মাহফুজ আনাম বিতর্ক — গণমাধ্যম এবং গণতন্ত্রের ধারা

Share Button

Gonotontroফারুক যোশী:
মাহফুজ আনাম বিতর্কের শেষ কিভাবে হবে, তা বলা মুশকিল। তবে এ বিতর্কের মধ্যি দিয়ে  নতুন করে অনেক প্রশ্ন যে উঠে আসছে, তা বলা যায়। সংসদে যেভাবে মানননীয় প্রধানমন্ত্রী মাহফুজ আনাম কিংবা ডেইলি স্টার কিংবা প্রথম আলোকে তুলো ধুনো করেছেন, তাতে আওয়ামীলীগের আরেক সিনিয়র পার্লামেন্টারীয়ান সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের কথা মনে পড়ে যায়। সম্ভবত যুদ্ধাপরাধীদের প্রসংগে শেখ হাসিনার কঠোর পদক্ষেপের প্রশংসা করে সুরঞ্জিত একবার বলেছিলেন বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে সহজে ছাড়ে না। যদিও এর শুরুটা প্রধানমন্ত্রী নিজে করেন নি। প্রধানমন্ত্রীর আগে তার তনয় সজিব ওয়াজেদ জয় শুরু করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ছেলে হিসেবে ওয়ান ইলেভেনের সময় তার মা‘র উপর মানসিক নির্যাতনের সেই দিনগুলো তাকে পীড়া দিচ্ছে। তার মা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তখন বিভিন্নভাবেই উচ্চারিত হয়েছে নানা কথা। শুধু তিনি নন, বিএনপি’র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও একইভাবে মানসিক চাপে ছিলেন।  জেলেও ছিলেন তারা দুজন। মইন-ফখরউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের সে দিনগুলো রাজনীতিবিদরা ভুলতে পারবেন না। সেটাই স্বাভাবিক। মাইনাস টু ফর্মুলার বাস্তবায়নের আওয়ামীলীগ-বিএনপি’র কত নেতা যে তৎকালিন ডিজিএফআই’র হয়ে কথা বলেছেন, সে ইতিহাস নতুন করে বলার কি কোন প্রয়োজন আছে ? সেসময়ের তত্ত্ববধায়ক সরকারের মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের দলীয় নেতা-নেত্রীদের অনেকেই তো এখনও সরকারের সাথে মিলে মিশে আছেন, যদিও কেউ কেউ ছিটকে পড়েছেন। আবার মাহমুদুল হক মান্নার মতো কেউ কেউ হয়ত কারাভ্যন্তরে দিন কাটাচ্ছেন। এ নিয়ে এখনও দায় স্বীকারের সময় হয়ত আসে নি রাজনীতিবিদদের। সে দিনগুলো নিয়ে কেউ হয়ত আড়ালে আবডালে লিখে রেখে যাবেন অনেক কিছুই, কিন্তু দায় স্বীকারের মতো সাহস দেখাতে পারেন নি,হয়ত পারবেনও না।

