে তখন সত্যিই যেন এক টর্নেডো ঝাপটা মারে। হার্টফেল করে দাঁড়ানো অবস্থাথেকে হঠাৎ পড়ে যান পূরবীর বাবা বিহারীলাল দত্ত। তারপর জজকোর্টের সবচেয়ে প্রতিভাধর আর শহরের সবচেয়ে নামকরা উকিল দত্তপরিবারের দ্বীপ্তি, বিহারী বাবুর মহাপ্রয়ান ঘটে। এত তড়িঘড়ি চলে গেলেন যে, শেষ কথাটাও আর কিছু বলেযেতে পারেননি।

বিয়ের পরের দিনের বিকেল বেলা পূরবীর শশুড়বাড়িতে মামার ক্ষনিক উপস্থিতি, আবার ফিরে যাওয়া। রাতেই জ্যোতি ও ড. দেব এর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া। আজ আবার শর্মা বাবুকে সহ শশুড় মশাই পূরবীকে নিয়ে বাবার বাড়ি যাওয়া এ চারদিন যাবৎ সবার গম্ভীর চেহারা। পূরবীর কাছে এখন সবই স্পষ্ট।

বাড়িতে গিয়ে বাবার অনুপস্থিতি পূরবীকে কতটুকু বিদ্ধস্ত করেছিল, কি করেছিল তখন সে, কি ছিল তার তখনকার প্রতিক্রিয়া। চল্লিশ বছর আগের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া অষ্টাদশী পূরবী দত্তের সেই কথাগুলো, সেই বিষাদময় স্মৃতি, বাবার বিয়োগ আর বাবার পবিত্র স্থানটা দখলকরা শশুড় ড. দেব  দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে সেই পাঁচ নম্বর সেক্রেটারিয়েট রোডের লাল রঙের ইটের বাড়িটিতে নিশংসভাবে খুন হওয়া। আর নিজের তড়িঘড়ি ঝটপট বিয়ের কথাটা স্মৃতিতে আওড়ান পেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিটায়ার্ড অধ্যাপিকা, রসায়ন বিজ্ঞানী ও সুলেখিকা মিসেস পূরবী দত্ত। ঘরের ভিতরে বিছানার উপর বসে কোলের উপর বালিশ রেখে টেবিল বানিয়ে, তার উপর সুন্দর মার্জিন দেয়া রোলটানা কাগজের উপর একটানা গল্প লেখায় মগ্ন রয়েছেন Ñ টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটার্স অধ্যাপক, নামকরা গল্পকার উপন্যাসিক ও জার্নালিস্ট অধ্যাপক ড. জ্যোতিপ্রকাশ বসু। ট্রিপয়ের উপরে রাখা সিডি প্লেয়ারে তখনো অবিরাম বেজে চলেছে সাগর সেনের কণ্ঠে একটার পর আরেকটা রবীন্দ্রসংগীত…

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop