ছাত্রলীগের সম্মেলন কি আশাবাদী করে ছাত্র সমাজকে ?

Share Button

Student

ফারুক যোশী :: বড় দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোর কারনেই যে ছাত্র রাজনীতি যে এক অন্ধকার চোরা গলিতে হারিয়ে যাচ্ছে, তা বার বার উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্নভাবে। ছাত্র সংগঠনগুলো ক্রমেই যে তাদের পুরনো ঐতিহ্য হারিয়েছে, নেতৃত্বে মেধার বদলে ভর করেছে পেশি, তা বার বার বিভিন্নভাবে দেখা গেছে। ছাত্রদের চাঁদাবজি টেন্ডার নিয়ে খুনোখুনি প্রভৃতি এখনও নিত্যদিনের খবর সারা দেশব্যাপী। সমালোচনা থাকলেও স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতিতে কিছু উজ্জল ছাত্র নেতাদের উপস্থিতি ছিলো। এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির ব্যপক ঐক্য বাংলাদেশকে রাহৃমুক্ত করতে প্রধান ভ’মিকাই পালন করেছিলো। এটা ছিলো ছাত্র রাজনীতির অতিত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। যদিও এ সময়েও এরশাদ অর্থ-চাকুরী-ব্যবসা প্রভৃতি দিয়ে কিছু ছাত্র নেতাদের চরিত্র হননে তৎপর ছিলেন। কিন্ত তারপরও ব্যপক ছাত্রসমাজে তা একটা প্রভাব ফেলতে পারে নি। স্বাধীনতা পরবর্তীতে ছাত্র রাজনীতিতে কিছু কিছু গুন্ডা-মাস্তানদের উপস্থিতি থাকলেও তা প্রভাবিত করে নি ছাত্র সমাজকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত খুন দিয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা চালালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারনেই অভিযুক্ত এমনকি ছাত্রলীগ নেতাদের সংগঠন থেকে বের করে দেয়া হয়। জেলে পোরা হয় তাদের। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনৈতিক দলের নিয়ম-নীতি (পি পি আর) চালু হলে সরাসরি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় চলে যেতে বাধ্য হয় ছাত্র সংগঠনগুলো। ছাত্র রাজনীতিতে এই থেকে শুরু। দল বদল,মাস্তান পোষা, রাজাকার তোষন প্রভৃতির মাধ্যমে দলটি পুষ্ট হতে থাকে এবং সত্যিকার অর্থেই জেনারেল জিয়া রাজনীতিকে ‘ডিফিকাল্ট’ করে তোললেন।

এরশাদ দুঃশাসন অধ্যায়ের শেষে ছাত্র রাজনীতিতে আর সুস্থতা ফিরে আসে নি। বিভিন্নভাবে গনতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলেও ক্যাম্পাসের রাজনীতির দিকে কোন সরকারই বলতে গেলে ইচ্ছে করেই চোখ দেয়  নি। ছাত্রদের নিজস্ব লাঠিয়াল বানাতেই এরা যেন থেকেছে তৎপর। আর সেজন্যেই রাজনীতিতে ক্রমেই পেশী প্রাধান্য পেতে থাকে। ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রের বদলে অছাত্রের প্রাধান্য বাড়তে থাকে। এমনকি স্কুল পাশ করা ছাত্র ছাত্র সংগঠনের সর্বোচ্চ পদটি পর্যন্ত বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। বাম সংগঠনের সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলো বলিষ্ট কন্ঠে ছাত্র রাজনীতিতে মেধার জয়গান গাইলেও কর্পোরেট দুনিয়ার ছোয়া পাওয়া বাংলাদেশে বড় ছাত্রসংগঠনগুলো তা হতে দেয় নি। বরং রাজনীতিতে তা ক্ষীন থেকে সে কন্ঠ ক্রমেই ক্ষীনতর হতেই থাকে।

প্রচলিত রাজনীতিও সেই সন্ত্রাসী সংস্কৃতিকে  উৎসাহিত করতে থাকে। ছাত্রদের বড় একটা অংশ মেধার দিকে না তাকিয়ে অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকার মালিক হবার স্বপ্ন দেখেছে, অনেকেই সফল হয়েছে। এবং সেজন্যেই সন্ত্রাসের রাজত্বে ছেয়ে গেছে সারা বাংলাদেশ।

২) এমনি অবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন কিছুটা হলেও একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ছাত্র রাজনীতিতে, এটা বিশ্বাস করা যায়। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে কিছু খোলামেলা কথায় কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে রাজনিিতর হাওয়ায়। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন , ছাত্রদের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ছাত্র রাজনীতিতে নেই সুস্থতা। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে মেধাবীদের জায়গা করে দেবার জন্যে তিনি আহবান করেছেন। আর এতে করে এখন রাষ্ট্রের প্রধান জায়গা থেকেই এই বাস্তবতাটিকে স্বীকার করার জন্যে রাজনীতিতে একটা সুস্থ হাওয়া প্রবাহিত হবার কথা। কিন্তু দেখা গেছে এই সময়কালীনই ছাত্রলীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিরীহ মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছে তার পেটের সন্তান। তাদের গুলাগুলির কারনেই এই সন্তানের পৃথিবীতে আসতে হয়েছে আগে, গুলিবিদ্ধ কাচা শরীর নিয়ে। এমনকি গত বৃহস্পতিবার জগন্নাত বিশ্ববিদ্যালযে চেয়ারে বসা নিযে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ তাদের মাঝে সংঘর্ষে মেতে উঠে, আহত করে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ছাতদেরকে। সারা বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ শেখ হাসিনার আলোচনায় আশার একটা রশ্নি দেখলেও ছাত্রলীগ যে এতে বিরক্ত হয়েছে, তা তাদের গুলাগুলিতেই যেন জানিয়ে দেয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রের প্রধান যখন তার ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে এমন ইতিবাচক কথাবার্তা উচ্চারন করেন, তখন আশা জাগবেই। যদিও গণ অভ’্যত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন সবকিছুতেই শেখ হাসিনা ছাত্রলীগেরই ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যদিও গণ অভ্যুত্থান কিংবা এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও সারা বাংলাদেশে ছাত্র ইউনিয়নের ভ’মিকাও ছিলো ব্যাপক। এবং এসময় এ সংগঠনটি ছিলো এমনকি বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন। ডাকসু সহ সারা বাংলাদেশে বলতে গেলে সবকটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে তখন ছাত্র ইউনিয়নের জয়জয়কার ছিলো। তবুও স্বীকার করতে কোনই দ্বিধা নেই, শত সমালোচানর মাঝেও যেভাবে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়মিত ছাত্রদের কাঁধেই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী , তাতে বড় দলগুলোর ছাত্র রাজনীতির বয়সী বন্ধাত্য কাটতে শুরু করার কথা। বাম সংগঠনগুলোর এ ধারা অবশ্য চলছিলো। আর সেকারনেই অন্য সংগঠনকে সাথে নিয়ে আগে অন্তত ছাত্র সমাজের দাবী-দাওয়াতে এক হওয়ার মতো কোন মানসিকতা কাজ করতো না। ছাত্র রাজনীতিতে মেধা কিংবা মানসিকতার কোন সামঞ্জস্য ছিলো না।   নিজেদের সংগঠনের স্বার্থ দেখেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্তত ছাত্র সমাজের আশা-আকাংখার কথা প্রতিফলিত করার মতো কোন ইস্যু তারা দিতে পারতো না। কেননা নেতৃত্বে ছাত্রের বদলে অছাত্রের প্রাধান্য থাকলে কিংবা বিবাহিত বাবারা থাকলে বৈষয়িক স্বার্থ তাদের কাছে প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসা-টেন্ডারে তারা মনযোগী হয়। ছাত্রদের স্বার্থ দেখার প্রয়োজন তাদের পড়ে না। ছাত্র-ছাত্রীদের ইস্যুর পরিবর্তে শুধুমাত্র নেতা-নেত্রীদের মন জয় করতেই তারা সময় ব্যয় করে।

৩) ছাত্র লীগের নব নির্বাচিত সভাপতি তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কাজ করবেন। প্রায় আড়াই দশক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজগুলোতে কোন নির্বাচন হয় না। এরশাদ পতনের পর তিনবার গনতান্ত্রিক সরকার এসেছে, অথচ কোন সরকারই শিক্ষাঙ্গনের নির্বাচন নিয়ে কথা বলে নি। সবাই একই বাহানা দেখিয়েছে যে, শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকুলে নয়। অথচ শিক্ষাঙ্গনে নির্বাচন সব জায়গায় নতুন সার্বজনীন নেতৃত্ব সৃষ্ঠি করতে সহায়তা করে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা প্রায়ই নেতৃত্বে চলে আসে। কারন সাধারন ছাত্র-ছাত্রীরা যে কারনেই হোক তাদের নেতা নির্বাচন করে বলতে গেলে দেখে-শোনে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের মধ্যি দিয়ে জাতীয় কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে শক্তিশালী মেধাবী নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে। নির্বাচনের মধ্যি দিয়ে জেলায় উপজেলায় অর্থাৎ দেশব্যাপী নতুন মেধাবীরা জায়গা করে নেয়।

৪) শত সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও দেশে একটা গনতান্ত্রিক আবহ বিরাজ করছে। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাড়া এখন অন্য কোন ছাত্র সংগঠন সন্ত্রাস-মাস্তানীতে নেই। সন্ত্রাস-মাস্তানীর সুযোগটুকুও কমছে। আমরা দেখছি সরকারও এমনকি ছাত্রলীগের কিছু কিছু সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করছে। সাম্প্রতিক মা-মেয়ে গুলিবিদ্ধ হবার ঘঠনায়ও ছাত্রলীগ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজনীতিতে এ এক সুবাতাস বটে। যারা সন্ত্রাসী, ছাত্রলীগের নাম নিয়ে এখনও যারা সন্ত্রাস চালাতে চাইছে, এরকম গ্রেফতার আতংক তাদের মাঝে কাজ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এবং সরকারও যদি এসব ব্যাপারে কঠোর থাকে, তাহলে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি থাকবে না।

এ অবস্থায় এখন একটা সময় এসেছে। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্যে সরকার কিংবা শিক্ষা মন্ত্রনালয় উদ্যোগী হতেই পারে এখন। পরিস্থিতি অনুকুলে নয়, এ কথাটি এখন আর বলার অবকাশ নেই। মেধাবী নেতৃত্ব ছাত্রলীগে নেতৃত্ব দেবে – এ কথাটি গোটা ছাত্র রাজনীতির জন্যেই একটা শুভ দিক। ছাত্র রাজনীতিতে মেধাবীরা আসুক, ছাত্র রাজনীতির পুরনো ঐতিহ্যে ফিরে আসুক  এবং সমাজের মৌলিক দাবী-দাওয়া নিয়ে এগিয়ে যাবার পাশাপাশি জাতীয় সংকটে ছাত্র সমাজ অতীতের মতোই ঝাপিয়ে পড়ুক, এটাই জাতির আকাংখা। এই আকাংখার প্রতিফলন হোক। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখন শুধু সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। ছাত্রলীগের সম্মেলন কি আশাবাদী করে না গোটা ছাত্র সমাজকে ?

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

}
© Copyright 2015, All Rights Reserved. | Powered by polol.co.uk | Designed by Creative Workshop