২) মাহফুজ আনাম দায় মেনে নিয়েছেন। টিভি‘র টক শোতে দায় স্বীকার করেছেন। অজানাই থেকে গেছে, কেন তার এই দায় স্বীকার। নিউজ প্রচারে কিংবা কলাম-ফিচারে প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টার তার অবস্থান থেকে এখনও সরে যায় নি। শত প্রশ্ন থাকলেও এখনও প্রথম আলো বাংলাদেশের এক অপ্রতিদ্বন্ধি জনপ্রিয়তা নিয়েই এগুচ্ছে। এবং সরকার নিয়েও তাদের দৃষ্ঠিভঙ্গির খুব একটা বড় পরিবর্তন পরিলক্ষিত নয়। তাহলে মাহবুজ আনামের কেন এই দায় স্বীকার ? সে প্রশ্নের উত্তর এখনও আমাদের অজানা। শুধুই কি একটা অপরাধবোধ থেকে তার স্বীকারোক্তি, না-কি অন্য কিছু। সরকার যতই দৃঢ়ভিত্তি পাচ্ছে প্রথম আলো কিংবা ডেইলী স্টারের বিরুদ্ধে সরকারী সমালোচনা ততই বাড়ছে। সরকারী মহল থেকে এমনকি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে আহবান করা হচ্ছে বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে ভেবে দেখতে। এরকম ঘোষনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রথম আলোর মতো বিশাল কর্পোারেট প্রতিষ্ঠান কি বানিজ্যিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কিংবা অচীরে হতে যাচ্ছে ? এ প্রশ্নটা উঁকি দিয়ে যায়। সরকার কিংবা এমনকি প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে কোন গণমাধ্যমকে সরকারের সামলোচক বলে হুশিয়ার করলেও এটাই সঠিক স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির এই সরকারকেই অধিকাংশ গণমাধ্যম সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। এতে কি ব্যতিক্রম প্রথম আলো কিংবা ডেইলী ষ্টার ? একারনেই কি এই পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে সরকারী উচ্চারন ? প্রথম আলো কিংবা ডেইলী স্টারের বাণিজ্যিক এই ধ্বস ঠেকাতে কি মাহফুজ আনামের এই দায় স্বীকার ? না-কি তার বিবেকবোধ থেকেই তিনি মেনে নিতে চাইছেন তার সেই সময়কার পরাজয়কে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভুল স্বীকারের সংস্কৃতি গড়ে উঠে নি। রাজনীতিবিদরা রাজনীতিতে কখনও কোন পদক্ষেপকে তারা ভুল হিসেবে চিহ্নিত করতে চান না। অথচ আওয়ামীলীগ বলি বিএনপি বলি এমনকি বামপন্থী দলগুলোই বলি, তাদের রাজনৈতিক ভুলের কারনে দলতো বটেই এমনকি দেশ পর্যন্ত অনেক অনেক পিছিয়ে যায় । হাল আমলের বিএনপি’র কথাই ধরি না কেন, আগুন সন্ত্রাসে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু থেকে শুরু করে দেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যে কত ব্যাপক ও ভয়াবহ তা চিন্তা করলে আঁতকে উঠতে হয়। যদিও বিএনপি’র বোধদোয় হয়েছে, তারা রাজনৈতিক মেরুকরন করেছে দলের মাঝে, কিন্তু দায় স্বীকার করবে না কোনদিন। বাংলাদেশের এরকম সংস্কৃতিতে মাহফুজ আনাম যা করেছেন তা কোনভাবেই অন্য চোখে দেখার সুযোগ নেই। বাণিজ্যিক কারনে হোক কিংবা দায়বোধ থেকেই হোক এ স্বীকারোক্তিকে আমাদের অন্তত ইতিবাচক হিসেবেই ধরে নিতে হবে।

৩)  মাহফুজ আনামের দায় স্বীকারের পর কিছুদিন সবকিছুই অনেকটা নিরবতায় থাকলেও সজিব ওয়াজেদ জয়ের বিবৃতি এবং পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দির্ঘ সময় এ নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে সারা দেশব্যাপী। মনে হচ্ছে মিডিয়া পাড়ায় এ নিয়ে চলছে অস্বস্থি। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। কারন ওয়ান ইলিভেনের সময় দু‘একটি পত্রিকা ছাড়া বাকি সব কাগজগুলোই যে কোন না কোনভাবে ডিজিএফআই কিংবা ফখর-মইন সরকারের তল্পি বয়ে বেড়িয়েছেন, তা এখন সেসময়কার বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের কাছ থেকেই আমরা জানছি। কদিন আগে একটা চিহ্নিত দৈনিক পত্রিকার (দৈনিক আমার দেশ) সেময়ের উপদেষ্টা সম্পাদকের একটা দীর্ঘ লেখা বেরিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে স্থায়ী রুপ দিতে  মাহফুজ আনাম কিংবা মতিউর রহমানের পত্রিকাগুলোর সেসময়ের দালালী হিসেব চিহ্নিত করেছেন তিনি, অবশ্য অন্য পত্রিকাগুলোর সম্পাদকদের কথাও তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন নি। ডিজিএফআই সকল সময়ই একটা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া সেসময় এরা ছিলো প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতার অংশীদার। সুতরাং তাদের কথা ফিরায় এমন স্পর্ধা হয়ত অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও দেখাতে পারেন নি। ঐ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক ডিজিএফআই‘র চাপের কথা না বলে লিখেছেন আনাম-মতিউরের দালালীর কথা। মাঝখানে শুধু একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, ঐ সম্পাদক প্রথম প্রথম আলো কিংবা ডেইলী স্টারের দালালীর কথা লিখলেও তিনি ঘুনাক্ষরে সাহস করে লিখতে কি পেরেছেন কোনদিন, তার উপদেশে যে পত্রিকা বেরুতো একসময় সেই পত্রিকায় ‘ফখর-মইন’ পরবতী সময়ে পবিত্র মক্কা নিয়ে মিথ্যে প্রচার ছাপা হয়েছে, দেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানী ছড়ানোর জন্যে সেই পত্রিকাটি প্রতিদিন যাচ্ছেতাই ছেপে গেছে, অথচ একটা দিন কি পেরেছিলেন তিনি তার প্রতিবাদ করতে কিংবা এমনকি অন্য পত্রিকায় কিছু লিখতে । একটা পত্রিকার বেতনভুক্ত সম্পাদক হয়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানী দেয়া মিথ্যে খবর প্রকাশের তথা পত্রিকার সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে তিনি কথা বলতে পারেন নি, অথচ তিনি কিভাবে আশা করেন ডিজিএফআই‘র মতো প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে যাবার সাধ্য সেসময় তারও ছিলো না, কিভাবে তিনি কিংবা তার সতীর্থরা আশা করেন মাহফুজ আনাম কিংবা মতিউর রহমানদের-ও সে শক্তি থাকবে ? এখন অনেক সম্পাদকই অস্বস্থিতে। কারন কে কিভাবে ফেঁসে যান এই ভয়ে। একজন মন্ত্রীতো বলেছেন,যারাই মাহফুজ আনামের পক্ষে বলবেন, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে। কি বিচিত্র আমাদের দেশ। আইন যেন হাতের খেলনা, ইচ্ছে হলেই যে কাউকে আইনের আওতায় আনা  যায়। এই ইচ্ছে-আইনের কারনেই না-কি এখন সেই দায় থেকে রেহাই পেতে এতদিন পর সুযোগ পেয়ে শুরু হয়েছে নিজেকে খোলসমুক্ত পবিত্র করার পাঁয়তারা এই উপদেষ্টা সম্পাদকের মতো অনেক সম্পাদকের ?

৪) মাহফুজ আনাম একটা কথা বলেছেন সম্প্রতি – এখনও র‌্যাবের দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে সাংবাদিক-সম্পাদকেরা নিউজ প্রচার করেন। সত্যি কথা বলতে কি এখানে খুব একটা কাট-ছাট কিংবা সম্পাদনার কিছু নেই। কারন র‌্যাবের কোন অপারেশনেই সাংবাদিক যাবার সুযোগ নেই । সুতরাং র‌্যাবের সোর্সকেই নিউজ সোর্স হিসেবে ধরে নিতে হয়। এ হিসেবে তৎকালিন ডিজিএফআই‘র তথ্যকে এড়িয়ে যাবার কি কোন সুযোগ ছিলো কোন সম্পাদকের ? কিন্তু এখানে যে ব্যাপারটা আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন করে, তাহলো মাহফুজ আনাম কিংবা মতিউর রহমান চক্র যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই মাইনাস টু ফর্মুলায় সহযোগী হয়ে থাকেন,তাহলে এটা একটা অগনতান্ত্রিক সরকারকে বৈধতা দেয়ার অপরাধে তাদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এবং ইতিহাসের বিচারে তারা গণতন্ত্র নস্যাৎ করার যঢ়যন্ত্রকারী হিসেবেও চিহ্নিত হবেন। আর যদি তা-ই না হন, শুধুমাত্র চাপের সম্মুখীন হয়ে অন্য সম্পাদকদের মতো দায়সারা গোছের কাজ করে থাকেন, তাহলে এটাকে সময়ের একটা অনিবার্য চাপ হিসেবে বিবেচনা করাটাই যৌক্তিক। আর যদি সরকার ইতিহাসের সেই দায় মোচন করতে চায়, তাহলে সে সময়টাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে ধরে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বৈধতা দেয়ার অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের (এমনকি রাজনীতিবিদদেরও) বিরুদ্ধেই সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট করাটাই প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop